চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল
দুই দলের কোচ © সম্পাদিত ছবি
ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল মাঠে গড়াচ্ছে আজ। হাঙ্গেরির পুসকাস অ্যারেনায় শিরোপার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে ইংলিশ জায়ান্ট আর্সেনাল ও ফরাসি চ্যাম্পিয়ন প্যারিস সেইন্ট জার্মেইন (পিএসজি)। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১০টায় শুরু হবে ম্যাচটি। সরাসরি সম্প্রচার করবে সনি স্পোর্টস ২।
ফাইনালের আগে দুই দলের কৌশল, তারকা খেলোয়াড় কিংবা সাম্প্রতিক ফর্মের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ফুটবলারদের ফিটনেস ও শারীরিক সক্ষমতা। কাগজে-কলমে দুই দলের মৌসুম প্রায় সমান ব্যস্ত মনে হলেও গভীরে গেলে দেখা যায় ভিন্ন বাস্তবতা। সেই বাস্তবতাই ফাইনালের আগে পিএসজিকে কিছুটা এগিয়ে রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
পরিসংখ্যান বলছে, ফাইনালটি হবে আর্সেনালের মৌসুমের ৬৩তম ম্যাচ এবং পিএসজির ৫৬তম ম্যাচ। তবে এই হিসাবের বাইরে রয়েছে গত গ্রীষ্মে ক্লাব বিশ্বকাপে পিএসজির খেলা সাতটি ম্যাচ। ফলে গত বছরের জুন থেকে হিসাব করলে দুই দলই প্রায় সমানসংখ্যক ম্যাচ খেলেছে।
তবে ম্যাচের সংখ্যা সমান হলেও শারীরিক চাপের হিসাব সমান নয়। আর্সেনাল গত গ্রীষ্মে খেলোয়াড়দের পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। অন্যদিকে পিএসজিকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের মাত্র ১৪ দিন পর যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ক্লাব বিশ্বকাপে অংশ নিতে হয়েছিল। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তারা ফাইনাল পর্যন্ত খেলেছে।
এরপরও বিশ্রামের সুযোগ খুব একটা মেলেনি। ক্লাব বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার এক মাস পরই টটেনহ্যামের বিপক্ষে সুপার কাপ ম্যাচ দিয়ে নতুন মৌসুম শুরু করে তারা। কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হয় লিগ ওয়ানে শিরোপা ধরে রাখার মিশন।
সম্প্রসারিত ক্লাব বিশ্বকাপের কারণে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে শুরু থেকেই বাড়তি চাপে থাকতে হয়েছে। অন্য দলগুলো যখন বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ পেয়েছে, তখন এসব দলের খেলোয়াড়দের টানা ব্যস্ত সূচির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছে।
এই প্রভাবের একটি উদাহরণ চেলসি। ক্লাব বিশ্বকাপ জয়ের পর মৌসুমের প্রথম ছয় লিগ ম্যাচের মাত্র দুটি জিতেছিল তারা। শেষ পর্যন্ত দশম স্থানে থেকে মৌসুম শেষ করে লন্ডনের ক্লাবটি। তারকা ফুটবলার কোল পালমারের পারফরম্যান্সও ছিল হতাশাজনক, যার কারণে তিনি এবার বিশ্বকাপের দলে জায়গা পাননি।
তবে মৌসুম শুরু হওয়ার পর পিএসজি ও আর্সেনালের খেলোয়াড়দের ব্যবহারে বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছে আর্সেনাল। লিগ কাপ ও এফএ কাপেও তারা অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়েছে।
সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে রোটেশনে। আর্সেনাল কোচ মিকেল আর্তেতা পুরো মৌসুমজুড়ে খুব কম রোটেশন করেছেন। বিপরীতে পিএসজি কোচ লুইস এনরিকে নিয়মিত খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দিয়েছেন।
লিগ মৌসুমের শুরুতে নঁতের বিপক্ষে ম্যাচে পিএসজির একাদশে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালের শুরুর একাদশ থেকে ছিলেন মাত্র দুইজন ফুটবলার। নুনো মেন্দেস, আশরাফ হাকিমি, উসমান দেম্বেলে, দেজিরে দুয়ে ও খভিচা কাভারাতস্কেলিয়ার মতো তারকারা বেঞ্চ থেকে নেমে জয় এনে দিয়েছিলেন।
এনরিকে অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের লিগ ম্যাচে কম ব্যবহার করেছেন, যাতে তারা ইউরোপের মঞ্চে সর্বোচ্চ ফিটনেস নিয়ে খেলতে পারেন। এ মৌসুমে নুনো মেন্দেস ও মারকিনিওস লিগ ওয়ানের তুলনায় চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বেশি সময় মাঠে ছিলেন, যদিও ওই প্রতিযোগিতায় ম্যাচসংখ্যা অনেক কম।
চোট-আঘাতের কিছু সমস্যা থাকলেও পিএসজির অধিকাংশ তারকা ম্যাচ মিস করেছেন পরিকল্পিত বিশ্রামের কারণে। খভিচা কাভারাতস্কেলিয়া চোটের জন্য মাত্র তিনটি লিগ ম্যাচ খেলতে পারেননি। মারকিনিওস দুটি, নুনো মেন্দেস আটটি, জোয়াও নেভেস নয়টি এবং উসমান দেম্বেলে ১০টি ম্যাচ মিস করেছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোচিং স্টাফ তাদের বিশ্রামে রেখেছে।
পিএসজির স্কোয়াডে তরুণ ও ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে থাকা খেলোয়াড়ের সংখ্যাও বেশি। ফলে তারা দীর্ঘ মৌসুমের চাপ সামলাতে পেরেছে। বিশেষ করে লিগ ওয়ানে একচ্ছত্র আধিপত্য থাকায় এনরিকে সহজেই খেলোয়াড়দের কাজের চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন। এ বছর টানা পঞ্চমবারের মতো লিগ ওয়ানের শিরোপা জিতেছে পিএসজি।
অন্যদিকে প্রিমিয়ার লিগ জয়ের পথে আর্সেনালকে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে। টানা তিন মৌসুম রানার্সআপ হওয়ার হতাশা কাটিয়ে শিরোপা জয়ের লক্ষ্য তাদের প্রতিটি ম্যাচকে কঠিন করে তুলেছিল। ম্যানচেস্টার সিটির কাছে আবারও শিরোপা হারানোর ভয় তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছিল।
মৌসুমের শেষ ভাগে সেই ক্লান্তির প্রভাবও দেখা গেছে। অবনমিত বার্নলির বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জয়ও তাদের জন্য কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছিল।
আর্তেতা বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করে স্কোয়াডের গভীরতা বাড়ালেও কয়েকজন খেলোয়াড়কে প্রায় কখনোই বিশ্রাম দেননি। গোলরক্ষক ডেভিড রায়া প্রিমিয়ার লিগে শিরোপা নিশ্চিত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি মিনিট খেলেছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ১৪ ম্যাচের মধ্যে ১৩টিতেও তিনি শুরু থেকে মাঠে ছিলেন।
মিডফিল্ডে ডেকলান রাইস ও মার্তিন সুবিমেন্দি ছিলেন প্রায় অপরিবর্তনীয়। রাইস মাত্র দুটি লিগ ম্যাচ মিস করেছেন, আর সুবিমেন্দি খেলেছেন পুরো মৌসুম। রক্ষণভাগে গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস ও উইলিয়াম সালিবাও খুব কম ম্যাচের বাইরে ছিলেন।
এই পাঁচ ফুটবলার প্রত্যেকেই প্রিমিয়ার লিগে অন্তত ৩০টি ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন। বিপরীতে পিএসজির কোনো খেলোয়াড় লিগ ওয়ানে ২৭টির বেশি ম্যাচ শুরু করেননি।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে আর্সেনালের এই মূল খেলোয়াড়রা প্রত্যেকেই ৪ হাজার মিনিটের বেশি ফুটবল খেলেছেন। পিএসজিতে কেবল ওয়ারেন জাইরে-এমেরি এই সীমা অতিক্রম করেছেন।
দুই দলের স্কোয়াড মিলিয়ে ৩ হাজার মিনিটের বেশি খেলেছেন এমন ফুটবলারের সংখ্যা ১২ জন। এর মধ্যে নয়জনই আর্সেনালের। ইউরিয়েন টিম্বার ফিট থাকলে তাদের সবাইকেই ফাইনালে দেখা যেতে পারে।
নিঃসন্দেহে পেশাদার ফুটবলারদের জন্য আর একটি ম্যাচ খেলা অসম্ভব নয়। তবে দীর্ঘ মৌসুমের ক্লান্তি ম্যাচের শেষ দিকে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ৯০ মিনিট কিংবা অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে ১২০ মিনিট পর্যন্ত একই গতি ও তীব্রতা ধরে রাখার সামর্থ্যই হয়তো নির্ধারণ করে দেবে শিরোপার ভাগ্য।
সেই বিবেচনায় পিএসজিই কিছুটা এগিয়ে। কারণ লুইস এনরিকে পুরো মৌসুমে নিয়মিত রোটেশন করে দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের সতেজ রেখেছেন।
পরিসংখ্যানও সেই কথাই বলছে। ব্যালন ডি’অরজয়ী উসমান দেম্বেলে ৩৪টি লিগ ম্যাচের মাত্র ১১টিতে শুরু থেকে খেলেছেন। জোয়াও নেভেস, নুনো মেন্দেস ও ফাবিয়ান রুইস খেলেছেন ১৩টি করে ম্যাচ। খভিচা কাভারাতস্কেলিয়া ১৮টি, দেজিরে দুয়ে ও আশরাফ হাকিমি ১৬টি করে এবং মারকিনিওস মাত্র ১১টি ম্যাচে শুরুর একাদশে ছিলেন।
শুধু তাই নয়, তারা নিয়মিত বদলি হিসেবেও মাঠে নামেননি। পিএসজির এই তারকাদের কেউই লিগ ওয়ানে দলের মোট খেলার সময়ের অর্ধেকও মাঠে কাটাননি।
তাই ম্যাচসংখ্যা প্রায় সমান হলেও ফাইনালের আগে সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করেছে খেলোয়াড়দের সতেজতা। আর সেই জায়গায় আর্সেনালের তুলনায় স্পষ্টতই এগিয়ে রয়েছে পিএসজি। ফলে শিরোপার লড়াইয়ে ফরাসি চ্যাম্পিয়নদেরই সামান্য হলেও ফেবারিট ধরা হচ্ছে।