সঞ্চয়পত্র © ফাইল ছবি
সঞ্চয়পত্রে মুনাফার কর আগের জায়গায় ফিরছে। অর্থাৎ বাড়তি কর দিতে হবে না। ফলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের বেশিরভাগ উপকৃত হবেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, যাদের সঞ্চয়পত্রের মুনাফাই আয়ের একমাত্র উৎস, তারা বেশি উপকৃত হবেন। আর যাদের সঞ্চয়পত্র ছাড়াও অন্যান্য আয় রয়েছে, তাদের দিকে একটু বেশি নজর দেয়া হবে। এ ব্যাপারে গতকাল বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
সূত্রমতে, নতুন আয়কর আইনে সঞ্চয়পত্রের মুনাফাকে করদাতার আয় হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পুরোনো আইনে মুনাফার অর্থ করদাতার আয়ের সঙ্গে যুক্ত হতো না, শুধু মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হতো, যা করদাতার চূড়ান্ত করদায় হিসাবে বিবেচিত হতো। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্র থেকে পাওয়া মুনাফার ওপর আর কোনো কর দিতে হতো না। নতুন আইনে একই হারে উৎসে কর কাটলেও অন্য (চাকরি, ব্যবসা, বাড়িভাড়া প্রভৃতি) আয়ের সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা যোগ করে করদাতার চূড়ান্ত করদায় নির্ধারণ করার বিধান রাখা হয়েছে। এ কারণে ক্ষেত্রবিশেষে চলতি করবর্ষ থেকেই করদাতাদের বাড়তি কর দিতে হবে।
ধরা যাক, কোনো করদাতার বার্ষিক আয় ১০ লাখ টাকা। ওই করদাতা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে বছরে মুনাফা পান ২ লাখ টাকা। সঞ্চয়পত্রের ওই মুনাফা থেকে ২০ হাজার টাকা উৎসে কর কেটে রাখা হয়। নতুন আয়কর আইনের বিধান কার্যকর হলে সে ক্ষেত্রে করদাতার ১০ লাখ টাকা আয়ের সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের ২ লাখ টাকা মুনাফাও আয় হিসেবে যুক্ত হতো। এরপর ওই করদাতার যে কর নির্ধারিত হতো, তা থেকে ২০ হাজার টাকা উৎসে কর বাদ দিয়ে বাকি কর পরিশোধ করতে হতো। এখন বিধানটি বাদ দেওয়ায় সঞ্চয়পত্র থেকে প্রাপ্ত ২ লাখ টাকা মুনাফা আর আয় হিসেবে যুক্ত হবে না। এ ক্ষেত্রে উৎসে কর হিসেবে কেটে নেওয়া ২০ হাজার টাকাই চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ ছাড়া নতুন আইনে রপ্তানি খাতে সরকারের দেওয়া নগদ সহায়তা বাবদ প্রাপ্ত অর্থকেও রপ্তানিকারকের আয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। গতকাল নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে সেখানেও সংশোধন এনেছে এনবিআর। এর ফলে এখন থেকে নগদ ভর্তুকি থেকে প্রাপ্ত অর্থ রপ্তানিকারকের আয় হিসেবে আর বিবেচিত হবে না। নগদ ভর্তুকির বিপরীতে যে উৎসে কর কাটা হবে, সেটিই চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে গণ্য হবে।
এর বাইরে যেসব করদাতার জন্য রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যাংকের সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানত থেকে প্রাপ্ত সুদ বা মুনাফা থেকে যে উৎসে কর কাটা হবে, সেটিও চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বিবেচিত হবে। নতুন প্রজ্ঞাপনে এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত করদাতাদের। এ তালিকায় আছেন বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকারি বিভিন্ন সংস্থা প্রভৃতি।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২২-২৩ অর্থবছর ৮০ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর বিপরীতে মুনাফা ও মূল বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৮৪ হাজার ১৫৪ কোটি টাকার। সব মিলিয়ে এই অর্থবছরে যা বিনিয়োগ হয়েছে, তার চেয়ে তিন হাজার ২৯৬ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করেছে সরকার। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরে একক মাস হিসেবে জুনে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ছয় হাজার ১৩৯ কোটি টাকার। বিপরীতে ওই মাসে মূল ও মুনাফা বাবদ সরকারকে পরিশোধ করতে হয়েছে ছয় হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। এক মাসে নিট বিক্রি ঋণাত্মক (নেগেটিভ) ২৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকার।
বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক ৫২, পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৭৬, পাঁচ বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, তিন বছর মেয়াদি ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। কয়েক দফায় সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো হলেও এখনও তা ব্যাংকের তুলনায় বেশি।