গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের লোগো © সংগৃহীত ও সম্পাদিত
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১৪ জন গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেছেন। আজ বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ১৫তম গভর্নর হিসেবে মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট ‘দীর্ঘ অভিজ্ঞতা’ থাকলেও নতুন গভর্নর একজন ব্যবসায়ী। এর আগে কোনো ব্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পদটিতে নিয়োগের নজির নেই।
বুধবার আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে মো. মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পৃথক প্রজ্ঞাপনে সরকারের এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তবে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি সদ্য সাবেক গভর্নরকে আগে জানানো হয়নি। সকালে অফিসে পৌঁছালে মবের মুখে পড়ে ব্যাংক ত্যাগ করেন তিনি। একই সময় গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকেও মবের মুখে পড়তে হয়। পরে নতুন গভর্নর নিয়োগের প্রজ্ঞাপন আসে।
জানা গেছে, নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান একজন হিসাববিদ (এফসিএমএ), পেশায় ব্যবসায়ী। তিনি হেরা সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। হেরা সোয়েটার্স নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত একটি পরিবেশবান্ধব কারখানা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেন। পরে তিনি আইসিএমএবি থেকে হিসাববিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি এফসিএমএ লাভ করেন।
আরও পড়ুন: ‘মব’ করে বের করে দেওয়া হল গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে
তৈরি পোশাক ছাড়াও আবাসন খাতে মোস্তাকুর রহমানের ব্যবসা রয়েছে। তিনি ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আর্থিক খাতে সুশাসন নিয়ে কাজ করছেন। বিশেষ করে করপোরেট ফিন্যান্স, রপ্তানি, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা আছে তার। এ ছাড়া তিনি তৈরি পোশাকের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব, অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব), ঢাকা চেম্বারের সদস্য। এসব সংগঠনের বিভিন্ন কমিটিতে তিনি কাজ করেছেন। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেডেও কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
যেমন ছিলেন আগের গভর্নররা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ১৯৭২ সালে ১৮ জানুয়ারি প্রথম গভর্নর নিয়োগের পর কখনোই কোনো ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানো হয়নি। অভিজ্ঞ ব্যাংকার, শিক্ষক অথবা অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবদেরই সবসময় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম গভর্নর আ ন ম হামিদুল্লাহ (১৯৭২-৭৪) ছিলেন ব্যাংকার। ১৯৫০ সালে তিনি স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের অফিসার্স প্রশিক্ষণ কোর্সের প্রথম ব্যাচে যোগদান করেন। কোর্স শেষে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এ প্রথম শ্রেনীর অফিসারের পদ লাভ করেন। তিনি এ ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করেন। পরে ১৯৬০ সালে পাকিস্তান শিল্পউন্নয়ন ব্যাংকের পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক শাখা প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭২ সালে তাকে প্রথমবারের মতো গভর্নর নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ সরকার।
একইভাবে দ্বিতীয় গভর্নর একে নাজিরউদ্দিন আহমেদও (১৯৭৪-১৯৭৬) ব্যাংকার ছিলেন। তৃতীয় গভর্নর এম নূরুল ইসলাম (১৯৭৬-১৯৮৭) ছিলেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের (সিএসপি) কর্মকর্তা। তিনি ছিলেন ব্যাংকটির প্রথম ‘আমলা গভর্নর’। সিএসপি কর্মকর্তা হিসেবে অর্থ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল তার। চতুর্থ গভর্নর শেফতা বখত চৌধুরী (১৯৮৭-৯২) এবং পঞ্চম গভর্নর এম খোরশেদ আলমও (১৯৯২-৯৬) আমলা ছিলেন। এরপর ষষ্ঠ গভর্নর হন ব্যাংকার লুৎফর রহমান সরকার (১৯৯৬-৯৮)।
আরও পড়ুন: অন্যদিনের মতোই অফিসে এসেছিলেন, হঠাৎ ‘সরানোর খবরে’ কিছু না বলে চলে গেলেন গভর্নর
সপ্তম গভর্নর হিসেবে প্রথমবারের মতো এই শীর্ষ পদে আসীন হন মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন (১৯৯৮-২০০১)। তিনি অর্থনীতির শিক্ষক ছিলেন, আবার আমলাও ছিলেন। অষ্টম গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদও (২০০১-২০০৫) একাধারে অর্থনীতির শিক্ষক, আমলা ও বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা ছিলেন। নবম গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদও (২০০৫-২০০৯) ছিলেন তাই। বিএনপি, তত্ত্বাবধায়ক ও আওয়ামী লীগ— তিন সরকারের আমলের গভর্নর তিনি।
দশম গভর্নর আতিউর রহমান (২০০৯-১৬) একজন অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক। একাদশ গভর্নর ফজলে কবির (২০১৬-২০২২) সাবেক আমলা, তিনি অর্থসচিব ছিলেন। দ্বাদশ গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারও (২০২২-২০২৪) অর্থ বিভাগে সিনিয়র সচিব পদে কর্মরত ছিলেন।
ত্রয়োদশ ও বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রথম মহিলা গভর্নর (ভারপ্রাপ্ত) নুরুন নাহার গভর্নর পদে আসার আগে ডেপুটি গভর্নর ছিলেন। তিনি ১৯৭৯ সালে ব্যাংকটিতে সহকারী পরিচালক পদে যোগ দিয়েছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
সদ্য সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর
তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০১৪ সালের ১৩ আগস্ট নিয়োগ দেয় আহসান এইচ মনসুরকে। গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ছিলেন। এর আগে তিনি ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেডের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ওয়ালটনের একজন স্বাধীন পরিচালক হিসাবেও কাজ করেছেন। তিনি ১৯৮১ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে যোগদান করেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ফিসকাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগে কাজ করেছেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এর নীতি উন্নয়ন ও পর্যালোচনা বিভাগ এবং মধ্যপ্রাচ্য বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর ১৯৮৯ সালে অর্থমন্ত্রী ওয়াহিদুল হকের অর্থ উপদেষ্টা নিযুক্ত হন আহসান এইচ মনসুর, ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়া বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি আফগানিস্তান, পাকিস্তান, জর্ডান, কুয়েত, ওমান, সুদান এবং ইয়েমেনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সিনিয়র আবাসিক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আরও পড়ুন: ‘লোভে পড়ে আপনারা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছেন’
পরে সদ্য সাবেক গভর্নর বাংলাদেশ পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। অবসর নেওয়ার পর স্যার ফজলে হাসান আবেদের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ২০১৯ সালের ২৭ আগস্ট ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। তিনি পলিসি ইনসাইটসের সম্পাদকীয় উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য।
এর আগে ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হন। ১৯৭৭ সালে ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং ১৯৮২ সালে ওয়েস্টার্ন অন্টারিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন।