কোলাজ ছবি © টিডিসি সম্পাদিত ছবি
বিশ্বকাপের মঞ্চ মানেই যেমন আকাশচুম্বী সাফল্য আর উন্মাদনা, ঠিক তেমনি এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নির্মম ট্র্যাজেডি। চলতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে প্রত্যাশার পারদ ছুঁতে না পারা আর অকাল বিদায়ের জেরে বিশ্বমঞ্চের টেকনিক্যাল বেঞ্চগুলোয় যেন এক নির্মম ‘গিলোটিন’ নেমে এসেছে। টুর্নামেন্টের মাঝপথেই ইতিমধ্যে চাকরি হারিয়েছেন কিংবা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন উরুগুয়ে, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির মতো পরাশক্তি দলের ৮ জন হাইপ্রোফাইল প্রধান কোচ। আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই সর্বোচ্চ আসরে সামান্য ভুলের মাশুলও যে কতটা চড়া আর নিষ্ঠুর হতে পারে, তা প্রমাণ করে ফুটবল ফেডারেশনগুলো কোনো রকম সুযোগ না দিয়ে একের পর এক কোচকে বরখাস্ত করছে। আবার অনেক চতুর ও অভিজ্ঞ মাস্টারমাইন্ড নিজেদের দলের এমন ভরাডুবির সব দায় নিজের কাঁধে নিয়ে, লোকচক্ষুর তীব্র সমালোচনা এড়াতে স্বেচ্ছায় মাথা উঁচু করে পদত্যাগের পথ বেছে নিয়েছেন। নিচে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ঘণ্টা বেজে যাওয়া সেই ৮ কোচের আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হলো:
সাব্রি লামৌচি (তিউনিসিয়া)
বিশ্বকাপের মঞ্চে সবার আগে তিউনিসিয়ার এই কোচেরই পতন ঘটে। গ্রুপ 'এফ'-এর প্রথম ম্যাচে সুইডেনের বিপক্ষে ১-৫ গোলের বিশাল ব্যবধানে পিষ্ট হওয়ার পরপরই তিউনিসিয়ার ক্রীড়া কর্তৃপক্ষ সাব্রি লামৌচিকে বরখাস্ত করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়। উত্তর আফ্রিকার এই দলটিকে গাণিতিকভাবে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার আগেই সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনার মরিয়া চেষ্টায় তারা হার্ভে রেনার্ডকে নতুন কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। তবে শেষ রক্ষা হয়নি; তিউনিসিয়ানরা গ্রুপ পর্বের তলানিতে থেকে একটি পয়েন্টও না পেয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়।
মার্সেলো বিয়েলসা (উরুগুয়ে)
২০১৮ সালের পর থেকে নকআউট পর্বে উঠতে না পারা উরুগুয়ের ভাগ্য বদলাতে মার্সেলো বিয়েলসাকে পারফেক্ট নেতা মনে করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর বিদায়টি অত্যন্ত আকস্মিক ও চমকপ্রদ ছিল। গ্রুপ 'এইচ'-এ স্পেন এবং তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দের পেছনে থেকে দল তৃতীয় স্থানে শেষ করায় বিয়েলসাকে বরখাস্ত করা হয়। এর সাথে যোগ হয়েছিল টুর্নামেন্ট চলাকালীন ড্রেসিংরুমের ভেতরের এক গুমোট ও খারাপ পরিবেশের গুঞ্জন—যদিও কোচ নিজে সংবাদ সম্মেলনে এমন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন।
স্টিভ ক্লার্ক (স্কটল্যান্ড)
২০১৯ সাল থেকে স্কটল্যান্ডের ডাগ-আউটের দায়িত্বে থাকা স্টিভ ক্লার্ক দীর্ঘ ২৮ বছর পর দলটিকে আবারও ফিফা বিশ্বকাপে ফিরিয়ে এনেছিলেন। তবে গ্রুপ 'সি'-তে তাঁর দল ব্রাজিল ও মরক্কোর ওপরে শেষ করতে ব্যর্থ হয়ে বিদায় নিলে তিনি অবিলম্বে নিজের পদ থেকে ইস্তফা দেন। অবশ্য বিদায়বেলায় তিনি একদম খালি হাতে ফেরেননি, গ্রুপ পর্বে হাইতিকে হারাতে পেরেছিল তাঁর দল।
হং মিউং-বো (দক্ষিণ কোরিয়া)
দক্ষিণ কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার ঠিক একদিন পর হং মিউং-বো প্রধান কোচের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের চমকে দেন। এশিয়ার এই শক্তিশালী দলটি গ্রুপ 'এ'-তে সহ-আয়োজক মেক্সিকো এবং দক্ষিণ আফ্রিকার পেছনে থেকে তৃতীয় স্থানে শেষ করে। পরের রাউন্ডে যাওয়ার আর কোনো গাণিতিক সুযোগ না থাকায় সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়ে হং মিউং-বো কোরিয়ান ফুটবলকে ভালোবাসা নাগরিকদের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চেয়ে বিদায় নেন।
মিরোস্লাভ কুবেক (চেক প্রজাতন্ত্র)
গ্রুপ 'এ'-র অন্য দল চেক প্রজাতন্ত্র গত দুই দশক ধরে ফিফা বিশ্বকাপে খেলার সুযোগই পায়নি, আর এবার সুযোগ পেলেও প্রতিপক্ষদের হারাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় তারা। দুটি হার এবং একটি ড্র নিয়ে টেবিলের তলানিতে থেকে টুর্নামেন্ট যাত্রার সমাপ্তি ঘটার পর প্রধান কোচ মিরোস্লাভ কুবেক ফেডারেশনের সাথে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেন।
রোনাল্ড কোম্যান (নেদারল্যান্ডস)
নকআউট পর্ব বা শেষ ৩২-র খেলা শুরু হওয়ার পর যে দুজনকে বিদায় নিতে হয়েছে, ডাচ কিংবদন্তি রোনাল্ড কোম্যান তাঁদের একজন। মরক্কোর কাছে পেনাল্টি শুটআউটে ১-১ (পেনাল্টিতে হার) ব্যবধানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টাও পার হওয়ার আগেই তিনি নেদারল্যান্ডসের প্রধান কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত খেলে প্রথম হওয়া দলটির এমন বিদায়ে কোম্যান বলেন, 'আমার চেয়ে বেশি হতাশ আর কেউ নয়। প্রধান কোচ হিসেবে এই দায় আপনার ওপরেই বর্তায়।'
সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে (ইকুয়েডর)
বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শেষ কোচ হিসেবে চাকরি হারিয়েছেন ইকুয়েডরের সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে। জার্মানি ও আইভরি কোস্টের পেছনে থেকে গ্রুপ 'ই'-তে তৃতীয় স্থান অর্জন করে দল শেষ ৩২-এ উঠেছিল। তবে শেষ ৩২-এর ম্যাচে মেক্সিকোর কাছে ২-০ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়ার পর ইকুয়েডর ফুটবল ফেডারেশন তাঁর চুক্তি আর না বাড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
হুলিয়ান নাগেলসম্যান (জার্মানি)
চলতি গ্রীষ্মে উত্তর আমেরিকার মাটিতে জার্মান দলের চরম ব্যর্থতার পর প্রধান কোচ হুলিয়ান নাগেলসম্যানের অধ্যায়ও আগামী কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হতে চলেছে। 'বিল্ড'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের (DFB) কর্তারা নাগেলসম্যানকে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি যেন জোরপূর্বক বরখাস্ত না হয়ে নিজেই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, যাতে তিনি পরিস্থিতি থেকে মাথা উঁচু করে চলে যেতে পারেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের শুরুতে নাগেলসম্যানের গড়া রোমাঞ্চকর প্রজেক্টটি নেশনস লিগের পর এই বিশ্বকাপেও আসল সময়ে এসে পুরোপুরি ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।