বুটেক্স ক্যাম্পাস ও লোগো © টিডিসি সম্পাদিত
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) থিসিস ও ইন্টার্নশিপ কার্যক্রমে বরাদ্দকৃত অর্থের স্বল্পতা এবং সময় ব্যবস্থাপনার অসামঞ্জস্য নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রমেই অসন্তোষ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান কাঠামোতে প্রদত্ত ভাতা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য, যা দিয়ে ইন্টার্নশিপ ও থিসিস সম্পন্ন করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি সময় সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত গবেষণা পরিচালনার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
তুলনামূলকভাবে দেশের অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালে বৈষম্যটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) থিসিস ও ইন্টার্নশিপ মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার টাকা এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) প্রায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেখানে বুটেক্সে এই খাতে শিক্ষার্থীরা পান মাত্র প্রায় ৩ হাজার টাকা, যা বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় একেবারেই অপ্রতুল।
শিক্ষার্থীরা জানান, ইন্টার্নশিপ চলাকালে অনেক সময় ঢাকার বাইরে অবস্থান করতে হয়, ফলে বাসা বা মেস ভাড়া, যাতায়াত এবং দৈনন্দিন খরচ মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়। অন্যদিকে থিসিসের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ, বিভিন্ন পরীক্ষণ (টেস্টিং), ল্যাব ব্যবহারের ফি এবং বাইন্ডিংসহ অন্যান্য খরচও শিক্ষার্থীদের নিজেদের বহন করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদত্ত ভাতার তুলনায় অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়।
এছাড়া সময় ব্যবস্থাপনাও বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। চতুর্থ বর্ষের শেষ সেমিস্টারে ইন্টার্নশিপ এবং থিসিস শুরু হলেও ২ মাস বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপের কারণে নির্ধারিত সময়ের বড় অংশ শেষ হয়ে যায়। ইন্টার্নশিপ থেকে আসার পর শিক্ষার্থী ক্লাস, পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ফলে ক্ষুদ্র সময়ে শিক্ষার্থীদের তাড়াহুড়ো করে থিসিস সম্পন্ন করতে হয়, যা গবেষণার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেখানে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ বর্ষের শুরু থেকেই থিসিস কার্যক্রম শুরু হয়। অনেকের মতে বুটেক্সেও চতুর্থ বর্ষের শুরুতেই থিসিসের গ্রুপ ও সুপারভাইজার নির্ধারণ করে কাজ শুরু করলে আরও কার্যকর ও মানসম্মত আউটপুট পাওয়া সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে বুটেক্স ফেব্রিক ইন্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. শাহরিয়ার আলম পাভেল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রদত্ত বাজেট দিয়ে ইন্টার্ন ও থিসিস সম্পন্ন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ইন্টার্নশিপ চলাকালে ঢাকার বাইরে অবস্থান, বাসা ভাড়া ও অন্যান্য খরচ শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে থিসিসের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও পরীক্ষণের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য। বর্তমান বরাদ্দ এতটাই কম যে অনেক ক্ষেত্রে শুধু ইন্ডাস্ট্রিয়াল এটাচমেন্ট ও থিসিস বাইন্ডিংয়ের খরচই এর চেয়ে বেশি হয়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে এবং ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি আবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে। ইউজিসি থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে শিগগিরই ইন্টার্নশিপ ও থিসিসের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে— অধ্যাপক ড. রাশেদা বেগম দিনা, রেজিস্ট্রার বুটেক্স
তিনি আরও বলেন, ইন্টার্ন ও থিসিসের সময়সূচি সঠিকভাবে পরিকল্পিত না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত সময় পান না। ইন্টার্নশিপ শেষে ভাতা প্রদান করাও অযৌক্তিক, কারণ তখন এর প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই ফুরিয়ে যায়। মাত্র দুই মাসে কোনো কারখানার পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম বোঝা সম্ভব নয়; অন্তত ছয় মাস সময় প্রয়োজন। মনিটরিং ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইন্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ওয়াসিমা তাসনিম বলেন, ইন্টার্নশিপের জন্য যে প্রায় ৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়, তা হাতে পাওয়া যায় ইন্টার্ন শেষ হওয়ার পর, তাও অনেক সময় সম্পূর্ণ পরিমাণ পাওয়া যায় না। যাতায়াত খরচেই প্রায় পুরো টাকা শেষ হয়ে যায়, অনেক ক্ষেত্রে বাইরে খাবারের খরচও শিক্ষার্থীদের বহন করতে হয়। ফলে এই ভাতা কার্যত কোনো কাজে আসে না।
তিনি আরও বলেন, দুই মাসের ইন্টার্নশিপ সময়ও যথেষ্ট নয় এবং টানা এই সময় কাজ করা শারীরিকভাবে কষ্টকর। থিসিসের ক্ষেত্রেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা কোনো অর্থায়ন না থাকায় শিক্ষার্থীদের নিজস্ব অর্থ ব্যয় করতে হয়, যেখানে একটি প্রজেক্টে গড়ে ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরীক্ষণের জন্য ১০-১৪ হাজার টাকাও ব্যয় করতে হয়।
আরও পড়ুন: যোগ্য শিক্ষক থাকলেও ‘ভাড়া করা’ সভাপতি দিয়ে চলছে ইবির ৩ বিভাগ
এদিকে ৪৭তম ব্যাচের আরেকজন শিক্ষার্থী শিক্ষার্থী সৌমিক সাহা জানান, ইন্টার্ন ভাতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা চলমান থাকলেও এখনো তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে আসেনি। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৩ হাজার টাকার ভাতা অপরিবর্তিত রয়েছে, যা বর্তমান দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। যাতায়াত ও আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের জন্য দৈনন্দিন খরচ নির্বাহ করাই কঠিন হয়ে পড়ছে। ভাতা বৃদ্ধি না পেলে অনেক শিক্ষার্থীর পক্ষে সঠিকভাবে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. রাশেদা বেগম দিনা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে এবং ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি আবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে। ইউজিসি থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে শিগগিরই ইন্টার্নশিপ ও থিসিসের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে।