অনলাইনে ফ্রি'তে বিশ্বকাপ © সংগৃহীত
ঢাকার মোহাম্মদপুরে থাকেন বেসরকারী চাকরিজীবী সুলতান মাহমুদ। এটি তার ছদ্মনাম। ফুটবলভক্ত মি. মাহমুদ বাসায় টিভি রাখেননি সন্তানদের আসক্তির কারণে। বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে আগ্রহের জায়গা থেকে তিনি বিশ্বকাপ শুরুর সপ্তাহ খানেক আগেই বাংলাদেশের একটি ওটিটি প্লাটফর্ম এর বিশ্বকাপ প্যাকেজ কিনেন অনলাইনে খেলা দেখার জন্য। বৃহস্পতিবার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ দেখার জন্য তিনি তার মোবাইল থেকে ওই প্লাটফর্মটিতে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
কিন্তু লগইন করার জন্য তার মোবাইলে ও-টিপি বা অনটাইম পাসওয়ার্ড আসছিল না। যে কারণে তিনি কোনভাবেই খেলা দেখতে পারছিলেন না। একটা পর্যায়ে তিনি ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে অনলাইনে খেলা দেখার লিংক খুঁজতে থাকেন। এবং দুইটি লিংক তিনি পেয়েও যান।
মি. মাহমুদ বলেন, ‘বাসায় যেহেতু ডিসের লাইন ছিল না, অসহায় লাগছিল। তাই বাধ্য হয়ে অনলাইনে লিংক খুঁজতে থাকি এবং অনলাইনে দুইটি লিংক পেয়ে যাই।’ তিনি জানাচ্ছিলেন, যে দুইটি লিংক তিনি ফেসবুকের দুইটি আলাদা পেজ থেকে পেয়েছিলেন তার একটিতে মাত্র মিনিটখানেক খেলা দেখার পর সেটি আর কাজ করেনি। পরে অপর একটি লিংকে ক্লিক করলে সেখানে তাকে একটি মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলা হয়।
মি. মাহমুদ বলছিলেন, ‘প্রথমে অ্যাপটি ডাউনলোড করে খেলা দেখা শুরু করলাম। কিন্তু ভিডিও কোয়ালিটি ভাল না হওয়ায় যখনই উন্নত (এইচডি) কোয়ালিটি অপশনে ক্লিক করলাম, তখনই ওরা আলাদা একটি অনলাইন জুয়ার সাইটে নিয়ে গেলো আমাকে’। তবে সেটিকে নিরাপদ মনে না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি আর অনলাইনে খেলা দেখেননি বলেও জানান।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রি'তে অনলাইনে খেলা দেখানোর এসব লিংকে প্রবেশ করলেই অনেক ক্ষেত্রে তার ডিভাইস, অনলাইন কার্যক্রম ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ বা চুরি করা হয়ে থাকে। সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ফ্রি অনলাইন ফুটবল স্ট্রিমিং সাইট ব্যবহার করলে বড় ধরনের সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড, ব্যাংকিং তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরির ঝুঁকিও থাকে"।
গত ১১ই জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা ও মেক্সিকোতে শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবল। নানা জটিলতার পর বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিসহ মোট তিনটি টেলিভিশন সরাসরি বিশ্বকাপের খেলা দেখানোর সত্ত্ব কেনে। একই সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে মাই রবি, টফি, বায়স্কোপ ও আইস্ক্রিনে খেলা দেখার সুযোগ রাখা হয়। যাদের বাসা বাড়িতে টেলিভিশন নেই তাদের অনেকেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে খেলা দেখার প্যাকেজ কিনেন। তবে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনেই সাবস্ক্রিপশন নেওয়া ব্যবহারকারীদের অনেকেই বার বার চেষ্টার পরও ওয়েব সাইটে ঢুকতে পারেননি।
বিশ্বকাপ শুরুর ওইদিন থেকেই ফেসবুক ফ্রি লাইভ দেখার লিংক আছে কী-না, কিংবা 'কোন অ্যাপে ফ্রি'তে খেলা দেখা যায় এসব প্রশ্নও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করতে দেখা গেছে। এমন একটি পোস্টের নিচের লিংক থেকেই বিশ্বকাপ দেখার লিংকে প্রবেশ করেছিলেন মোহাম্মদপুরের সুলতান মাহমুদ। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত নিরাপদ মনে না হওয়ায় সেখান থেকে সরে আসেন।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছিলেন, এই ধরনের বড় আসরকে ঘিরে বা ফ্রি'তে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলা দেখানোর লোভ দেখিয়ে বৈশ্বিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফার আদলে বিভিন্ন ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা বলছিলেন, ওই সাইটগুলো বা থার্ড পাটি অ্যাপসগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, সেটা দেখে বোঝার উপায় থাকে না। ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করতে ওয়েব ঠিকানায় সামান্য বানান পরিবর্তন করা হয়"। তিনি বলছিলেন, "হুবহু এসব ওয়েব সাইটের মতো দেখে অনেকেই বুঝতে পারেন না। যে কারণে অনেকেই এই সাইটগুলোতে ফ্রি'তে খেলা দেখতে প্রবেশ করে থাকেন"।
যেভাবে ফাঁদে পড়েন ব্যবহারকারীরা
বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ কানাডা সরকারের ওয়েবসাইটে সাম্প্রতিক প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় বলেছে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ভুয়া স্ট্রিমিং সাইট, নকল অ্যাপ, ফিশিং এবং বিভিন্ন ধরনের অনলাইন প্রতারণা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মোহাম্মদপুরের সুলতান মাহমুদ খেলা দেখার যেই দুইটি লিংক পেয়েছিলেন, তার একটি ছিল ফেসবুক লিংক, আরেকটি অ্যাপ ভিত্তিক লিংক। উদাহরণ দিয়ে সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা বলছিলেন, ধরেন একজন ফেসবুক পোস্টে ফ্রি'তে অনলাইনে খেলা দেখার লিংক খুঁজলেন। তার নিচে কেউ একজন কমেন্টে লিখে দিলেন আজকের খেলার ফ্রি এইচডি লিংক। সেই সাথে একটি লিংক দেওয়া হলো"।
ওয়েব সাইট বা ফেসবুক লিংক বা অফিসিয়াল অ্যাপ স্টোরের বাইরের এক ধরনের অ্যাপ ডাউনলোড করতে বলা হয়, এসব লিংকে গিয়ে খেলা দেখার জন্য।
মি. জোহা বলছিলেন, ‘এই ধরনের অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে প্রায়ই ম্যালওয়্যার, ট্রোজান, স্পাইওয়্যার এবং ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট লুকিয়ে থাকে, যা ব্যবহারকারীর ডিভাইস আক্রান্ত করতে পারে। এছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য, পাসওয়ার্ড, ব্যাংকিং তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরির ঝুঁকিও থাকে।’
স্বাভাবিকভাবে অনেকের প্রশ্ন আছে যে, ফেসবুক, টেলিগ্রামের মতো অ্যাপসগুলোও ব্যবহার করে এই ধরনের লিংকে প্রবেশ করলে কি ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে? উদাহরণ দিয়ে মি. জোহা বলছিলেন, ‘ধরেন আপনার ফোনে ফেসবুক লগ ইন করা আছে। আপনি যদি আরেক ডিভাইস থেকেও ফেসবুক লগ ইন করতে যান দেখবেন অথেনটিকেশনের কারণে সে আপনার অন্য ডিভাইসেও লগ ইন নিয়ে নেবে কুকি হাইজ্যাকের মাধ্যমে।’
তার ভাষায়, ফেসবুক, জিমেইল বা অন্য কোনো ওয়েবসাইটে লগ ইনের সময় ব্রাউজারে একটি ছোট ডেটা ফাইল সংরক্ষিত থাকে। যেটিকে সেশন কুকি বলা হয়। এই কুকিই ওয়েবসাইটকে জানায় যে, আপনি ইতোমধ্যে লগইন করেছেন। ফলে প্রতিবার নতুন করে পাসওয়ার্ড দিতে হয় না।
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডি অনলাইন প্রতারণা সংক্রান্ত অপরাধগুলো নিয়ে কাজ করে দীর্ঘদিন থেকে। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান বলেন, ‘যেসব ফেসবুক আইডির রিচ বেশি সেখানে কমেন্ট করে খেলার লিংক দেওয়া হয়। সেটির মাধ্যমে প্রতারক চক্র তাদের প্লাটফরমে নিয়ে আসে ব্যবহারকারীদের। সেগুলোতে ক্লিক করে অনেকে প্রতারণার ফাঁদে পড়েন।’
ঝুঁকি কী, কিভাবে নিরাপদে থাকবেন?
অনলাইনে বিভিন্ন লিংক ছড়িযে প্রতারণার ফাঁদসহ এই ধরনের অপরাধ নিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। সিআইডি, গত দেড় মাসের অভিযানে ২৭৮টি এমন ওয়েবসাইটের সন্ধান পেয়েছে। এর মধ্যে গত পহেলা মে থেকে ১৬ই জুন পর্যন্ত ২৬৮টি এবং বুধবার ১০টি ওয়েব সাইটের সন্ধান পায়। এই ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করতে তারা বিটিআরসির কাছে চিঠিও দিয়েছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান বলেন, ‘বড় কোনো খেলার আসরকে কেন্দ্র করে প্রতারণা ফাঁদ পাতা হয়। জুয়ার সাইটগুলোতে প্রবেশ করিয়ে ব্যবহারকারীদের পাসওয়ার্ড ছাড়াই অ্যাকাউন্টে ঢুকে পড়ে এবং প্রতারণার জাল পাতে’।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা বলছিলেন, এই ধরনের স্ক্যামের শিকার হলে ম্যালওয়্যার ও ভাইরাস সংক্রমণ, ব্যক্তিগত তথ্য ও পাসওয়ার্ড চুরি, ব্যাংকিং ও আর্থিক জালিয়াতি, ফিশিং ও অনলাইন প্রতারণা ও ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি থাকে। এই ঝুঁকির হাত থেকে নিরাপদ থাকতে থার্ড পার্টি অ্যাপ ব্যবহার না করা ও সবসময় অফিসিয়াল ব্রডকাস্টার, অনুমোদিত স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত অ্যাপ ব্যবহার করার পরামর্শও দিয়েছেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
সিআইডি কর্মকর্তা মি. খান বলছিলেন, সম্প্রতি প্রতারণার সাইটের মাধ্যমে প্রতারণা বাড়ছে। যে কারণে এই ধরনের অপরাধে শাস্তি ও দণ্ডের পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। একই সাথে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং করে এই চক্রগুলোকে ধরতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন তারা।
সিআইডি গত দেড় মাসে এই সংক্রান্ত অপরাধে অন্তত ১৭ জন আসামিকে গ্রেফতার করেছে। এবং এই ধরনের অপরাধে ব্যবহৃত দুই হাজারেরও বেশি আর্থিক মোবাইল পরিসেবা অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিএফআইইউ'র কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আমিনুল হক বাপ্পী বলেন, "এই ধরনের প্রতারণার ফাঁদ থেকে বাঁচতে অনলাইনে এই ধরনের লিংক দেখলে সেগুলো আগে যাচাই করে তারপর সেখানে প্রবেশ করা উচিত। তা না হলে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হতে পারে"। আর এর মাধ্যমে কেউ প্রতারিত হলে দ্রুতই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। [বিবিসি বাংলা]