কঠিন সময়েও যেভাবে ড্রেসিংরুম শান্ত রাখে আর্জেন্টিনার ‘২ স্তরের নেতৃত্ব’

১৫ জুন ২০২৬, ০২:০৪ PM
আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ ফুটবলাররা

আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞ ফুটবলাররা © সংগৃহীত

ক্যাম্পাস মিনারেলস ন্যাশনাল পারফরম্যান্স সেন্টারের লকার রুমের দরজা খুলতেই ক্যামেরার ক্লিকের শব্দে ভেঙে যায় নিস্তব্ধতা। মাঠে নামা প্রতিটি আর্জেন্টিনা খেলোয়াড়ই ক্যামেরার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। কখনও এর কারণ তাদের শারীরিক অবস্থা। যেমন এমিলিয়ানো মার্তিনেজের হাতের ফিটনেস, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো অনুশীলনের সঙ্গে তাল মিলাচ্ছেন কি না, কিংবা নতুন যোগ দেওয়া মার্কোস সেনেসিকে ঘিরে কৌতূহল। আবার কখনও হুলিয়ান আলভারেসের কোটি ডলারের ট্রান্সফার গুঞ্জন বা সিরি আ-র শীর্ষ গোলদাতা লাউতারো মার্তিনেজের উপস্থিতি।

তবে এসব আলোচনার বাইরে এমন একটি মূল গোষ্ঠী রয়েছে, যারা দলের প্রতিদিনের পরিবেশ ও মানসিক ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা হলেন লিওনেল মেসি, রদ্রিগো দে পল, নিকোলাস ওতামেনদি এবং লিয়ান্দ্রো পারেদেস। এই চারজনই আলাদা বৈশিষ্ট্যের হলেও ড্রেসিংরুমের আবহ নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিরোপা রক্ষার নতুন অভিযানের আগে দল যখন প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন নেতৃত্বের এই স্তরগুলোই আর্জেন্টিনাকে স্থির রাখছে।

এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, সেনেসি, আলভারেজ, লাউতারো মার্তিনেজ সবাইকে ঘিরেই ছিল আলোচনার কেন্দ্র। কিন্তু তাদের ছাপ ছাড়িয়ে দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রস্তুতি পর্ব মোটেও সহজ ছিল না। চোট, অনিশ্চয়তা এবং শেষ মুহূর্তে স্কোয়াড পরিবর্তনের চাপ সামলাতে হয়েছে কোচিং স্টাফকে। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিওনার্দো বালের্দি, নাহুয়েল মলিনা, গনসালো মন্তিয়েল, নিকোলাস গনসালেস, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, নিকোলাস পাস, হুলিয়ান আলভারেস এবং লিয়ান্দ্রো পারেদেস—অনেকেই শারীরিক সমস্যায় ভুগেছেন। ফলে একাধিকবার স্কোয়াড পুনর্বিন্যাস করতে হয়েছে। কিন্তু এই অস্থিরতার মধ্যেও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব নিশ্চিত করেছে যে অনুশীলন ক্যাম্পের পরিবেশ কখনও ভেঙে পড়েনি।

এই নেতৃত্ব হঠাৎ তৈরি হয়নি। গত প্রায় আট বছর ধরে একসঙ্গে খেলে তারা একটি অভিন্ন সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। লিওনেল মেসি এবং নিকোলাস ওতামেনদি সেই সময়ের সাক্ষী, যখন আর্জেন্টিনা একের পর এক শিরোপা হাতছাড়া করেছে। পরে লিওনেল স্কালোনি যুগ শুরু হলে কোপা আমেরিকা ২০২১, ফাইনালিসিমা এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে দলটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। এই ধারাবাহিক সাফল্য শুধু ট্রফি নয়, বরং নেতৃত্বের এক স্থায়ী কাঠামো তৈরি করে দেয়।

এই কাঠামোর বাইরে আরও একটি দ্বিতীয় স্তরের প্রভাবশালী গোষ্ঠী রয়েছে। জিওভানি লো সেলসো, এনজো ফার্নান্দেস, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ এবং ক্রিস্টিয়ান রোমেরো—তারা সরাসরি মূল নেতৃত্ব না হলেও দলের ভেতরের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এই দুই স্তরের সমন্বয়ই আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যকে শক্ত করে।

প্রত্যেক নেতার ভূমিকা আলাদা হলেও তাদের প্রভাব সমানভাবে কার্যকর। নিকোলাস ওতামেনদি প্রয়োজনে কঠোর অবস্থান নেন এবং মাঠের বাইরেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখেন। রদ্রিগো দে পল তার রসবোধ ও উচ্ছ্বাস দিয়ে ড্রেসিংরুমকে প্রাণবন্ত রাখেন এবং তিনি দলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধাদের একজন হিসেবে পরিচিত। লিয়ান্দ্রো পারেদেস ইনজুরির সময়েও কোচিং স্টাফের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকেন। আর লিওনেল মেসি সবকিছুর কেন্দ্রে থেকে নীরব অথচ সর্বজনস্বীকৃত নেতৃত্ব দিয়ে যান—যেখানে বড় সিদ্ধান্তে তার মতামতই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়।

এই নেতৃত্ব কাঠামোর সঙ্গে লিওনেল স্কালোনির সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। তিনি এবং লিওনেল মেসি একে অপরকে বহু বছর ধরে চেনেন, ২০০৬ বিশ্বকাপ থেকেই তাদের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়। কোচ জানেন, দলের ভেতরের পরিবেশ বোঝার ক্ষেত্রে এই সিনিয়র খেলোয়াড়দের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অনেক কঠিন সিদ্ধান্তেও তিনি তাদের সমর্থন ও বোঝাপড়ার ওপর ভরসা রাখেন।

সবাই খেলতে চাইলেও দলীয় লক্ষ্যই এখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আগের কোপা আমেরিকায় লিসান্দ্রো মার্তিনেজ দলে সুযোগ পাওয়ায় নিকোলাস ওতামেনদিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বা ভিন্ন পজিশনে মানিয়ে নিতে হয়েছে। আবার লিয়ান্দ্রো পারেদেস ইনজুরির সময়েও তার ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। তবুও এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই লিওনেল মেসি অনুশীলন ক্যাম্পের কিছু দলগত ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন, যা দলের ঐক্যের বার্তা আরও শক্তভাবে তুলে ধরে।

অনুশীলনের ভেতরেও এই ঐক্য স্পষ্ট। কাজ ভাগ করে নেওয়া হোক বা কৌশলগত আলোচনা—সব ক্ষেত্রেই খেলোয়াড়রা একসঙ্গে কাজ করেন। হাসি, আলোচনা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া তাদের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ।

গত কয়েক সপ্তাহ ছিল এই দলের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। কখনও একাধিক খেলোয়াড় আলাদা অনুশীলন করেছেন, কখনও চোট নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। তবুও স্পোর্টিং কানসাস সিটির প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং অরিজিন হোটেলে পরিবেশ কখনও বিশৃঙ্খল হয়নি। বরং সব সময়ই দেখা গেছে একটি নিয়ন্ত্রিত, অভ্যস্ত ও শান্ত দলকে।

দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতা তাদের একটি আলাদা দক্ষতা দিয়েছে। তারা জানে কখন শক্তি কমাতে হবে, কখন বিশ্রাম নিতে হবে এবং কীভাবে বড় টুর্নামেন্টের চাপ সামলাতে হয়। এই অভ্যাস নতুন খেলোয়াড়দের জন্যও সহজ পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে তারা আগে থেকেই গড়ে ওঠা একটি কাঠামোর ভেতরে নিজেদের মানিয়ে নেয়।

সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা দল এখন একাধিক স্তরের নেতৃত্ব কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন লিওনেল মেসি, তার চারপাশে রদ্রিগো দে পল, নিকোলাস ওতামেনদি এবং লিয়ান্দ্রো পারেদেস, আর দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে আরও একাধিক অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী খেলোয়াড়। এই সমন্বিত কাঠামোই নিশ্চিত করছে যে কঠিন সময়েও ড্রেসিংরুমে স্থিরতা নষ্ট হয় না।

এই নীরব কিন্তু শক্তিশালী নেতৃত্বই ব্যাখ্যা করে কেন আর্জেন্টিনা শুধু একটি স্কোয়াড নয়, বরং একটি সংগঠিত দল হিসেবে মাঠে নামে—যেখানে শেষ কথা সব সময়ই বলেন লিওনেল মেসি।

প্রধানমন্ত্রীর আগমনের আগেই ভেঙে পড়ল সভামঞ্চের প্যান্ডেল
  • ১৭ জুন ২০২৬
মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে গবেষণায় আন্তর্জাতিক পুরস্কার…
  • ১৭ জুন ২০২৬
বাজেট বৈষম্য নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে প্ল্যাকার্ড হাত…
  • ১৭ জুন ২০২৬
সুস্থ থাকতে খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন ফাইবার ও প্রোটিনসমৃদ্ধ…
  • ১৭ জুন ২০২৬
ওসমান হাদিকে হত্যা মামলায় সম্পূরক তদন্ত প্রতিবেদন ২৮ জুন
  • ১৭ জুন ২০২৬
জ্লাতানের চোখে ‘মেসি এখন ফুটবলেরও ঊর্ধ্বে’
  • ১৭ জুন ২০২৬
×