মেক্সিকোর স্ট্রাইকার রাউল হিমেনেজ © সংগৃহীত
মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসে বিশ্বকাপে নিজের দেশের জয়ের নায়ক হয়ে উঠেছেন মেক্সিকোর স্ট্রাইকার রাউল হিমেনেজ। ২০২০ সালে মাথায় ভয়াবহ আঘাত পান তিনি। নিরাপত্তার জন্য এখনো মাথায় শক্ত ব্যান্ড ব্যবহার করেন। পর দীর্ঘ লড়াই শেষে বিশ্বকাপ দলে জয় পান তিনি। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গোল করে মেক্সিকোকে ২–০ ব্যবধানে জিতিয়ে আবেগে কেঁদে ফেলেন তিনি।
মেক্সিকোর বিখ্যাত এস্তাদিও অ্যাজটেকায় প্রায় ৮০ হাজার দর্শকের সামনে ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটি করেন হিমেনেজ। রবার্তো আলভারাদোর ডান দিকের ক্রস থেকে দারুণ এক হেডে বল জালে পাঠান তিনি। গোলের পর উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে ওঠেন, আকাশের দিকে আঙুল তোলেন এবং ধারণা করা হয় তিনি প্রয়াত বাবা রাউল হিমেনেজ ভেগাকে স্মরণ করেন, যিনি মার্চে মারা যান।
গোলের পর পুরো স্টেডিয়াম উল্লাসে ভেঙে পড়ে। সতীর্থরা তাকে ঘিরে ধরে উদযাপন করে। সেই আবেগঘন মুহূর্তে নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে কেঁদে ফেলেন হিমেনেজ।
তার সতীর্থ জুলিয়ান কুইনোনেস বলেন, ‘আমরা সত্যিই তাকে অভিনন্দন জানিয়েছি, কারণ সে দলের জন্য অনেক কিছু দেয়। দলের অংশ হওয়া আমাদের গর্ব, আর জাতীয় দলে সে যে অবদান রাখছে এবং গোল করছে, তা দারুণ বিষয়।’
এই গোলটি ছিল মেক্সিকোর হয়ে তার ১২৫তম ম্যাচে ৪৬তম গোল, যার মাধ্যমে তিনি দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসেন। তার সামনে আছেন শুধু হাভিয়ের হার্নান্দেজ, যিনি করেছেন ৫২ গোল।
বিশ্বকাপে এই ম্যাচটি হিমেনেজের জন্য আরও বিশেষ ছিল, কারণ এর আগে মূল পর্বে তিনি কখনোই শুরু থেকে খেলেননি। আগের তিনটি বিশ্বকাপে তিনি ছয়টি ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন।
ম্যাচের শুরুতেই তিনি গোলের খুব কাছাকাছি চলে যান। চতুর্থ মিনিটে তার শক্তিশালী হাফ ভলি দুর্দান্তভাবে রুখে দেন দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস।
সম্প্রতি ফুলহাম থেকে নিজের পুরোনো ক্লাব উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্সে ফিরে আসা হিমেনেজ ম্যাচের ৬৭তম মিনিটে গোল করে মেক্সিকোর জয় নিশ্চিত করেন।
ম্যাচটি নিয়ে আইটিভিতে সাবেক ইংল্যান্ড ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল বলেন, ‘গোলটি সম্ভবত তার জীবনের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। নিজের দেশের ৮০ হাজার দর্শকের সামনে এই স্টেডিয়ামে গোল করা দারুণ ব্যাপার।’
সাবেক ইংল্যান্ড স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট বলেন, ‘রাউল হিমেনেজের জন্য এটি খুবই আবেগের মুহূর্ত ছিল। যদি আমি হতাম, আমিও একই অনুভব করতাম। গোল করার পর তার প্রতিক্রিয়ায় বোঝা যাচ্ছিল, সে সেই মুহূর্তটা পুরোপুরি উপলব্ধি করছে, আর সেখান থেকেই আবেগ এসেছে।’
হিমেনেজের ক্যারিয়ার বড় ধাক্কা খায় ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর। আর্সেনালের ডিফেন্ডার ডেভিড লুইজের সঙ্গে মাথার সংঘর্ষে তিনি গুরুতর আহত হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। মাঠেই তাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। সতীর্থ, কোচ এবং পরিবার সেই সময় আতঙ্কে ছিলেন।
তার সুস্থ হয়ে ওঠার পথ ছিল দীর্ঘ। প্রায় ছয় মাস তিনি অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে অনুশীলন করতে পারেননি। আট মাস পর তিনি মাঠে ফেরেন। ইনজুরির পর প্রথম গোল করেন ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে সাউদাম্পটনের বিপক্ষে ম্যাচে, যা তার দলের জয় নিশ্চিত করে।
২০২৩ সালে তিনি ফুলহামে যোগ দেন এবং তিন মৌসুম সেখানে খেলেন। এরপর আবার উলভারহ্যাম্পটনে ফিরে যান।
উলভসের সাবেক সহকারী কোচ এডু রুবিও, যিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের ক্লাব স্পোর্টিং কানসাস সিটির সহকারী কোচ, বলেন, বিশ্বকাপে তার এই গোল ছিল বিশাল অর্জন।
তিনি বলেন, ‘এটি তার জন্য পৃথিবীর সবকিছু বোঝাবে। সে নিজের দেশকে খুব ভালোবাসে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সব দিক থেকেই এটি তার জন্য স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত—প্রথম ম্যাচ, বড় দর্শক, নিজের দেশে বিশ্বকাপ—সব মিলিয়ে অসাধারণ অভিজ্ঞতা।’
রুবিও আরও বলেন, ‘ইনজুরির পর তার ফেরা সহজ ছিল না। তার মানসিক শক্তি অসাধারণ। সে খুবই বিনয়ী ও পরিবারমুখী একজন মানুষ, সবাই তাকে ভালোবাসে।’
তিনি যোগ করেন, ‘অনেকে ভেবেছিল সে আগের মতো ফিরতে পারবে কি না, কিন্তু তার দৃঢ়তা তাকে ফিরিয়ে এনেছে। আমি নিশ্চিত ছিলাম সে আবার সফল হবে।’
হিমেনেজ এখন পর্যন্ত প্রিমিয়ার লিগে ২৩৩ ম্যাচে ৬৮ গোল করেছেন। আগামী ম্যাচগুলোতে বিশ্বকাপে আরও গোল করার সুযোগ রয়েছে তার সামনে।