আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির সাথে যোগ হয়েছে প্রযুক্তি শিক্ষা তথা ইন্টারনেট ও তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার, ফলে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এটি। মানব সভ্যতার বিকাশে বিজ্ঞানের যে সব আবিষ্কার অনন্য ভূমিকা পালন করেছে তাঁর মধ্যে অন্যতম একটি হলো ইন্টারনেট। বতর্মান যুগের শিক্ষার্থীদের শিক্ষালাভে বিরাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তথা প্রযুক্তি শিক্ষা। এখনকার শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই মাউসে একটি ক্লিকের মাধ্যমে অনেক জ্ঞান অর্জন করতে পারে নিঃসন্দেহে। প্রযুক্তি প্রসারের ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য নিমিষেই সংগ্রহ করে নিতে পারে শিক্ষামূলক বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে, যা আধুনিক ও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পা্লন করছে।
এছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে ইন্টারনেটের আরেকটি বিস্তৃত অবদান হল ই-ল্যার্নিং ব্যবস্থা, এর মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে অবস্থান না করেও শ্রেণিকক্ষের কার্যাবলি সরাসরি দেখাসহ তাতে অংশগ্রহণও করা যায়। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট সভ্য সমাজের মানুষের জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। তাই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বর্তমান বিশ্বের সকল প্রকার উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, এতে কোন প্রকার সন্দেহ নেই। তথ্য প্রযুক্তি বর্তমান বিশ্বের সকল প্রকার উন্নয়ন কর্মকান্ডের মূল হাতিয়ার, বর্তমানে যে জাতি তথ্য প্রযুক্তিতে যত বেশি দক্ষ, সে জাতি ততবেশি উন্নত। তথ্য প্রযুক্তিই আগামীদিনে জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশে শিক্ষার আধুনিকায়নের ক্ষেত্রেও ইন্টারনেট গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লব সাধন করেছে নিঃসন্দেহে। বর্তমানে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার রেজিস্টেশন, ফরমফিলাপ, ফলাফল প্রকাশ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন ও চাকুরীসহ যাবতীয় কাজ ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে, ফলে কম সময়ে ও কম খরচে দ্রুতগামী হচ্ছে যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান এবং সেবা প্রদানের সার্বিক ব্যবস্থা। পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা ও পদ্ধতির রূপরেখা পরিবর্তনসহ বর্তমান বিশ্বের সাথে তাল রেখে শিক্ষা ব্যবস্থাকে গতিশীল, বেগবান ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে এই প্রযুক্তি শিক্ষা, এগিয়ে নিয়ে যাবে বহুদূর।
সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, লেখাপড়ায়, গবেষণায়, ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটার, ই-মেইলসহ নানা কাজে এর ব্যবহার অতি প্রয়োজনীয় হয়ে দেখা দিয়েছে। যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানের এটি একটি অন্যতম মাধ্যম। সবার চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে অনলাইনে অজানা বিস্ময় কিংবা অদেখা নতুন জগৎ। সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য ইন্টারনেট এখন অপরিহার্য হয়ে দাড়িয়েছে। কালের বিবর্তনে বিস্তৃত হচ্ছে ইন্টারনেট সেবা, চোখের সামনে অনলাইনে খুলে যাচ্ছে অজানা বিস্ময়, না-দেখা নতুন জগৎ এবং এর অপব্যবহারও হচ্ছে প্রতিনিয়ত। মানুষ নিজেকে অন্যের কাছে প্রকাশ করতে চায়, বানাতে চায় নতুন বন্ধু, বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য অনুসন্ধান করে নতুন কিছু শিখতে চায় এটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি, আর এটিকে সহজ করে দিয়েছে ইন্টারনেট ব্যবস্থা। খেলাধুলায় বিমুখ হয়ে ইন্টারনেটের দিকে বেশি মনোযোগী হচ্ছে আমাদের শিশু-কিশোররা। আমাদের শিশু-কিশোররা এ অপব্যবহারের প্রধান শিকার। কারণ সীমাহীন কৌতূহল নিয়ে নতুন কিছু জানার আগ্রহে তারা ইন্টারনেট ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছে সাধারণের চেয়ে অনেক গুন বেশী, এর ফলে অনেক শিশু-কিশোরই অনলাইনে যৌন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছে, এর ফলে শিশু যৌন হয়রানিসহ নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতাও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে অভিভাবকদের।
এরই মাঝে অনেককেই বলতে শুনি “শিশু-কিশোরেরা ইন্টারনেটের অপব্যবহার করছে’’ তাই শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারে আমাদেরকে সচেতন হতে হবে। ইন্টারনেটের বহুমাত্রিক উপকারিতার পাশাপাশি এর নেতিবাচক দিকও রয়েছে অনেক। তাই অভিভাবকদের পাশাপাশি প্রাথমিকস্তর থেকে শুরু করে উচ্চস্তর পর্যন্ত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ সকল শিক্ষককে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে, শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো কিভাবে ব্যবহার করছে? নিশ্চিত হতে হবে যে, তারা যেসব ওয়েবসাইট ও সফটওয়্যার ব্যবহার করছে তা নিরাপদ কিনা? সচেতন থাকা ও সতর্কতা অবলম্বন করা হলো নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি, তাই কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক হয়ে দাড়িয়েছে।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে শিক্ষকদের ভূমিকা কী? আমরা সবাই জানি শিক্ষক মানেই সচেতন ব্যক্তি, তাই শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যদি একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদেরকে ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় কি করণীয়, কি বর্জনীয় এবং কেমন করে তাঁরা আদর্শ ডিজিটাল নাগরিক হতে পারে সে ব্যাপারে সচেতনতামূলক আলোচনা করে তাহলে ইন্টারনেট ব্যবহারে শিক্ষার্থী অনেক সচেতন হবে। এ ব্যাপারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর সচেতনতামূলক কর্মশালা বা মতবিনিময় ও আলোচনাসভার আয়োজনও করতে পারে। সেইসাথে অভিভাবকদেরকেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করতে হবে, তবেই আমরা শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তি শিক্ষা ও এর নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারব।
লেখক: শিক্ষক, সৈয়দপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, নীলফামারী।