গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ভিসির পিএস ও প্রো-ভিসি © টিডিসি সম্পাদিত
‘‘পরিসংখ্যান বিভাগে প্রভাষক পদে আবেদন করেছি আমি। তখন তিনি বলেন, চাকরি পেতে হলে ‘খুশি’ করতে হবে। আমি জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রভাষক পদে নিয়োগ পেতে হলে আমাকে ২০ লাখ টাকা দিতে হবে। আমি জানাই যে, এত টাকা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর তিনি আমাকে বিভিন্নভাবে রাজি করানোর চেষ্টা করেন এবং নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন।’’—গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (গোবিপ্রবি) পরিসংখ্যান বিভাগে প্রভাষক পদে এক নিয়োগপ্রার্থীর অভিযোগপত্রে এমনটাই দাবি করা হয়।
এই অভিযোগটি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রো-ভিসি) প্রফেসর ড. মো. সোহল হাসানের বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগের কথোপকথনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখরের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল আল আহমদের সঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে তার পরিচয় পিএস টু ভিসি ও সেকশন অফিসার (চুক্তিভিত্তিক) লেখা রয়েছে। সম্প্রতি ডাকযোগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগটি পাঠানো হয়েছে বলে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে নিশ্চিত করেছেন ওই নিয়োগপ্রার্থী।
তবে টাকা লেনদেনের এই অভিযোগ অস্বীকার করে প্রফেসর ড. মো. সোহল হাসান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অভিযোগটি মিথ্যা ও তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। ওই প্রার্থী ভুল করেছে মর্মে ইতিমধ্যে মাফও চেয়েছে, লিখিতভাবেও দিয়েছে।
গত বছরের নভেম্বরে এই নিয়োগটির জন্য পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তবে নিয়োগ পরীক্ষার আগে ওই প্রার্থী দেখা করেছেন প্রফেসর ড. মো. সোহল হাসানের সঙ্গে। বিষয়টি স্বীকার করে ড. মো. সোহলে হাসান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সে (নিয়োগপ্রার্থী) সালাম দিতে গেলে তো অপরাধ দেখি না। আমি বলেছি লিখিত পরীক্ষা দাও। এতটুকুই কথা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে ইউজিসি চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো অভিযোগটি দুয়েকদিন আগে প্রফেসর ড. মো. সোহল হাসান হাতে পান। এরপর সেটি তুলে নিতে ওই নিয়োগপ্রত্যাশীকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করেন তিনি। ফলে ৮/৯ ফেব্রুয়ারি তারিখে অভিযোগটি তুলে নিতে ইউজিসি চেয়ারম্যান বরাবর আরেকটি আবেদন করেন নিয়োগপ্রার্থী।
জানতে চাইলে আজ মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে ওই নিয়োগপ্রত্যাশী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি অভিযোগ তুলে নিয়েছি। আমি আর কিছু বলতে চাই না। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, লিখিত অভিযোগটি তিনি লিখেননি। তবে স্বাক্ষর করেছেন। এখানে যে তারিখ দেওয়া রয়েছে সেটিও ব্যাক ডেটেট।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ৩০ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসানকে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রো-ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে। ড. মো. সোহেল হাসান রাবির বিএনপিপন্থী শিক্ষক বলে পরিচিত। ক্যাম্পাসের অন্তত তিনজন শিক্ষক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে নিশ্চিত করেছেন। তবে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠনে কোনো পদ ছিল কিনা জানা যায়নি।
ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী, এর আগে প্রভাষক পদে নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা, প্রেজেন্টেশন ও মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হত। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন নিয়োগে প্রেজেন্টেশন ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে সম্পন্ন করছে বলে জানা গেছে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়টির নিয়োগ নিয়ে উঠা অভিযোগের বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি করেছে ইউজিসি। সেখানে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন ও সুপারিশ দিতে বলা হয়েছে।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখর দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এখানে তিনমাস যাবত সব ধরনের নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। তাই এ সময়ের মধ্যে টাকা দিয়ে নিয়োগ হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। তবে তিনি এই অভিযোগটি সর্ম্পকে কিছু জানেন না বলে জানান।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের জন্য প্রথমে সুপারিশ করা হয়। তারপর সুপারিশ উঠবে রিজেন্ট বোর্ডে। সেখানে পাস হলে পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য পাঠানো হয়। তারপর নিয়োগ দেওয়া হয়। সম্প্রতি পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন হওয়ার কারণে নিয়োগের ওভারল কার্যক্রম মেনেছি কিনা তা ইউজিসি জানতে চেয়েছে। আমরা সেটার জবাব দিয়েছি।
অভিযোগপত্রে নিয়োগপ্রত্যাশী জানান, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগের জন্য আবেদন করেছিলাম। আমার সিরিয়াল নম্বর ছিল ৯। পরিসংখ্যান বিভাগের নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ ছিল ২৩ নভেম্বর। নিয়োগ পরীক্ষার পূর্বে আমি গোবিপ্রবি হতে একটি এসএমএস পাই, যেখানে উল্লেখ ছিল যে আলোচ্য পরীক্ষায় মৌখিক পরীক্ষা ও প্রেজেন্টেশন অনুষ্ঠিত হবে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা এবং অর্থ দাবির বিষয়ে আপনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
‘‘গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (যিনি পূর্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ছিলেন)-এর সঙ্গে আমার একাডেমিক পরিচয়ের সূত্রে আমি টেলিফোনে যোগাযোগ করি। উল্লেখ্য যে, আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে বিএসসি (সম্মান) ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছি। প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর আমাকে একটি মোবাইল নম্বর (০১৭৪০*৭৬*১৮) প্রদান করেন এবং যোগাযোগ করতে বলেন। আমি ওই নম্বরে কল করলে তোফায়েল আহমেদ নামে একজন কল রিসিভ করেন এবং নিজেকে ভিসি স্যারের পিএস হিসেবে পরিচয় দেন।
অভিযোগপত্রে নিয়োগপ্রত্যাশী আরও জানান, তিনি প্রথমে জানতে চান আমি তার মোবাইল নম্বর কোথায় পেয়েছি। যখন বলি প্রো-ভিসি স্যার দিয়েছেন, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন এবং জানতে চান কীভাবে আমাকে সাহায্য করতে পারেন। আমি বলি যে ২৩ নভেম্বর আমার পরীক্ষা রয়েছে। তখন তিনি জানতে চান আমি কোন বিভাগে পরীক্ষা দেব। আমি বলি যে আমি পরিসংখ্যান বিভাগে প্রভাষক পদে আবেদন করেছি। তখন তিনি বলেন চাকরি পেতে হলে "খুশি" করতে হবে। আমি জানতে চাইলে তিনি বলেন প্রভাষক পদে নিয়োগ পেতে হলে আমাকে ২০ লাখ টাকা দিতে হবে।
‘‘আমি জানাই যে এত টাকা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর তিনি আমাকে বিভিন্নভাবে রাজি করানোর চেষ্টা করেন এবং নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। অধিকাংশ যোগাযোগ হোয়াটসঅ্যাপে হওয়ায় কল রেকর্ড করতে পারিনি। পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যায় আমি গোবিপ্রবি ক্যাম্পাসে এসে ছাত্রদের হলে অবস্থান করি। সন্ধ্যার পরে তিনি আমাকে ভিসি বাংলোর পাশের পুকুরপাড়ে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি আমাকে প্রথমে মোবাইল বন্ধ করতে বলেন এবং পুনরায় বিভিন্নভাবে অর্থ প্রদানের বিষয়ে চাপ দেন। তিনি বলেন পুরো টাকা অগ্রিম দিতে হবে না; অর্ধেক অগ্রিম এবং বাকি টাকা নিয়োগপত্র পাওয়ার পর দিতে হবে। আমি বারবার জানাই যে এত টাকা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি রাজি না হওয়ায় তিনি আমাকে সতর্ক করেন যেন বিষয়টি কাউকে না জানাই।’’
অভিযোগপত্রে জানানো হয়, এমনকি ভাইভা দিতে যাওয়ার পূর্বে ভিসি স্যারের পিএস-এর কক্ষে বসে থাকার সময়ও তিনি আমাকে বারবার বলেন যে আমি যদি রাজি থাকি তাহলে বিষয়টি এখনো "কনফার্ম" করা সম্ভব। এর আগেও আমি একই পদের পূর্ববর্তী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করেছিলাম এবং তখন লিখিত পরীক্ষা হয়েছিল। কিন্তু এবার লিখিত পরীক্ষা বাতিল করে শুধুমাত্র ভাইভা নেওয়া হয়, যদিও আমাদেরকে পূর্বে ভাইভা ও প্রেজেন্টেশন হবে বলে জানানো হয়েছিল। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
‘‘পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গ্রুপ/পেজ থেকে জানতে পারি যে গোবিপ্রবির নিয়োগ ইউজিসি কর্তৃক স্থগিত করা হয়েছে। বিষয়টি জানার পর একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সত্য ঘটনা ইউজিসিকে জানানো আমার নৈতিক দায়িত্ব মনে করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যোগ্যতা ও মেধার পরিবর্তে সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ ও স্বেচ্ছাচারী পদ্ধতিতে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে, যা উচ্চশিক্ষার মান ক্ষুণ্ণ করছে এবং মেধাবী প্রার্থীদের জন্য হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনে আমি ইউজিসিতে উপস্থিত হয়ে লিখিত ও স্বাক্ষর দিতে প্রস্তুত আছি।’’
জানা গেছে, অভিযোগপত্রটি ইউজিসির কাছে পাঠানোর পর দুয়েকদিন আগে যেকোনো মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রো-ভিসি) প্রফেসর ড. মো. সোহল হাসানের হাতে চলে যায়। এরপর ওই নিয়োগপ্রত্যাশীকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। এমনকি তার পরিবার ও বর্তমানে চাকরিরত প্রতিষ্ঠানে চাপ দেন প্রো-ভিসি। এ কারণে ওই নিয়োগপ্রত্যাশী অভিযোগ তুলে নিতে ৬ ফেব্রুয়ারি তারিখের একটি চিঠি লেখেন ইউজিসি চেয়ারম্যানের কাছে।
সেখানে তিনি লেখেন, আমি প্রকৃত ঘটনা পুরোপুরি না বুঝে ও তাড়াহুড়ো করে নিয়োগ বিষয়ে একটি অভিযোগ দিয়েছিলাম। আমি এখন মনে করছি, কাজটি আমার ভুল হয়েছে। তাই, আমি অভিযোগী তুলে নিতে চাই। আপনার নিকট আমার আকুল আবেদন এই যে, অভিযোগটি বাতিল করলে এবং পুরো বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখলে চির কৃতজ্ঞ থাকব।
এদিকে, নিয়োগের অনিয়ম নিয়ে কমিটিতে ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমানকে রাখা হয়েছে। বিষয়টি জানতে তাকে ফোন করা হলে ব্যস্ত বলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অপরদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখরের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল আল আহমদের সঙ্গে কথা বলতে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।