বলের ভেতরে থাকা চিপ © সংগৃহীত
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচগুলোর একটিতে প্রযুক্তিই হয়ে উঠল শেষ কথা। পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়ার রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে তিনটি গোল বাতিল হয় আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায়। এর মধ্যে ১১২তম মিনিটে ক্রোয়েশিয়ার সমতাসূচক গোলটি বাতিল না হলে ম্যাচ ২-২ সমতায় অতিরিক্ত সময়ে গড়াত। কিন্তু বলের ভেতরে থাকা বিশেষ সেন্সর বা চিপের তথ্য এবং সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির সহায়তায় গোলটি বাতিল করেন রেফারি। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে পর্তুগাল, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ স্পেন।
ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি আসে ১১২তম মিনিটে। ইয়োশকো গভার্দিওল বল জালে পাঠিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে সমতায় ফেরানোর উল্লাসে মাতলেও সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। ভিএআর পর্যালোচনার পর নরওয়ের রেফারি এসপেন এসকাস অফসাইডের সিদ্ধান্ত দেন। টেলিভিশনের রিপ্লেতে বিষয়টি পরিষ্কার না হলেও বলের ভেতরে থাকা সেন্সরই জানিয়ে দেয়, আক্রমণ শুরুর আগে ইগর মাতানোভিচ বলটিতে সামান্য স্পর্শ করেছিলেন। সেই স্পর্শের কারণেই অফসাইডের পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং গোলটি বাতিল হয়ে যায়।
চলতি বিশ্বকাপে ব্যবহৃত অফিসিয়াল বল 'ট্রিওন্ডা'য় অত্যাধুনিক মোশন সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। বলের চারটি প্যানেলের একটির ভেতরে থাকা আইএমইউ (IMU) সেন্সর বলের প্রতিটি স্পর্শ শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে ভিএআর কক্ষে তথ্য পাঠায়। ফলে খেলোয়াড় কখন বল স্পর্শ করেছেন, সেটি অত্যন্ত নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
ক্রোয়েশিয়ার বাতিল হওয়া গোলের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তিই মূল ভূমিকা পালন করে। রেফারি যখন মনিটরে রিপ্লে দেখেন, তখন দেখা যায় ইগর মাতানোভিচ বলটিতে খুব হালকা করে মাথা ছুঁয়েছিলেন। সাধারণ সম্প্রচারের ক্যামেরায় এই স্পর্শ প্রায় অদৃশ্য ছিল। কিন্তু সেন্সরের তথ্য দেখায়, বলটি ২০ নম্বর জার্সিধারী খেলোয়াড়ের কাছে পৌঁছানোর মুহূর্তে মনিটরের গ্রাফে হঠাৎ একটি তীক্ষ্ণ স্পাইক তৈরি হয়, যা বল স্পর্শের স্পষ্ট প্রমাণ দেয়।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ফিফা তাদের অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট @fifamedia-তে জানায়, 'ট্রিওন্ডা বলের ভেতরে থাকা আইএমইউ (IMU) সেন্সরগুলো যেকোনো হালকা স্পর্শও শনাক্ত করতে সক্ষম, যা সম্প্রচারের সময় দর্শকদের স্ক্রিনে হার্টবিট বা হৃদস্পন্দনের গ্রাফের মতো ভেসে ওঠে।'
তবে বলের ভেতরের এই চিপ প্রথমবার আলোচনায় আসেনি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। তখন সেটিই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর একটি গোল কেড়ে নিয়েছিল।
উরুগুয়ের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ব্রুনো ফার্নান্দেসের ক্রসে রোনালদো হেড করার চেষ্টা করেন এবং বল জালে জড়িয়ে যায়। গোল হওয়ার পর স্বভাবসুলভ 'সিইউউউ' উদযাপনও করেছিলেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। কিন্তু পরে ফিফা জানায়, রোনালদো বল স্পর্শই করেননি। কারণ কাতার বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল 'আল রিহলা'র ভেতরে থাকা সেন্সর দেখিয়েছিল, ব্রুনোর ক্রসের পর বলটিতে দ্বিতীয় কোনো স্পর্শ লাগেনি। ফলে গোলটি ব্রুনো ফার্নান্দেসের নামেই যোগ করা হয়।
চলতি বিশ্বকাপে ফিফা সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে। রেফারিদের আরও দ্রুত, নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত নিতে এই প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছে। এতে প্রতি সেকেন্ডে ৫০টি ফ্রেম ধারণ করতে সক্ষম ১৬টি বিশেষ ক্যামেরা খেলোয়াড় ও বলের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে। প্রতিটি ফ্রেমে খেলোয়াড়দের শরীরের ২৯টি গুরুত্বপূর্ণ ডেটা পয়েন্ট সংগ্রহ করা হয়, যা অফসাইড নির্ধারণে ব্যবহার করা হয়।
পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে এই প্রযুক্তিকে তিনবার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। প্রথমে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। এরপর ১-১ সমতায় থাকাকালে পেতার সুচিচের একটি গোলও বাতিল করা হয়। সবশেষে ১১২তম মিনিটে ইয়োশকো গভার্দিওলের সমতাসূচক গোলও প্রযুক্তির সহায়তায় বাতিল হয়।
শেষ পর্যন্ত বলের ভেতরের সেন্সর, সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি এবং ভিএআরের সমন্বিত সিদ্ধান্তই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে। অতীতে যে প্রযুক্তি রোনালদোর একটি গোল কেড়ে নিয়েছিল, এবার সেই প্রযুক্তিই পর্তুগালের জয় নিশ্চিত করতে এবং বিশ্বকাপে তাদের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখল।