মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ ও নিহত ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম © টিডিসি সম্পাদিত
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ। এই কিশোর অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল সরঞ্জামাদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেরই ডেলিভারিম্যান হিসেবে চাকরি করতেন। দুই সপ্তাহ আগে ১৪ হাজার টাকা মাসিক বেতনে তিনি কাজে যোগ দেন। তবে, এখনো তার সঙ্গে চুক্তিপত্র হয়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থেকেই অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনা ঘটে। তবে তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে ফাহাদের সঙ্গে আরেকটি বিরোধের তথ্যও পেয়েছে পুলিশ।
সূত্র বলছে, ফাহাদকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল অপ্রতিম। সম্প্রতি সে টাকা ফেরত চাইছিল। এ নিয়ে অপ্রতিমের ওপর বিরক্ত ছিল ওই কিশোর। অপ্রতিম বেঁচে না থাকলে টাকা ফেরত দিতে হবে না—এমন চিন্তাও তার মধ্যে ছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন। তাই তুহিনের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ফাহাদও জড়িয়ে পড়ে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আইফোন ছিনিয়ে নিতেই ধস্তাধস্তির সময় বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করেন মূল পরিকল্পনাকারী সাইফুল ইসলাম তুহিন, এরপরই আঘাত করেন ফাহাদ। তারপর মো. কামরুল হাসান (১৬)।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে অপ্রতিমের বাবা জানান, ফাহাদ কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সালমানপুর (মেম্বার বাড়ি) এলাকার মমিন হোসেন ও জুলি আক্তারের ছেলে। তার বাবা অটোচালক। বাবা-মায়ের অনুরোধেই চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর ডেলিভারিম্যানের চাকরি দেওয়া হয় তাকে। মাস শেষে তার সঙ্গে চুক্তিপত্র করবেন এমন ইচ্ছাও ছিল অপ্রতিমের বাবার।
অপ্রতিমের বাবা জানান, হত্যাকাণ্ডের দিন সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাতেও বাসায় না ফেরায় ফাহাদকে ফোন করে ডেকে এনে বিষয়টি জানান অপ্রতিমের বাবা। কোথায় গেছে, খুঁজতেই তাকে আনা হয়। সে তখন তাদের ইন্টারনেট গ্রুপে অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি লিখে দেয়। এর মধ্যে এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ হাতে আসে অপ্রতিমের পরিবারের কাছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও মায়ের কলিগরা তা সংগ্রহ করেন।
তিনি আরও জানান, সিসিটিভি ফুটেজে যাকে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা গেছে সে কে জানতে চাইলে তুহিনকে দেখামাত্রই সহজেই চিনিয়ে দেন ফাহাদ। চেনার পর ফাহাদকে বলা হয় তুহিনকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করতে অপ্রতিমকে দেখেছে কি না, কোথায় গেল। ফাহাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনের কথোপকথনে তুহিন জানায় অপ্রতিম তার কাছে আসেনি। তখন রাত ১০টা বাজে।
অপ্রতিমের বাবা বলেন, শনিবার দুপুরে মরদেহ উদ্ধারের খবর আসার পর ঘটনাস্থলে ফাহাদকে অপ্রতিমের পরিবারের সঙ্গে যেতে বললে তার শরীর খারাপ লাগছে বলে সে চলে যায়।
যেভাবে ফাহাদের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায় পুলিশ:
সূত্র জানায়, তদন্তে তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ঘটনাটির আরও কিছু তথ্য সামনে আসে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া সময়রেখা অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৯টার দিকে তুহিনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তখনো অপ্রতিমের মৃত্যুর বিষয়টি জানতেন না জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তারা। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পান তারা।
তদন্তকারীদের ভাষ্য, শুরুতে তুহিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করছিলেন। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর শনিবার রাত ৮টার দিকে তিনি নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। তবে তখনও অন্যদের নাম বলতে চাইছিলেন না। তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার মুঠোফোনে বারবার ফোন আসছিল। ফোন করছিল অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা ওই কিশোর। বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে আসে। পরে তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, আটকের সময়ও ওই কিশোরের গায়ে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট ছিল। তাকে আটকের খবর পাওয়ার পর তুহিন আরেক কিশোরের নাম জানান। এরপর তাকেও হেফাজতে নেয় পুলিশ।
জেলা পুলিশ সুপার বলেন, শুক্রবার বিকেল আনুমানিক ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সানন্দা এলাকার নির্জন বনে অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় অপ্রতিম বাধা দিলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে প্রথমে তুহিন এবং পরে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তুহিন তার ব্যবহৃত আইফোনটি নিয়ে ফাহাদ ও কামরুলসহ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।