টিডিসি সম্পাদিত © টিডিসি
জুলাইয়ের দুপুর। এখন আর ক্যাম্পাসে স্লোগানের শব্দ ভেসে আসে না। প্রশাসনিক ভবনের সামনে শিক্ষার্থীদের ভিড় হয় ক্লাসের ফাঁকে, করিডরে বসে চলে গল্প কিংবা পরের ল্যাবের প্রস্তুতি। দুই বছর আগের উত্তপ্ত সেই দিনগুলোর সঙ্গে আজকের ক্যাম্পাসের দৃশ্যের যেন খুব একটা মিল নেই। তবু জুলাই এলেই কেনো যেনো অনেকের মনে ফিরে আসে এক অস্থির সময়ের স্মৃতি। যে সময় জাতীয় আন্দোলনের ঢেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরেও পরিবর্তনের নতুন প্রশ্ন তুলেছিল।
তখন তাদের কাছে আন্দোলন মানে ছিল শুধু রাজপথে দাঁড়ানো নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়াও। ক্যাম্পাসে প্রচলিত কিছু সংস্কৃতি, নতুন শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা, অংশগ্রহণের সুযোগ এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ এসব নিয়েও আলোচনা শুরু হয় একই সময়ে। জাতীয় ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে নিজেদের ক্যাম্পাসের বাস্তবতা যেন এক বিন্দুতে এসে মিলেছিল সেই জুলাইয়ে।
সময় থেমে থাকেনি। আন্দোলনের উত্তাপ পেরিয়ে এসেছে নতুন একাডেমিক বছর, নতুন ব্যাচ, নতুন মুখ। দুই বছর পর ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে, যে প্রত্যাশা নিয়ে শিক্ষার্থীরা পরিবর্তনের কথা বলেছিল, সেই প্রত্যাশার কতটা বাস্তব হয়েছে? পরিবর্তনের গল্প কি কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ, নাকি তার বাস্তবিক প্রভাবও পরিলক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিদিনের জীবনে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কথা হয়েছে আন্দোলনের সময় সক্রিয় থাকা শিক্ষার্থী, জুলাই-পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে। কারো কাছে এই পরিবর্তনের শুরু হয়েছে, তো কারো কাছে পথ এখনো অনেক বাকি। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে, দুই বছরের এক ভিন্ন রকমের হিসাব।
জুলাই-পরবর্তী সময়ে বুটেক্স-এ ভর্তি হওয়া ৫১তম ব্যাচের টেক্সটাইল ম্যানেজমেন্ট বিভাগের আলী জুনায়েদ আন্দোলনের সময় ছিলেন এইচএসসি পরীক্ষার্থী। সংবাদমাধ্যমে আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ অনুসরণ করলেও ১৫ জুলাইয়ের হামলার পর বিষয়টি তাকে ব্যক্তিগতভাবে নাড়া দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তিনি দেখেছেন সিনিয়রদের বর্ণনা করা ক্যাম্পাসের চেয়ে ভিন্ন এক পরিবেশ।
জুনয়েদ বলেন, ‘আমরা সংঘাতের ক্যাম্পাস দেখিনি বরং একটি শান্ত, পড়াশোনাবান্ধব পরিবেশ পেয়েছি। এখন এই পরিবেশ ধরে রাখাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
কিন্তু এই সময়কে সবাই কি একইভাবে দেখছেন? আন্দোলনের একেবারে ভেতর থেকে যাঁরা দিনগুলো পার করেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা এবং মূল্যায়ন কি এই আশাবাদের সঙ্গে মিলে যায়?
আন্দোলনে সক্রিয় থাকা ৪৯তম ব্যাচের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে জুলাই শুধু একটি জাতীয় আন্দোলনের স্মৃতি নয়, বরং নিজ ক্যাম্পাসকে নিয়ে নতুন করে ভাবারও একটি সময় ছিল। তার মতে, শুরুতে তাদের লক্ষ্য ছিল জাতীয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানানো। তবে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসের দীর্ঘদিনের কিছু বাস্তবতা নিয়েও প্রশ্ন তোলার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। শিক্ষাবান্ধব ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশাও তখন আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন আমাদের শুধু জাতীয় ঘটনাপ্রবাহের অংশ করেনি, নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও প্রশ্ন করার সাহস দিয়েছিল।আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করা হলেও, দুই বছর পর ফিরে তাকিয়ে তার মূল্যায়ন হলো কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও প্রত্যাশিত সংস্কারের এখনো পুরোটা বাস্তবায়িত হয়নি।’
তবে দুই বছর পরের চিত্র নিয়ে কিছুটা ভিন্ন মূল্যায়ন দিয়েছেন ৪৮তম ব্যাচের ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী সারোয়ার হোসেন সামি। তার মতে, জুলাই আন্দোলনের পর শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, শিক্ষা, প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় সব ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। দুই বছর পর দাঁড়িয়ে মনে হয় সেই প্রত্যাশার অনেকটা এখনো অপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মতো উদ্যোগ, বিশেষ করে কার্যকর ছাত্রসংসদ গঠনের প্রত্যাশাও পূরণ হয়নি। পরিবর্তনের প্রকৃত মূল্যায়ন তখনই সম্ভব হবে, যখন এসব কাঠামোগত পরিবর্তন বাস্তবে দেখা যাবে।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মামুন কবির বলেন, গত দুই বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, গবেষণার পরিবেশ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এমন একটি ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থী নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও ভয়মুক্ত পরিবেশে পড়াশোনা, গবেষণা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারে।’
শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমালোচনার প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রশাসন সেসব মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই দেখে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ও সার্বিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেষ্টা করে।
দুই বছর পর এসে জুলাইকে নিয়ে সবার মূল্যায়ন এক নয়। কেউ পরিবর্তনের ইতিবাচক দিক দেখছেন, কেউ মনে করছেন এখনো অনেক প্রত্যাশা অপূর্ণ। তবে ভিন্ন মতের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে জুলাইয়ের পর বুটেক্সকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের ভাবনা বদলেছে। ক্যাম্পাসের পরিবেশ, অংশগ্রহণের সুযোগ কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো তখন উঠেছিল, সেগুলোর উত্তর হয়তো এখনো পুরোপুরি মেলেনি। সেই ভাবনার কতটা বাস্তবায়িত হবে, তার উত্তর হয়তো আগামী দিনের ক্যাম্পাসই বলে দেবে।