ইরান ফুটবল দল © সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক বিতর্ক ও ভিসা জটিলতাকে পেছনে ফেলে অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ফুটবল বিশ্বকাপ খেলতে মাঠে নামছে ইরান। বাংলাদেশ সময় আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ৭টায় লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড।
যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে শুরু থেকে বিশ্বকাপ খেলতে অনিচ্ছুক ইরান একাধিকবার ভেন্যু পরিবর্তনের আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত ফিফা তা রাজি হয়নি। ফলে নানামুখী প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে মেক্সিকোতে প্রস্তুতি ক্যাম্প এবং তুরস্কে নিজেদের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি সারতে হয়েছে তাদের। এমনকি বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র দু-একদিন আগে মার্কিন ভিসা পাওয়ায় ম্যাচের মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারছে ইরান দল। মাঠের বাইরের এই সমস্ত বিশৃঙ্খলা ও চরম অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ইরানকে বেশ আত্মবিশ্বাসী মনে হচ্ছে, তবে এমন বৈরী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তাদের বড় চ্যালেঞ্জ জানাতে পুরোপুরি প্রস্তুত আন্ডারডগ নিউজিল্যান্ড।
মাঠের বাইরের এতসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ইরান দুর্দান্ত এক কোয়ালিফাইং রাউন্ড পার করে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে নিজেদের বিশ্বকাপ টিকিট নিশ্চিত করে। কোচ আমির ঘালেনোইর অধীনে ইরান বর্তমানে দারুণ ছন্দে রয়েছে। তারা তাদের সর্বশেষ প্রস্তুতি ম্যাচগুলোতে মালিকে ২-০, গাম্বিয়াকে ৩-১ এবং কোস্টারিকাকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের একমাত্র হারটি ছিল গত মার্চ মাসে, নাইজেরিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে তারা ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল। সব মিলিয়ে ঘালেনোইর দলটি বেশ গোছানো এবং মাঠের খেলায় তারা পরিষ্কার ফেভারিট।
অন্যদিকে, নিউজিল্যান্ড তাদের ফুটবল ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে তিনটি ম্যাচ ড্র করার পর এই প্রথম তারা বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিল। এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে ফিফা র্যাংকিংয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দল নিউজিল্যান্ড (র্যাংকিং ৮৫)। গ্রুপ ‘জি’-তে তাদের সবচেয়ে দুর্বল দল হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, তারা ইরানের মাঠের বাইরের এই দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি ও মানসিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম জয় তুলে নিতে মরিয়া।
এই গ্রুপে বেলজিয়াম ও মিশরের মতো শক্তিশালী দল থাকায় ইরান ও নিউজিল্যান্ড—উভয় দলের জন্যই কাজটা কঠিন। তবে যেহেতু এবার বর্ধিত নিয়মে সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দলও নকআউট পর্বে যাওয়ার সুযোগ পাবে, তাই এই দুই আন্ডারডগের সামনে দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়ার একটি বড় স্বপ্ন রয়েছে। আর সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য উদ্বোধনী ম্যাচেই জয় পাওয়াটা অত্যন্ত জরুরি।
মাঠের শক্তিমত্তা ও সাম্প্রতিক ফর্মের বিচারে নিউজিল্যান্ডের চেয়ে ইরান বেশ এগিয়ে থাকায় ফুটবল বিশ্লেষকরা ইরান ২-০ নিউজিল্যান্ড ব্যবধানে জয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করছেন। গত মার্চ মাসে চিলির বিপক্ষে ৪-১ গোলের একটি দুর্দান্ত জয় ছাড়া নিউজিল্যান্ড তাদের শেষ চার ম্যাচের একটিতেও কোনো গোল করতে পারেনি। তারা তাদের শেষ ১১টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে জিতেছে এবং ৯টি ম্যাচেই হেরেছে।
বিপরীতে, ইরান তাদের শেষ ১২টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র ৩টিতে হেরেছে এবং শেষ ৫ ম্যাচে তারা ৬টি গোল করেছে। ফিফা র্যাংকিংয়ে ইরান ২০ নম্বরে এবং নিউজিল্যান্ড ৮৫ নম্বরে থাকায় দুই দলের ব্যবধান স্পষ্ট। নিউজিল্যান্ড সাধারণত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করলেও রক্ষণে প্রচুর ফাঁকা জায়গা ফেলে যায়, যার সুযোগ নিয়ে ইরান একটি সহজ জয় তুলে নিতে পারে।
ইরান দলের সবচেয়ে বড় তারকা অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার মেহেদি তারেমি। অলিম্পিয়াকোসের এই ফরোয়ার্ড দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ৬০টি গোল করেছেন এবং বাছাইপর্বে তিনি ১০টি গোল ও ৭টি অ্যাসিস্ট করে দারুণ ফর্মে আছেন। ইরান দলের বড় শক্তির জায়গা হলো তাদের দলগত বোঝাপড়া। মাঝমাঠে খেলবেন এফসি রস্তভের মোহাম্মদ মোহেবি এবং রক্ষণভাগ সামলানোর দায়িত্বে থাকবেন অভিজ্ঞ শুজা খলিলজাদেহ।
গোলপোস্টের নিচে ইরানের আস্থা ৮২টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা অভিজ্ঞ গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ। ইনজুরি কাটিয়ে মাঝমাঠের রুবেন চেশমি, মেহেদি তোরাবি এবং সাইদ এজাতোলাহি পুরোপুরি ফিট হয়ে দলে ফিরেছেন। তবে বড় চমক হচ্ছে, দলের তারকা স্ট্রাইকার সরদার আজমুনকে চূড়ান্ত স্কোয়াড থেকে বাদ দিয়েছেন কোচ ঘালেনোই। সাবেক ফেইনুর্ড উইঙ্গার আলিরেজা জাহানবখশের ম্যাচে খেলা নিয়ে কিছুটা ফিটনেস শঙ্কা থাকলেও ইরান তাদের সেরা একাদশ নিয়েই মাঠে নামবে।
নিউজিল্যান্ডের সাফল্যের সিংহভাগ আশা ভরসা নির্ভর করছে নটিংহাম ফরেস্টের সেন্টার ফরোয়ার্ড ক্রিস উডের ওপর। ইনজুরি কাটিয়ে তিনি এখন পুরোপুরি ফিট। মাঝমাঠে সোয়ানসি সিটির মার্কো স্টামেনিচ এবং জো বেল ডাবল পিভট হিসেবে খেলবেন। উইংয়ে থাকবেন ডানদিকে ম্যাথিউ গারবেট এবং বামদিকে এলিজা জাস্ট। মিলওয়ালের গোলরক্ষক ম্যাক্স ক্রোকম্বেকে আজ ইরানের আক্রমণ সামলাতে ব্যস্ত সময় পার করতে হবে, আর রক্ষণের নেতৃত্ব দেবেন মিনেসোটা ইউনাইটেডের সেন্টার ব্যাক মাইকেল বক্সাল। তবে সবার নজর থাকবে রাইট ব্যাক টিম পেনের দিকে, যিনি ইতিমধ্যে ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন।
দুই দলের সম্ভাব্য শুরুর একাদশ
ইরানের সম্ভাব্য শুরুর একাদশ (৪-৩-৩): আলিরেজা বেইরানভান্দ; রামিন রেজাইয়ান, শুজা খলিলজাদেহ, মজিদ কানানি, এহসান হাজসাফি; সাইদ এজাতোলাহি, রাজাগিনিয়া; মোহাম্মদ মোহেবি, সামান ঘোদোস, মেহেদি ঘায়েদি; মেহেদি তারেমি।
নিউজিল্যান্ডের সম্ভাব্য শুরুর একাদশ (৪-২-৩-১): ম্যাক্স ক্রোকম্বে; টিম পেন, টমি সুরম্যান, মাইকেল বক্সাল, লিবারাতো কাকাচ; মার্কো স্টামেনিচ, জো বেল; ম্যাথিউ গারবেট, সারপ্রীত সিং, এলিজা জাস্ট; ক্রিস উড।