বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন
বিশ্বব্যাংক © সংগৃহীত
দেশের স্নাতক বা তার চেয়ে বেশি ডিগ্রিধারীদের ৬০ শতাংশের বেশি চাকরি না পেয়ে অনানুষ্ঠানিক কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
এই প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর জেম মেতে, এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকা লিজেলোটে ওনসর্গ এবং বাংলাদেশ ও ভুটানের অপারেশনস ম্যানেজার গেইল মার্টিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংস্থাটির সিনিয়র এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার মেহরিন আহমেদ মাহবুব।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দেশের কর্মক্ষম মানুষের ৮৪ শতাংশই এই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। এই সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। এসব কাজে তাদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ কম।
অনানুষ্ঠানিক খাতে যারা কাজ করেন, তাদের চাকরির নিয়োগপত্র থাকে না। ফলে আইনি সুরক্ষা নেই বললেই চলে। নিয়োগকর্তা চাইলে যেকোনো সময় কাজ থেকে বাদ দিতে পারেন। এই খাতে নির্ধারিত মজুরি কাঠামো নেই।
এদিকে বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর বাড়তে থাকবে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশের হাতে সময় আর বেশি নেই। অথচ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনো দুর্বল। ফলে ধনী হওয়ার আগেই বয়স্ক সমাজে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও মোট কর্মসংস্থানের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত বা সুরক্ষিত কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ছোট উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে অনানুষ্ঠানিক খাতের ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, বিকল্প বা নিয়মিত চাকরি না পেয়ে তাঁরা এ ধরনের উদ্যোগ শুরু করেছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের অনানুষ্ঠানিক খাত জরিপ বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি কম। বাংলাদেশে এসব প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ। ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের হার ওই দেশগুলোর গড়ের অর্ধেক।
শ্রম-উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতে প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম-উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় কম। এ দুই দেশের পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন প্রতিষ্ঠানের তুলনায় শ্রমিকপ্রতি উৎপাদন বাড়াতে পিছিয়ে রয়েছে। এ ছাড়া পর্যটন ও খাদ্যসংশ্লিষ্ট খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি অত্যন্ত ধীর। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে কর্মিসংখ্যা কমাচ্ছে।
প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
এ অঞ্চলের কর্মক্ষম জনসংখ্যার মাত্র ১৭ শতাংশ পেনশন স্কিমে অবদান রাখেন, অন্যদিকে বয়স্কদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ পেনশন সুবিধা পান—যা বিশ্বের সর্বনিম্ন। একইসঙ্গে দীর্ঘায়ু লাভ করা মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদী সেবাগুলোও অপর্যাপ্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।