সংগীত বিভাগের অধ্যাপক ড. মহসিনা আক্তার খানম (লীনা তাপসী খান) © টিডিসি সম্পাদিত
কর্মস্থলে অননুমোদিত অনুপস্থিতির কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সংগীত বিভাগের অধ্যাপক ড. মহসিনা আক্তার খানমকে (লীনা তাপসী খান) অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, গত ২৮ জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংগীত বিভাগের অধ্যাপক পদ থেকে অননুমোদিত অনুপস্থিতির তারিখ অর্থাৎ গত ১৩ জানুয়ারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়-দেনা পরিশোধ সাপেক্ষে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। দেনা-পাওনার হিসাব অবিলম্বে অবহিত করা হবে বলে চিঠিতে বলা হয়।
মহসিনা আক্তার খানম ২০১০ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। পরে ২০২৩ সালের ১৬ জুলাই থেকে অধ্যাপক হিসেবে অবেক্ষাধীনে নিয়োজিত আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চাকরিকাল ১৫ বছর ৬ মাস ২২ দিন বলে জানা আছে।
আরও পড়ুন: ঢাবি শিক্ষক লীনা তাপসীর লেখা বইয়ে চৌর্যবৃত্তি ও ভুল তথ্যের অভিযোগ
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর ব্যক্তিগত প্রয়োজনে আমেরিকায় যান অধ্যাপক ড. মহসিনা আক্তার খানম। তখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২ মাস ১৭ দিন অর্জিত ছুটি মঞ্জুরসহ কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতি প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে তিনি পুনরায় ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত ১ মাস ১৩ দিন অর্জিত ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধির এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ বছর বিনাবেতনে ছুটি মঞ্জুরের আবেদন করেন, যা অনুমোদিত করেনি বিশ্ববিদ্যালয়। তার অর্জিত ছুটির মেয়াদ ১২ জানুয়ারি উত্তীর্ণ হয়েছে। তার কোন বন্ড পিরিয়ড নেই বলেও জানা গেছে।
এদিকে, গত ৫ মের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইস্যুর তারিখ অর্থাৎ ১৮ মে থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে ড. মহসিনা আক্তার খানম বিভাগের কাজে যোগদানের জন্য পত্র ইস্যু করা হয়। এই সময়ের মধ্যে যোগদানে ব্যর্থ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে মর্মে জানানো হয়। ৮ সপ্তাহের নোটিশের মেয়াদ উত্তীর্ণ (১৪ জুলাই) হওয়ার পূর্বেই তিনি গত ৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি হতে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়ে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে আবেদন করেন।
এদিকে, সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দায় দেনা পরিশোধ সাপেক্ষে অধ্যাপক পদ হতে স্বেচ্ছায় অব্যাহতির প্রদানের বিষয় বিবেচনার জন্য ড. মহসিনা আক্তার খানমের বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ উঠেছিল ড. মহসিনা আক্তার খানমের বিরুদ্ধে
২০২১ সালের সহযোগী অধ্যাপক থাকাকালে ড. মহসিনা আক্তার খানমের বিরুদ্ধে পিএইচডি অভিসন্দর্ভে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ উঠেছিল। পরে তদন্তে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগও করেছিলেন নায়েমের (জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি) সাবেক মহাপরিচালক ইফফাত আরা নার্গিস। অভিযোগ তদন্তে লিখিতভাবে তৎকালীন উপাচার্যকে জানানোর পরও চার মাসে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছিলেন তিনি।
তখন এক সংবাদ সম্মেলনে ইফফাত আরা নার্গিস অভিযোগ করে তার লিখিত বক্তব্যে বলেছিলেন, সংগীতের প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে আমি লীনা তাপসী খানের ‘নজরুল-সঙ্গীতে রাগের ব্যবহার’ নামের গ্রন্থটি সংগ্রহ করি। কিন্তু গ্রন্থটি পাঠ করে আমার এর আগে পাঠ করা ৩/৪ টি গ্রন্থের সঙ্গে বেশ কিছু অংশের হুবহু মিল খুঁজে পাই, যা পরিষ্কার চৌর্যবৃত্তি।
‘এ বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি লীনা তাপসী খানের পিএইচডি-অভিসন্দর্ভের উপর ভিত্তি করে রচিত গ্রন্থ ‘নজরুল সঙ্গীতে রাগের ব্যবহার’ সম্পর্কে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ তদন্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর আবেদন করেছিলাম। কিন্তু তাতেও কোনো ফল হয়নি।’
মহসিনা আক্তার খানমের পিএইচডি গবেষণার তত্ত্ববধায়ক ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। ইফফাত আরা নার্গিস বইয়ের ৩৮টি জায়গার উল্লেখ করে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ এনেছিলেন। এর মধ্যে, গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ৪২ লাইন, তৃতীয় অধ্যায়ে ৭ লাইন, চতুর্থ অধ্যায়ে ২৬ লাইন, পঞ্চম অধ্যায়ে ৬ লাইন, ষষ্ঠ অধ্যায়ে এক লাইন, দশম অধ্যায়ে ১২৬ লাইন, একাদশ অধ্যায়ে ১২২ লাইন ত্রয়োদশ অধ্যায়ে ৬৫ লাইন এবং চতুর্দশ অধ্যায়ে ৫৩ লাইন। এসব লাইন রবীন্দ্রনাথের ‘গীতিবিতান’ ও ‘নজরুল-গীতিকা, ইদ্রিস আলীর লেখা ‘নজরুল সংগীতের সুর’, স্বরলিপিকার জগত ঘটক ও কাজী অনিরুদ্ধের ‘নবরাগ’, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘নজরুল সৃষ্ট রাগ ও বন্দিশ’ এবং কাকলী সেনের ‘ফৈয়াজী আলোকে নজরুলগীতি’ প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে তথ্য নির্দেশ ছাড়া হুবহু চুরি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
এ ছাড়াও নায়েমের সাবেক এই মহাপরিচালক অভিযোগ করেছিলেন, ২৮০ পৃষ্ঠার গ্রন্থে ৮০ পৃষ্ঠার স্বরলিপি স্ক্যান করে ঢোকানো হয়েছে মূল পাঠ হিসেবে, যা অনৈতিক।
দেখা যাচ্ছে যে ২৭৭ পৃষ্ঠার বইয়ের ১৬৯ পৃষ্ঠাই লীনা তাপসী খানের রচনা নয়। এগুলো অন্যের গ্রন্থ থেকে হুবহু গৃহীত। অবশিষ্ট পৃষ্ঠাগুলোর মধ্যেও চৌর্যবৃত্তি পাওয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য তার। এ অবস্থায় তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ তদন্ত সাপেক্ষে লীনা তাপসী খানের পিএইচডি ডিগ্রি বাতিল, ডিগ্রি প্রদানের সাথে সংশ্লিষ্টদের শাস্তি, গ্রন্থটি বাতিল এবং গ্রন্থের জন্য প্রাপ্ত লীনা তাপসী খানের নজরুল পদক প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছিলেন তিনি।