হাত-মুখ-চোখ বেঁধে বাসেই চলে ধর্ষণ, হয় টাকা ভাগাভাগিও

গ্রেফতার একজন
গ্রেফতার একজন  © সংগৃহীত

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় দোষীদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে শুরু করেছে পুলিশ। ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অনেকেই এখনও আতঙ্কে ভুগছেন। হাসপাতালে ভর্তি কেউ কেউ।

কিন্তু কী হয়েছিল সেই রাতে? কীভাবেই দীর্ঘসময় বাসটি জিম্মি করে নিজেদের কব্জায় রাখেন ডাকাতরা। ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন বাসটির যাত্রী কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সালিমপুর এলাকার ফল ব্যবসায়ী হেকমত আলী। স্ত্রী, দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে ওই বাসে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন তিনি। 
 
তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা প্রত্যেকের হাত, পা ও চোখ বেঁধে মারধর করে। টাকা, মুঠোফোন এবং নারী যাত্রীদের কাছ থেকে স্বর্ণালংকার লুট করে। এ সময় বাসের ভেতরেই এক নারী যাত্রীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এ সময় তার হাত-মুখ-চোখ বেঁধে ফেলে দুবৃত্তরা।

হেকমত বলেন, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে দৌলতপুর উপজেলার তারাগুনিয়া এলাকা থেকে ঈগল এক্সপ্রেস বাসে উঠি। ওই সময় বাসে ১০ থেকে ১৫ জন যাত্রী ছিলেন। বাসটি ভেড়ামারা, লালন শাহ সেতু ও বনপাড়া হয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে সিরাজগঞ্জের একটি হোটেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে বিরতি শেষে রাত পৌনে ১২টার দিকে ঢাকার দিকে চলতে থাকে।

রাত ১২টার দিকে মহাসড়কের ওপর একটি জায়গায় চারজন তরুণ বাসের সামনে থেকে হাত তুলে ইশারা দেন। বাসচালকের সহকারি সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ওই তরুণদের সঙ্গে কথা তাদেরকে বাসে তোলেন। এই চার তরুণের প্রত্যেকের মুখেই মাস্ক ছিল। তারা পেছনে বসার পরপরই মোবাইল টিপতে থাকেন। বাস আরও ১৫ মিনিট আরও পাঁচজন একইভাবে ওঠেন। কয়েক মিনিট পর আরেকটু সামনে গিয়ে আরও দুজন ওঠেন। এর পরপরই বাসের চালককে বাস থামাতে বলা হয়। চালক থামাতে রাজি না হলে তাকে মারধর করে তরুণদের দল। একজন তরুণ দ্রুত তাকে সরিয়ে চালকের আসনে বসে বাসের নিয়ন্ত্রণ নেন।

পড়ুন: পা-য়ে ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, পা দিয়েই হতে চান জজ

হেকমত আলী বলেন, কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ১০ তরুণ বাসের প্রতিটি সিটের পাশে পাশে দাঁড়িয়ে পড়েন। তারা পুরুষ যাত্রীদের গলায়  ছুরি ও কাঁচি ধরে রাখেন। তাদের মধ্যে তিন থেকে চারজন দ্রুত বাসের পর্দা কেটে পুরুষ যাত্রীদের মুখ, হাত ও পা বেঁধে ফেলেন। বাসের মাঝখানের লম্বা জায়গায় মাথা নিচু করে তাদের বসিয়ে রাখেন। বাসে থাকা ১০ থেকে ১২ জন নারী যাত্রীর মধ্যে একজনের চোখ, মুখ ও হাত বেঁধে ফেলা হয়। বাকিদের চোখ, মুখ ও হাত খোলা ছিল। ওই একজন নারী যাত্রী আমার শাশুড়ি। বাস তখন স্বাভাবিক গতিতে চলতে থাকে। বাসের সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। জানালার গ্লাসগুলো আটকে দেওয়া হয়। 

হেকমত আলী জানান, বাসের পেছনের দিক থেকে তিন সিট সামনে বসে ছিলেন তিনি। তার হাত বাঁধা। তার থেকে দুই হাত দূরে এক নারীকে তল্লাশি করার সময় ওই নারী প্রতিবাদ করেন। ওই নারী ডাকাত দলকে ‘দেখে নেয়ার’ হুমকি দেন। এ কথা শোনার পর দুই তরুণ ওই নারীকে মারধর করেন, শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। পরে ওই নারীকে ধর্ষণ করেন ডাকাতরা। 

তিনি বলেন, ভোরের দিকে যখন পুলিশ আসে, তখন কয়েকজন যাত্রীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েকজনকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। থানায় পুলিশ তাদের দুটি ছবি দেখায়। ছবির দুজন বাসের মধ্যে ছিল বলে যাত্রীরা নিশ্চিত করেন। পরে পুলিশের সহায়তায় বাসায় ফেরেন।

হেকমত আলীর স্ত্রী জেসমিন আরা বলেন,  আমি সিটে এক সন্তানকে বুকে জড়িয়ে মাথা নিচু করে আল্লাহর নাম নিচ্ছিলাম। সামনে আরেক সিটে আমার মা বসেছিলেন আরেক সন্তানকে নিয়ে। তার হাত, চোখ, মুখ বাঁধা ছিল। ভয়ে আমার শিশু কাঁদছিল, এজন্য ডাকাতরা বলছিল খুন করে ফেলব।

তিনি আরও জানান, ডাকাত দল সব কাজ শেষ করার পর একে অপরকে ডাকাডাকি করে। ডাকাত দলের সরদারকে তারা ‘কাকা’ বলে সম্বোধন করছিল। মাঝেমধ্যে নুরু, সাব্বির, রকি নামেও ডাকা হচ্ছিল। রাত ৩টার দিকে ডাকাতরা টাকা, মুঠোফোন ও স্বর্ণালংকার নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি শুরু করে। বাসের ভেতরে ভাগাভাগি নিয়েও তাদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে সড়কের এক পাশে গাড়িটি থামিয়ে দ্রুত তারা নেমে চলে যায়। বাসের ভেতর কোনো যাত্রী মাথা উঁচু করলে বা কথা বলার চেষ্টা করলে তাদের ব্যাপক মারধর করে। 

এর আগে গণমাধ্যমে দেয়া ধর্ষণের শিকার নারী বলেন,  ‘ডাকাতি শুরুর আগে আমার পাশের খালি সিটে ডাকাতদের একজন বসতে চাইলে তাকে বসতে দিইনি। ডাকাতি শুরু করলে আমি তাদের বাধা দিয়েছিলাম। এ কারণে তারা আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়। এ সময় তারা আমার পাশের সিটে বসা হেলপারকে তুলে নেয়। আমার সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তারা আমার হাত-মুখ-চোখ বেঁধে ফেলে এবং ধর্ষণ করে’। 

পড়ুন: মিরসরাইয়ের ট্রেন দুর্ঘটনায় আরও এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু

এদিকে এ ঘটনায় ডাকাতি ও ধর্ষণের মূলহোতা রাজা মিয়া নামে একজনকে টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। 


x