মেসি ও মাহারেজ © সংগৃহীত
বিশ্বকাপে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার মিশন শুরু করতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা। প্রথম ম্যাচেই তাদের প্রতিপক্ষ আফ্রিকার শক্তিশালী দল আলজেরিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় আগামীকাল সকাল ৭টায় শুরু হবে এই হাইভোল্টেজ ম্যাচ।
১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর বিশ্বের আর কোনো দল টানা দুইবার বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। এবার লিওনেল স্কালোনির দলের সামনে রয়েছে সেই ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়ার সুযোগ। একই সাথে ফুটবল ইতিহাসের রেকর্ড ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ মঞ্চে পা রেখে অনন্য এক ইতিহাস গড়বেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। সুপারকম্পিউটার (ওপ্টার) প্রাক-ম্যাচ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৬৮ শতাংশ সম্ভাবনা নিয়ে এই ম্যাচে স্পষ্ট ফেভারিট হিসেবে মাঠে নামবে আলবিসেলেস্তেরা। অন্যদিকে আলজেরিয়ার জয়ের সম্ভাবনা মাত্র ১৩% শতাংশ এবং ম্যাচটি ড্র হওয়ার সম্ভাবনা ১৮ শতাংশ।
২০২২ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে নিজেদের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে আচমকা হেরে বসেছিল আর্জেন্টিনা। পরে অবশ্য দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে তারা শিরোপা জিতেছিল। এবার শুরুতেই তেমন কোনো অঘটন এড়াতে দারুণ সতর্ক থাকবে স্কালোনির দল। লিওনেল মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপ হওয়ায় এই আসর ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের প্রত্যাশাও আকাশচুম্বী। শক্তিশালী বাছাইপর্ব ও সাম্প্রতিক প্রীতি ম্যাচগুলোর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে এবার আলজেরিয়ার কাছে আর্জেন্টিনার হারের সম্ভাবনা খুবই কম।
দুই দলের খেলার ফরমেশন ও কৌশলগত স্টাইল
কোচ লিওনেল স্কালোনি এই ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে তাদের চেনা ৪-৩-৩ ফরমেশনে মাঠে নামাবেন। এই ফরমেশনে আর্জেন্টিনার মূল কৌশল হবে ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের করা রাখা। মাঝমাঠের ক্রিয়েটিভিটি ব্যবহার করে তারা ছোট ছোট পাসে আক্রমণ তৈরি করবে। এই সিস্টেমে অধিনায়ক লিওনেল মেসি মাঠে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে খেলবেন। তিনি মাঝমাঠ থেকে খেলা তৈরি করবেন এবং তার নিখুঁত পাস ধরে বক্সে আক্রমণ চালাবেন লাউতারো মার্টিনেজ ও জুলিয়ান আলভারেজের মতো বিশ্বমানের স্ট্রাইকাররা।
অন্যদিকে, ‘ডেজার্ট ফক্স’ খ্যাত আলজেরিয়া দল মাঠে নামবে ৪-২-৩-১ ফরমেশনে। কোচ ভ্লাদিমির পেটকোভিচের এই ফরমেশনের মূল স্টাইল হবে রক্ষণাত্মক ও প্রতি-আক্রমণনির্ভর। তারা কেবল নিজেদের বক্সে রক্ষণভাগ আগলে বসে থাকবে না। আলজেরিয়ার কৌশল হলো মাঝমাঠে একটি শক্ত ব্লক তৈরি করা, যাতে আর্জেন্টিনার বল কেড়ে নেওয়া যায়। এরপর উইং ধরে তাদের গতিশীল ফরোয়ার্ডদের মাধ্যমে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে উঠে আর্জেন্টাইন ডিফেন্সকে ব্যস্ত রাখা। রিয়াদ মাহরেজ এবং আমুরার ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ও গতিই হবে আলজেরিয়ার প্রধান অস্ত্র।
ওপ্টার ভবিষ্যদ্বাণী
২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা। তবে ২০২৬ সালের টুর্নামেন্টে শিরোপা জেতার দৌড়ে ওপ্টা সুপারকম্পিউটার আর্জেন্টিনাকে রেখেছে চতুর্থ স্থানে (৯.৮% সম্ভাবনা)। ওপ্টার মতে স্পেন, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের শিরোপা জেতার সম্ভাবনা আর্জেন্টিনার চেয়ে বেশি। তবে শিরোপার লড়াইয়ে যাওয়ার আগে আর্জেন্টিনাকে গ্রুপ ‘জে’ পার হতে হবে, যেখানে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়া এবং জর্ডান। ওপ্টার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ৭০.৩% সম্ভাবনা নিয়ে আর্জেন্টিনাই এই গ্রুপের শীর্ষে থাকবে।
ইতালি (১৯৩৪-১৯৩৮) এবং ব্রাজিলের (১৯৫৮-১৯৬২) পর তৃতীয় দল হিসেবে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ড গড়তে চায় আলবিসেলেস্তেরা। পুরুষ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের (৫টি), জার্মানি ও ইতালির (৪টি করে) পরেই রয়েছে আর্জেন্টিনা (৩টি)। তবে ১৯৭৮ সালে প্রথম শিরোপা জেতার পর থেকে আর্জেন্টিনার চেয়ে বেশি বিশ্বকাপ আর কোনো দেশ জেতেনি। আর্জেন্টিনা সাধারণত বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে অঘটন এড়াতে পটু। গত ১৪টি আসরের মধ্যে ১৩ বারই তারা প্রথম রাউন্ড পার হয়েছে, ব্যতিক্রম ছিল শুধু ২০০২ সাল। সর্বশেষ ১৯৯০ সালে ক্যামেরুনের কাছে ১-০ গোলে হেরে তারা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে গোল করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
মেসির রেকর্ড ও আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ
আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের মূল ভরসা যথারীতি ৩৮ বছর বয়সী লিওনেল মেসি, তার ঝুলিতে রয়েছে ১৩টি বিশ্বকাপ গোল এবং ৮টি অ্যাসিস্ট। গত বুধবার আইসল্যান্ডের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে মাত্র তিন মিনিটের মাথায় পেনাল্টি থেকে গোল করেন তিনি। বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ২৬টি ম্যাচ খেলার রেকর্ড মেসির দখলে। এই ম্যাচে মাঠে নামলেই তিনি ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে 'ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার রেকর্ড গড়বেন।' অবশ্য পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও পরবর্তীতে এই রেকর্ড স্পর্শ করতে পারেন।
তবে কোচ লিওনেল স্কালোনি শুধু মেসির ওপর নির্ভর করতে চান না। দলের আক্রমণভাগে আছেন জুলিয়ান আলভারেজ এবং লাউতারো মার্টিনেজের মতো বিশ্বমানের স্ট্রাইকাররা। এটি আর্জেন্টিনার ১৯তম বিশ্বকাপ। ২০১৪ সালের পর এবারই প্রথম কনমেবল অঞ্চলের বাছাইপর্বে শীর্ষে থেকে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। বাছাইপর্বে মেসি ৮টি গোল করেছেন এবং আলভারেজ ও মার্টিনেজ প্রত্যেকে ৪টি করে গোল দিয়ে তাকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন। আর্জেন্টিনা টানা ১৪ বার বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে, যা বিশ্ব ফুটবলে বর্তমানে তৃতীয় সর্বোচ্চ (ব্রাজিল ২৩ বার এবং জার্মানি ১৯ বার)।
কাগজে-কলমে আর্জেন্টিনাই স্পষ্ট ফেভারিট। মিডফিল্ড ও আক্রমণভাগে তাদের রয়েছে অসাধারণ শক্তি। লাউতারো মার্তিনেজের গোল করার দক্ষতা, হুলিয়ান আলভারেজের কারিগরি সামর্থ্য, নিকো পাসের উত্থান, এনজো ফার্নান্দেজের আক্রমণাত্মক অবদান এবং জুলিয়ানো সিমিওনের গতি প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি। এর সঙ্গে রয়েছেন লিওনেল মেসি। সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচিত মেসি এখনও বয়সকে হার মানিয়ে যাচ্ছেন। গত মৌসুমে ইন্টার মায়ামির হয়ে ৪৩ গোল করেছেন তিনি এবং বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও সাম্প্রতিক প্রীতি ম্যাচগুলোতেও দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় ছিলেন।
শক্ত প্রতিপক্ষ আলজেরিয়া
আলজেরিয়াকে সহজ প্রতিপক্ষ ভাবার কোনো সুযোগ নেই। আফ্রিকান অঞ্চলের বাছাইপর্বে ভ্লাদিমির পেটকোভিচের দল ১০ ম্যাচে ২৪টি গোল করেছে। কেবল গাম্বিয়া (২৭) এবং আইভরি কোস্ট (২৫) তাদের চেয়ে বেশি গোল করেছে। আলজেরিয়ার এই সাফল্যের মূল নায়ক মোহাম্মদ আমুরা। তিনি বাছাইপর্বে ১০ ম্যাচে ১০টি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। তবে উলফসবার্গের এই স্ট্রাইকার এবং বাগদাদ বুনেদজাহ (৩ গোল) ছাড়া অন্য কোনো আলজেরিয়ান খেলোয়াড় একাধিক গোল করতে পারেননি। কোচ পেটকোভিচ হয়তো আমুরার ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। কারণ দলের ২৪টি গোলোর মধ্যে ৫৮% গোলের সাথেই আমুরা সরাসরি জড়িত ছিলেন (১০টি গোল ও ৪টি অ্যাসিস্ট)।
তা সত্ত্বেও, আমুরার দুর্দান্ত ফর্মের ওপর ভর করেই আলজেরিয়া তাদের পঞ্চম বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছে। ২০১৪ সালের পর এটিই তাদের প্রথম বিশ্বকাপ। সেবার ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপেই তারা কেবল প্রথম রাউন্ড পার হতে পেরেছিল। তবে ওপ্টা সুপারকম্পিউটার এবার তাদের নকআউট পর্বে যাওয়ার ৫৭.১% সম্ভাবনা দেখছে। বিশ্বমঞ্চে আলজেরিয়ার অতীত রেকর্ড অবশ্য খুব একটা ভালো নয়। তাদের খেলা শেষ ১০টি বিশ্বকাপ ম্যাচের মধ্যে তারা জিতেছে মাত্র একটিতে (১২ বছর আগে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে ৪-২ ব্যবধানে)। বাকি দুটি জয় এসেছিল সেই ১৯৮২ সালে। রক্ষণভাগেও তাদের দুর্বলতা রয়েছে; ১৩টি বিশ্বকাপ ম্যাচের মধ্যে তারা কেবল একটি ম্যাচে কোনো গোল খায়নি (২০১০ সালে ইংল্যান্ডের সাথে ০-০ ড্র)।
আলজেরিয়াকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের আক্রমণভাগ। অধিনায়ক মাহরেজ এখনও দলের প্রধান ভরসা। তবে একমাত্র তিনিই নন, ইব্রাহিম মাজা এবং মার্সেইয়ের ফরোয়ার্ড গুইরিও আর্জেন্টিনার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারেন। গুইরি জাতীয় দলের হয়ে সর্বশেষ চার ম্যাচে চারটি গোল করেছেন। ইব্রাহিম মাজা মাঝে মাঠে সৃজনশীলতা যোগ করবেন, আনিস হাজ মুসা উইং থেকে বিপজ্জনক হতে পারেন। গোলপোস্টের নিচে থাকবেন ফরাসি কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের ছেলে লুকা জিদান। মাঝমাঠে বেনতালেব ও বুদাউই রক্ষণকে সহায়তা করার পাশাপাশি বলের দখল ধরে রাখার দায়িত্ব পালন করবেন। তবে আফ্রিকার দলটি গোল পেতেও সক্ষম। জুনের শুরুতে তারা প্রীতি ম্যাচে বলিভিয়াকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং নেদারল্যান্ডসকে তাদের ঘরের মাঠে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে চমকে দিয়েছে। ফলে দলের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে।
মুখোমুখি লড়াইয়ের ইতিহাস
বিশ্বকাপের মঞ্চে এবারই প্রথম এই দুই দল মুখোমুখি হচ্ছে। তবে এর আগে ২০০৭ সালের জুনে বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যু-তে একটি প্রীতি ম্যাচে তারা মুখোমুখি হয়েছিল। সেই রোমাঞ্চকর ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৪-৩ ব্যবধানে জিতেছিল, যেখানে তরুণ মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক জোড়া গোল করেছিলেন। কার্লোস তেভেজও সেই ম্যাচে গোল করেছিলেন। অন্যদিকে আলজেরিয়ার পক্ষে নাদির বেলহাদজি দুটি গোল করেছিলেন।
বিশ্বকাপে দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলোর বিরুদ্ধে আলজেরিয়ার রেকর্ড মিশ্র। ১৯৮২ সালে তারা চিলিকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়েছিল এবং ১৯৮৬ সালে ব্রাজিলের কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরেছিল। অন্যদিকে, ১৯৯০ সালে ক্যামেরুনের কাছে হারার পর থেকে আফ্রিকার দলগুলোর বিরুদ্ধে বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ ছয়টি ম্যাচের সবকটিতেই জিতেছে আর্জেন্টিনা, যার মধ্যে পাঁচটি জয়ই এসেছে নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে।
সম্ভাব্য ফল
আর্জেন্টিনা ৩-১ আলজেরিয়া
সম্ভাব্য একাদশ
আর্জেন্টিনা : ইমিলিয়ানো মার্টিনেজ; গঞ্জালো মন্টিয়েল, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, ফাকুন্দো মেদিনা; এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, রদ্রিগো ডি পল; লিওনেল মেসি, থিয়াগো আলমাদা, লাউতারো মার্টিনেজ।
আলজেরিয়া : জিনেদিন জিদান; আবাদা, আইসা মান্দি, রামি বেনসেবাইনি, রায়ান আইত-নুরি; রামিজ জেরুকি, নাবিল বেন্টালেব; হুসেম আউয়ার, রিয়াদ মাহরেজ, মোহাম্মদ আমুরা; আমিন গুইরি।