নেইমার জুনিয়র © সংগৃহীত
ফুটবল বিশ্বকাপে চোটের ভান করে খেলা থামানো বা কোচের কাছ থেকে কৌশলগত নির্দেশনা নেওয়ার সুযোগ আর থাকছে না। বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফার রেফারিবিষয়ক প্রধান পিয়েরলুইজি কোলিনা জানিয়েছেন, সময় নষ্ট এবং তথাকথিত ‘ট্যাকটিক্যাল টাইমআউট’ বন্ধ করতে বেশ কয়েকটি নতুন নিয়ম চালু করা হচ্ছে। এসব নিয়ম ভঙ্গ করলে খেলোয়াড় ও দলকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরেই ফুটবলে একটি প্রবণতা দেখা যায়। অনেক সময় গোলকিপাররা ইচ্ছাকৃতভাবে চোট পাওয়ার ভান করে মাঠে শুয়ে পড়েন। তখন ফিজিও মাঠে প্রবেশ করেন এবং সেই সুযোগে দুই দলের খেলোয়াড়েরা সাইডলাইনে গিয়ে কোচদের কাছ থেকে নির্দেশনা নেন। আলোচনা শেষ হলে গোলকিপার আবার উঠে দাঁড়িয়ে খেলা শুরু করেন। আইএফএবি (ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড) এবার এই কৌশল পুরোপুরি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই ধরনের ঘটনার একটি আলোচিত উদাহরণ দেখা গিয়েছিল গত নভেম্বরে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে। ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে ম্যাচের পর লিডস ইউনাইটেডের কোচ ড্যানিয়েল ফারকে প্রতিপক্ষ গোলকিপারের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে চোটের ভান করে খেলার গতি নষ্ট করার অভিযোগ তুলেছিলেন। চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের নারী ফুটবল লিগ (এনডব্লিউএসএল) পরীক্ষামূলকভাবে একটি নিয়ম চালু করে। এবার বিশ্বকাপেও সেই নিয়ম কার্যকর করা হচ্ছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, গোলকিপার চোট পেলে অন্য খেলোয়াড়দের নিজেদের অবস্থানে থাকতে হবে অথবা সেন্টার সার্কেলের ভেতরে অবস্থান করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই তারা সাইডলাইনে গিয়ে কোচের সঙ্গে আলোচনা করতে পারবেন না।
কোলিনা জানিয়েছেন, নিয়মটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে ম্যাচ রেফারিদের ওপর। তবে কেউ ভুলবশত কোচের সঙ্গে কথা বলতে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে হলুদ কার্ড দেখানো হবে না। কারণ, টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই সব দলকে নতুন নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে দেওয়া হবে।
তবে কোলিনা স্বীকার করেছেন, এই পরিবর্তন সব সমস্যার সমাধান নয়। প্রতিপক্ষের ছন্দ নষ্ট করতে সময় নেওয়ার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। এছাড়া উত্তর আমেরিকার গরম আবহাওয়ার কারণে এবারের বিশ্বকাপে প্রতি অর্ধে তিন মিনিটের একটি করে হাইড্রেশন বিরতি থাকবে। ফলে সেই সময় কোচরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে কৌশলগত আলোচনা করার সুযোগ পাবেন।
কোলিনা বলেন, ‘মাঠে শুধু রেফারি, ফিজিও আর গোলকিপার থাকবে—বাকি সব খেলোয়াড় মাঠের বাইরে চলে যাবে, বিষয়টি দেখতে অদ্ভুত লাগে এবং এটি ফুটবলের জন্য মোটেও ভালো নয়।’
শুধু চোটের অভিনয় বন্ধ করাই নয়, খেলার গতি বাড়াতে এবং সময় নষ্ট কমাতে আরও পাঁচটি নতুন নিয়ম চালু করা হচ্ছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় ইচ্ছাকৃতভাবে থ্রো-ইন নিতে দেরি করলে রেফারি সেই থ্রো-ইন প্রতিপক্ষ দলকে দিয়ে দিতে পারবেন। একইভাবে গোল-কিক নিতে অযথা দেরি করলে প্রতিপক্ষ দল কর্নার কিক পেতে পারে।
এছাড়া বদলি হওয়ার পর কোনো খেলোয়াড়কে নিকটতম সাইডলাইন দিয়ে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে মাঠ ছাড়তে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাঠ না ছাড়লে বদলি খেলোয়াড় এক মিনিটের আগে মাঠে প্রবেশ করতে পারবেন না। সেই সময় সংশ্লিষ্ট দলকে ১০ জন খেলোয়াড় নিয়েই খেলতে হবে।
মাঠের ভেতরে চিকিৎসা নিলে খেলোয়াড়কে পরবর্তী ৬০ সেকেন্ড মাঠের বাইরে থাকতে হবে। তবে গোলকিপারের চোট কিংবা হলুদ বা লাল কার্ডের মতো গুরুতর ফাউলের ঘটনায় এই নিয়ম কার্যকর হবে না।
ফিফা আচরণগত বিষয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নতুন নিয়মে কোনো খেলোয়াড় যদি হাত দিয়ে মুখ ঢেকে প্রতিপক্ষকে কিছু বলেন এবং তাতে উত্তেজনা বা বিতর্কের সৃষ্টি হয়, তাহলে রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে পারবেন। গত ফেব্রুয়ারিতে চ্যাম্পিয়নস লিগে বেনফিকার জিয়ানলুকা প্রেস্তিয়ানি ও রিয়াল মাদ্রিদের ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মধ্যে ঘটে যাওয়া বিতর্কের পর এই নিয়ম প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থাতেও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। কর্নার বা ফ্রি-কিকের মতো সেট-পিস থেকে খেলা শুরু হওয়ার ঠিক আগে কোনো ফাউল হলে এখন ভিএআর হস্তক্ষেপ করতে পারবে। বিশেষ করে সেই ফাউল যদি সরাসরি গোল, পেনাল্টি বা শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তাহলে ভিএআর রেফারিকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেবে।
ফিফার আশা, নতুন নিয়মগুলো কার্যকর হলে সময় নষ্টের প্রবণতা কমবে, খেলার গতি বাড়বে এবং বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো আরও প্রতিযোগিতামূলক ও উপভোগ্য হয়ে উঠবে।