কেপ ভার্দে গোলকিপার © সম্পাদিত ছবি
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই বড় চমক দেখাল কেপ ভার্দে। লা রোজা খ্যাত শক্তিশালী স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়ে ফুটবল বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে আফ্রিকার এই ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রটি।
ম্যাচে জর্ডানের রেফারি আদহাম মাখাদমেহ যখন শেষ বাঁশি বাজালেন, স্প্যানিশ খেলোয়াড়রা তখন হতাশায় মাথায় হাত রাখলেন। অন্যদিকে কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা উল্লাসে ফেটে পড়লেন। কেপ ভার্দে টুর্নামেন্টের অন্যতম দুর্বল দল হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। তবে তাদের আশা ছিল আকাশচুম্বী। এই ঐতিহাসিক অর্জনের পেছনে বহু বছর আগে শুরু হওয়া এক অবিশ্বাস্য ফেরার গল্প আছে। গল্পের সূচনা মূলত কয়েক বছর আগের ‘লিঙ্কডইন প্রকল্প’ থেকে।
টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগেও কেপ ভার্দে ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়েছিল। এটি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোট দেশ। জনসংখ্যার দিক থেকেও এটি তৃতীয় সর্বনিম্ন। এর আগে কেবল কুরাকাও এবং আইসল্যান্ড রয়েছে। প্রায় ৬ লক্ষ মানুষের এই দ্বীপপুঞ্জের মোট আয়তন ৪,০০০ বর্গ কিলোমিটারের সামান্য বেশি। এই আয়তন ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের চেয়েও তিনগুণ ছোট।
তারা ১৯৭৫ সালের জুলাই মাসে স্বাধীনতা লাভ করে। এরপর ১৯৮৬ সালে দলটি ফিফাতে যোগ দেয়। প্রথম কয়েক দশকে মূলত কিছু অপেশাদার ফুটবলার নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। প্রকৃতপক্ষে এই দেশে কোনো আনুষ্ঠানিক স্থানীয় লীগ নেই। প্রতিটি দ্বীপের নিজস্ব টুর্নামেন্ট হয়। সেই টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে রাজধানী প্রাইয়াতে একটি চূড়ান্ত চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়।
ব্যাপক অভিবাসনের কারণে কেপ ভার্দে ভালোভাবেই জানত যে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল প্রতিভারা বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপজয়ী প্যাট্রিক ভিয়েরা কেপ ভার্দীয় বংশোদ্ভূত ছিলেন। পর্তুগালের ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্রাক্তন তারকা নানিও এই দেশেরই বংশোদ্ভূত। বর্তমানে মূল দ্বীপপুঞ্জের ভেতরের তুলনায় বাইরে প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক কেপ ভার্দিয়ান বাস করেন। এই পরিস্থিতির মুখে ২০১০ সালে কোচ লুসিও আন্তুনেস একটি অভিনব প্রস্তাব দেন। তিনি বিদেশে থাকা কেপ ভার্দীয় বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের খুঁজে বের করে জাতীয় দলের হয়ে খেলার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা শুরু করেন।
এই ফুটবলার খোঁজার সবচেয়ে ভাইরাল ঘটনাটি ঘটে ডিফেন্ডার রবার্তো লোপেসের সাথে। তিনি আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন। তবে তার বাবা ছিলেন কেপ ভার্দের বাসিন্দা। ২০১৮ সালে জাতীয় দল কর্তৃপক্ষ পেশাদার যোগাযোগের মাধ্যম লিঙ্কডইনের মাধ্যমে রবার্তোর সাথে যোগাযোগ করে। রবার্তো পর্তুগিজ ভাষা জানতেন না। তাই তিনি প্রথমে সেই বার্তাটি উপেক্ষা করেছিলেন। কয়েক মাস পর কর্তৃপক্ষ ইংরেজিতে আবার বার্তা পাঠায়। এবার রবার্তো সাড়া দেন। আর আজ তিনি স্পেনের বিশ্বমানের ফরোয়ার্ডদের আটকে দিলেন। এই প্রক্রিয়াটি তখন থেকেই 'প্রজেক্ট লিঙ্কডইন' নামে পরিচিতি লাভ করে। দলটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেও একজন ফুটবলার এসেছেন, তার নাম সিজে ডস সান্তোস।
স্পেনের বিরুদ্ধে এই ম্যাচে মূল নায়ক বনে গেছেন কেপ ভার্দের স্থানীয় গোলরক্ষক ভোজিনহা। জোসিমার দিয়াস ফুটবল বিশ্বে ভোজিনহা নামে পরিচিত। তিনি ১৯৮৬ সালে কেপ ভার্দের মিন্ডেলোতে জন্মগ্রহণ করেন। দাদা-দাদির কাছে বেড়ে ওঠা এই খেলোয়াড়ের নামকরণ করা হয় কিংবদন্তিতুল্য ব্রাজিলিয়ান ফুল-ব্যাকের নামে। তিনি যখন বিদেশে, অ্যাঙ্গোলায় তাঁর ক্যারিয়ার শুরু করেন, তখন সেখানে ইতিমধ্যেই জোসিমার ডাকনামের একজন ফুটবলার ছিলেন। তাই তিনি জোসিমার ২ হননি। এর বদলে তিনি সেই ডাকনামটিই গ্রহণ করেন যা তিনি ছোটবেলায় রাস্তায় বড় ছেলেদের সাথে খেলার সময় পেয়েছিলেন। বর্তমানে পর্তুগালের চাভেস ক্লাবের হয়ে খেলা এই ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ম্যাচের পুরোটা সময় স্প্যানিশ আক্রমণভাগকে হতাশ করেছেন। স্পেনের বিপক্ষে তাঁর পারফরম্যান্স সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ২৫,০০০ থেকে বাড়িয়ে বিশ লক্ষ বা দুই মিলিয়নেরও বেশি করে দিয়েছে।
দলের আরেকজন কিংবদন্তি খেলোয়াড় হলেন ইয়ানিকে দোস সান্তোস তাভারেস, যিনি ‘স্তোপিরা’ নামে পরিচিত। রাজধানী প্রাইয়াতে জন্মগ্রহণ করা ৩৮ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার এসওয়াতিনির বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের জয়ে গোল করেছিলেন। সেই গোলের মাধ্যমেই দল প্রথমবার বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন নিশ্চিত করে। তিনি তোরেন্সের হয়ে একটি ঐতিহাসিক মৌসুম কাটিয়ে এসেছেন। দ্বিতীয় বিভাগে থাকা সত্ত্বেও তারা পর্তুজাল কাপ জিতেছিল। তারা ফাইনালে স্পোর্টিং সিপি-র মতো শক্তিশালী দলকে পরাজিত করেছিল। এই জয়ের পেছনে ছিল স্তোপিরার গোল। তিনি অতিরিক্ত সময়ের পেনাল্টি থেকে এই গোলটি করেছিলেন। তিনি ইতিহাস গড়া অব্যাহত রাখতে চান।
২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য কেপ ভার্দের যোগ্যতা অর্জন কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি তাদের টেকসই প্রবৃদ্ধির ফল। ২০১৪ সালে প্রাইয়াতে জাতীয় স্টেডিয়ামের উদ্বোধন হয়। এরপর থেকে তারা নিজেদের মাঠে খেলার সুযোগ পায় এবং ক্রমাগত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তারা ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসে খেলে। সেবারই তারা কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছিল। এরপর তারা ২০১৫, ২০২১ ও ২০২৩ সালেও পুনরায় যোগ্যতা অর্জন করে এবং শীর্ষ আটের মধ্যে জায়গা করে নেয়।
প্রধান কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো, বা সংক্ষেপে বুবিস্তা, দলটিকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। তিনিই প্রথম যিনি দলকে আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসের জন্য যোগ্যতা অর্জন করিয়েছেন। যদিও তারা ২০২৫ সালের আসরে সুযোগ পায়নি, তবে তাদের মনোযোগ ছিল অন্য দিকে। কেপ ভার্দে বাছাইপর্বে ক্যামেরুনের মতো একটি ঐতিহাসিক দলকে পেছনে ফেলে। তারা নিজেদের গ্রুপে শীর্ষস্থান দখল করে। তারা সাতটি জয়, দুটি ড্র ও মাত্র একটি পরাজয় নিয়ে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জন করে। এই দলটি নিজেদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন। তারা রক্ষণভাগে অত্যন্ত সুসংগঠিত থাকে এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণের ওপর নির্ভর করে খেলে। আর এই কৌশলেই তারা নিজেদের বিশ্বকাপ অভিষেকেই বিশ্বকে চমকে দিল।
কেপ ভার্দের ইতিহাস অবশ্য দাসপ্রথা ও বেদনার অতীতে মোড়ানো। এটি আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্তে, সেনেগালের উপকূলের কাছে অবস্থিত। আটলান্টিক মহাসাগরের মাঝখানে হওয়ায় ঔপনিবেশিক যুগে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম দাস ব্যবসার বন্দর ছিল। মানব ব্যবসাই একসময় এই অঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। সপ্তদশ শতকে এই ব্যবসা তার শীর্ষে পৌঁছেছিল। ১৮৭৬ সালে দ্বীপপুঞ্জে দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘটে। এই বিলুপ্তি যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, অর্থনৈতিকভাবে তার প্রভাব ততটাই নেতিবাচক ছিল। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ মারা যান। এই কারণে আরও কয়েক লক্ষ মানুষ জীবন পুনর্গঠনের জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। সেই দুঃখী অতীতের দেশ আজ ফুটবলের হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য গৌরবের অধ্যায় রচনা করল।