দেশে-বিদেশ কথা বলার উপায় হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে স্কাইপ, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, ভাইবার, ট্যাঙ্গো, হ্যাংআউটের মতো কমিউনিকেশন অ্যাপ্লিকেশনগুলো। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে মেসেঞ্জার। ইন্টারনেট নির্ভর এসব অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে ভয়েস ও ভিডিও উভয় প্রকারের কল করা যায়। এসব অ্যাপের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দিয়েছে দেশের টেলিফোন অপাররেটরদের কল ব্যবসা।
এ বিষয়ে মোবাইল ফোন অপারেটর রবির হেড অব করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার শাহেদ আলম জানান,‘যোগাযোগভিত্তিক অ্যাপসগুলোর কারণে ভয়েস কল কমেছে। এসএমএস কমে গেছে প্রায় এক তৃতীয়াংশ। অ্যাপ সেবাগুলোর কারণে গত রমজানের ঈদে মোবাইল অপারেটরগুলোর ভয়েস কল ২০ শতাংশ ড্রপ করেছিল।’ ডাটার উত্থানে এমনটা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে মোবাইল ফোনে ভয়েসসহ অন্যান্য সেবা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে ১৫০-১৮০ জিপিবিপিএস (গিগাবাইট পার সেকেন্ড)এর বেশি ব্যান্ডউইথ ব্যবহার হয়। এর মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ, স্কাইপ, মেসেঞ্জার, ভাইবার, ইমো, ট্যাঙ্গো, হ্যাংআউটসহ অন্যান্য কমিউনিকেশন অ্যাপ্লিকেশনগুলোতে ব্যবহার হচ্ছে ৩০ জিপিবিপিএ’র বেশি ব্যান্ডউইথ। ২০১৪ সালের নভেম্বরে যার পরিমাণ ছিল ১০-১৫ জিপিবিপিএস। গত চার বছরের ব্যবধানে যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক অপারেটর্স গ্রুপ (বিডিনগ)-এর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুমন আহমেদ সাবির।
মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর সূত্রে জানা গেছে, ওটিটি সেবার ব্যবহার বাড়লে মোবাইল অপারেটরগুলোর রাজস্ব আয়ে চাপ পড়ে। ডাটার ব্যবহার বাড়তে থাকে। অপারেটররা তখন ভয়েস কলের ক্ষতি ডাটা ও অন্যান্য ভ্যালু অ্যাডেড সেবার মাধ্যম পুষিয়ে নিতে চেষ্টা করে। অ্যাপ সেবা দেশে জনপ্রিয় হওয়ার পরে মোবাইলের স্থানীয় ভয়েস কল প্রায় ৮-৯ শতাংশ কমে গেছে। আর বিদেশ থেকে আসা কল (আইজিডব্লিউ) গত পাঁচ বছরে কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর ভয়েস কলে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় তা ডাটা তথা ইন্টারনেটের সেবার মাধ্যমে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কোনও কোনও অপারেটরের রাজস্ব আয়ের ৫-১০ শতাংশ এমনকি আরও বেশি আসছে ইন্টারনেটের বিভিন্ন প্যাকেজ বিক্রি করে বলে জানা গেছে।
তিনি আরও বলেন, অ্যাপ সেবার মাধ্যমে শুধু ভয়েস কলের ক্ষেত্রে ডাটা তেমন একটা খরচ হয় না। থ্রিজি বা ফোরজি নেওয়ার্ক সক্রিয় থাকলে এবং ভিডিও কলের ক্ষেত্রে ডাটার ব্যবহার বাড়ে। থ্রিজি ও ফোরজি আসার পরে ইন্টারনেট নির্ভর ভয়েস কল, ভিডিও কল, ভিডিও স্ট্রিমিং ইত্যাদির কারণে দেশে মোবাইল ডাটার ব্যবহার প্রায় ১০০-১৪০ শতাংশ বেড়েছে।
এর আগে টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও লার্ন এশিয়ার জ্যেষ্ঠ ফেলো আবু সায়ীদ খান বলেছিলেন, ‘নতুন প্রযুক্তি পুরনো প্রযুক্তির জায়গা নেবে এটাই স্বাভাবিক। এ কারণে মোবাইলের এসএমএসও দিন দিন কমবে। জাপানে কখনও এসএমএস ছিল না। সেখানে মাল্টিমিডিয়া মেসেজের (এমএমএস) ব্যবহার হচ্ছে শুরু থেকে।’
জানতে চাইলে দেশে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবি’র সভাপতি আমিনুল হাকিম বলেন, ‘এখন বেশিরভাগ কথা হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবার দিয়ে। ফেসবুকের মেসেঞ্জার অ্যাপ দিয়েও অনেকে কথা বলছেন। এটা প্রযুক্তির সুফল। আর এই সুফল প্রভাব ফেলেছে মোবাইল ফোনের ভয়েস কলে।’
তিনি জানান, দেশে এখন ফেসবুকের ৩-৪টা ‘ক্যাশিং’ সার্ভার বসানো হয়েছে। ফলে মেসেঞ্জারভিত্তিক যোগাযোগ ছাড়া শুধু ফেসবুকে ইন্টারনেট বেশি খরচ হচ্ছে না। ইউটিউবের জন্য স্থানীয়ভাবে অন্তত ৩৫-৪০টি লোকাল সার্ভার বসানো হয়েছে। ফলে এসবে এখন আর বেশি ব্যান্ডউইথ প্রয়োজন হয় না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মোবাইল অপারেটরগুলো ইন্টারনেট নির্ভর আরও কিছু সেবা শিগগিরই চালু করতে যাচ্ছে। সেসব ভ্যালু অ্যাডেড সেবা চালু হলে মোবাইলে ডাটার ব্যবহার আরও বাড়বে। যদিও অপারেটরগুলো প্রতিনিয়তই বিভিন্ন সেবা চালু করছে, কিন্তু এবার মোবাইল ব্যবহারকারীদের জন্য বড় ধরনের চমক থাকবে বলে জানা গেছে।