২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচে রেফারি সিমন ও মেসি © সংগৃহীত
বিশ্বকাপের শিরোপাধারী আর্জেন্টিনার সামনে ২০২৬ বিশ্বকাপ অভিযান শুরুর অপেক্ষা। গ্রুপ ‘জে’-এর প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার মুখোমুখি হবে লিওনেল স্কালোনির দল। তবে ম্যাচটি ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের আরেকটি কারণ হয়ে উঠেছেন পোল্যান্ডের রেফারি সিমন মার্সিনিয়াক। তিনি ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
ফিফা ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছে, কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া ম্যাচ পরিচালনা করবেন মার্সিনিয়াক। এর মাধ্যমে তৃতীয়বারের মতো আর্জেন্টিনার ম্যাচে দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন এই পোলিশ রেফারি।
ফুটবলার থেকে রেফারি
বর্তমান সময়ের অন্যতম আলোচিত ও সফল রেফারি সিমন মার্সিনিয়াকের জন্ম ১৯৮১ সালের জানুয়ারিতে। খেলোয়াড়ি জীবন শুরু করেছিলেন নিজের শহরের ক্লাব উইসলা প্লকে। পোল্যান্ডের শীর্ষ লিগেও খেলেছেন তিনি। তবে পরবর্তীতে রেফারিংকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন।
মার্সিনিয়াক এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তরুণ বয়সে একটি ম্যাচে লাল কার্ড দেখার পর রেফারির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি রেফারিংয়ে আগ্রহী হন। ওই রেফারি তাকে বলেছিলেন, ‘যদি মনে করো কাজটি সহজ, তাহলে নিজেই চেষ্টা করে দেখো।’ এরপরই তিনি রেফারিং কোর্সে ভর্তি হন এবং নতুন পথচলা শুরু করেন।
২০০৬ সালে রেফারিং ক্যারিয়ার শুরু করার পর দ্রুতই তিনি ইউরোপীয় ফুটবলের এলিট পর্যায়ে উঠে আসেন। ২০০৯ সালে পোল্যান্ডের শীর্ষ লিগ এক্সট্রাক্লাসার ম্যাচ পরিচালনা শুরু করেন এবং ২০১১ সালে ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন।
এরপর ধাপে ধাপে ইউরোপ ও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য রেফারিতে পরিণত হন তিনি। ২০১৫ সালে অনূর্ধ্ব-২১ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল পরিচালনা করেন। ২০১৬ ইউরোতে তিনটি ম্যাচে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ বিশ্বকাপে দুটি ম্যাচ পরিচালনার পর একই বছর রিয়াল মাদ্রিদ ও অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদের মধ্যকার উয়েফা সুপার কাপের দায়িত্বও পান।
বিশ্বসেরা রেফারির স্বীকৃতি
২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং ২০২৩ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটি ও ইন্টার মিলানের ম্যাচ পরিচালনা করেন মার্সিনিয়াক। টানা ২০২২ ও ২০২৩ মৌসুমে তিনি ‘দ্য ওয়ার্ল্ডস বেস্ট রেফারি’ নির্বাচিত হন। এ পর্যন্ত ৬০০টিরও বেশি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন তিনি। তার রেফারিং ক্যারিয়ারে ২০০টির বেশি পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
গুরুতর অসুস্থতা কাটিয়ে প্রত্যাবর্তন
বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পথ মোটেও সহজ ছিল না মার্সিনিয়াকের জন্য। এক সময় ট্যাকিকার্ডিয়া বা অনিয়মিত দ্রুত হৃদস্পন্দনের সমস্যায় আক্রান্ত হন তিনি। প্রায় দেড় বছর মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে।
এই কারণে ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত ইউরো ২০২০-এ দায়িত্ব পালন করার সুযোগ হারান তিনি। পরে সুস্থ হয়ে আবারও আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিরে আসেন এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ রেফারিদের একজন হিসেবে।
আর্জেন্টিনার সঙ্গে আগের স্মৃতি
আর্জেন্টিনার সঙ্গে মার্সিনিয়াকের প্রথম বিশ্বকাপ-সাক্ষাৎ হয়েছিল ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে। সে সময় আইসল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ১-১ গোলে ড্র করেছিল। সেই ম্যাচটি স্মরণীয় হয়ে আছে লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিসের কারণে। চার বছর পর কাতার বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ২-১ গোলের জয়ের ম্যাচেও দায়িত্বে ছিলেন মার্সিনিয়াক। ওই ম্যাচে গোল করেছিলেন মেসি।
তবে আর্জেন্টিনা ও মার্সিনিয়াকের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় নিঃসন্দেহে ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনাল। লুসাইল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স ৩-৩ গোলে সমতায় শেষ করে ম্যাচ। পরে টাইব্রেকারে জিতে তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে লিওনেল মেসির দল।
সেই ফাইনালে মার্সিনিয়াক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ম্যাচে মোট তিনটি পেনাল্টি দেন তিনি একটি আর্জেন্টিনার পক্ষে এবং দুটি ফ্রান্সের পক্ষে। আর্জেন্টিনার হয়ে মেসি জোড়া গোল করেন, অন্যদিকে কিলিয়ান এমবাপ্পে হ্যাটট্রিক করে ম্যাচকে অবিস্মরণীয় করে তোলেন। শেষ পর্যন্ত এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্টিনেজের দুর্দান্ত নৈপুণ্যে টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা।
ফের আর্জেন্টিনার ম্যাচে
বিশ্বকাপ ২০২৬-এ আর্জেন্টিনার শিরোপা রক্ষার মিশন শুরু হচ্ছে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। ম্যাচটি বাংলাদেশ সময় ১৭ জুন (বুধবার) সকাল ৭টায় কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচটি।
মার্সিনিয়াকের উপস্থিতিকে অনেক সমর্থক আর্জেন্টিনার জন্য শুভ লক্ষণ হিসেবেই দেখছেন। কারণ তার অধীনে পরিচালিত বিশ্বকাপের দুটি ম্যাচেই জয় পেয়েছে আলবিসেলেস্তেরা।
এবারও সেই পোলিশ রেফারির বাঁশিতে মাঠে নামবে লিওনেল মেসির দল। ফলে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি আবারও ফিরে আসছে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের কাছে। এখন দেখার বিষয়, ‘তৃতীয় তারকার রেফারি’ হিসেবে পরিচিত মার্সিনিয়াকের উপস্থিতিতে বিশ্বকাপ অভিযান জয় দিয়েই শুরু করতে পারে কি না বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।