ডোরাকাটা লেজের লেমুর © সংগৃহীত
গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি যাওয়া তিনটি ডোরাকাটা লেজের লেমুরের মধ্যে দুটিকে ভারতে পাচার করা হয়েছে। একাধিক হাত ঘুরে লেমুর দুটি এখন ভারতের গুজরাতের একটি বেসরকারি বন্যপ্রাণী উদ্ধার, সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে রয়েছে বলে জানতে পেরেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তারা লেমুর দুটির সন্ধানে অনুসন্ধান শুরু করেন। একপর্যায়ে জানা যায়, চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে লেমুর দুটি ভারতে পাচার করা হয়েছে। পরে সেগুলো একাধিক হাত ঘুরে গুজরাতের ভান্তারা নামের একটি বন্যপ্রাণী কেন্দ্রে পৌঁছায়।
লেমুর দুটি বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে—এটি প্রমাণ করতে পারলেই সেগুলো দেশে ফেরানোর পথ তৈরি হবে। এ জন্য জেনেটিক প্রোফাইল বা ডিএনএ পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, প্রাণিটির আগের জেনেটিক প্রোফাইল বা ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টের সঙ্গে নতুন করে করা পরীক্ষার রিপোর্ট মিলিয়ে দেখা বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকর একটি উপায়।
তবে বিপাকে পড়েছে সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ। চুরি হয়ে যাওয়া লেমুর দুটির কোনো ডিএনএ রিপোর্ট তাদের কাছে নেই।
গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বলেন, আরেকটি লেমুরের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ওই লেমুরটির সঙ্গে চুরি হয়ে যাওয়া দুটি লেমুরের রক্তের সম্পর্ক রয়েছে। তাই সেটি থেকে একটি জেনেটিক প্রোফাইল পাওয়া গেলে লেমুর দুটি দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে তা কাজে আসতে পারে।
ডোরাকাটা লেজের লেমুর বাংলাদেশের স্থানীয় প্রাণী নয়। এ প্রজাতির লেমুর মূলত আফ্রিকার মাদাগাস্কার দ্বীপের বাসিন্দা। চোরাকারবারিরা সেখান থেকে এগুলো ধরে বিভিন্ন দেশে পাচার করে। এতে প্রাণীটির অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়েছে।
২০১৮ সালে বিদেশি পশু-পাখির একটি অবৈধ চালান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধরা পড়ে। ওই চালানে ম্যাকাও, ময়ূরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ছিল। একই চালান থেকে একজোড়া ডোরাকাটা লেজের লেমুরও উদ্ধার করা হয়। পরে সেগুলো গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।
পার্কে থাকা ওই লেমুর জোড়া পরবর্তী সময়ে দুটি বাচ্চা জন্ম দেয়। বেশ কিছুদিন পর ২০২২ সালের শুরুতে হঠাৎ একটি লেমুর মারা যায়। এর প্রায় তিন বছর পর, ২০২৫ সালের মার্চে পার্কে থাকা অবশিষ্ট তিনটি লেমুর একসঙ্গে চুরি হয়।
সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান বলেন, তখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আউটসোর্সিংয়ে কিছু কর্মী পার্কে কাজ করতেন। তাদের একজনের সহযোগিতায় একটি চক্র লেমুরগুলো চুরি করে।
ঘটনার পর পুলিশ চক্রটির আট সদস্যের মধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ওই কর্মীও ছিলেন। চুরির প্রায় এক মাসের মধ্যে ঢাকার একটি বাসা থেকে তিনটি লেমুরের একটি উদ্ধার করা হয়।
সিআইডির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা স্বীকার করেন, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বাকি দুটি লেমুর ভারতে পাচার করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে সেগুলো ভারতে ঢোকে। উদ্ধার হওয়া লেমুরটিকে পরে গাজীপুরের সাফারি পার্কে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তবে কয়েক মাস আগে সেটিও মারা যায়।
তারেক রহমান বলেন, লেমুর সাধারণত একা থাকে না। তারা দলবদ্ধভাবে থাকে। দীর্ঘদিন নিঃসঙ্গ থাকার কারণে শেষ লেমুরটি মারা গেছে বলে ধারণা করছে পার্ক কর্তৃপক্ষ।
এদিকে জিজ্ঞাসাবাদে ভারতে পাচারের তথ্য পাওয়ার পর থেকেই সিআইডি লেমুর দুটির সন্ধান চালিয়ে আসছিল। একপর্যায়ে কর্মকর্তারা জানতে পারেন, ভারতে কয়েক দফা হাতবদলের পর লেমুর দুটি গুজরাতের ভান্তারায় পৌঁছেছে।
সিআইডির ওই কর্মকর্তা বলেন, ভান্তারা একটি বেসরকারি বন্যপ্রাণী উদ্ধার, সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। এর মালিকানায় রয়েছে ভারতের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী আম্বানি পরিবার।
লেমুর দুটি সেখানে রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে সিআইডি তাদের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহের চেষ্টা করছিল। এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভান্তারার প্রকাশ করা একটি ভিডিও তাদের হাতে আসে।
সিআইডির ওই কর্মকর্তা বলেন, একদিন ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভান্তারার প্রকাশ করা লেমুরের ভিডিও দেখতে পান তারা।
ভান্তারা নামে একটি ফেসবুক পেজেও কয়েক মাস আগে ডোরাকাটা লেজের লেমুরের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। পেজটির প্রায় ১০ লাখ অনুসারী রয়েছে। ভিডিওতে বেশ কয়েকটি লেমুরকে একসঙ্গে দেখা যায়। তবে ওই ভিডিওর লেমুরগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া দুটিই রয়েছে—সিআইডি কর্মকর্তারা তা কীভাবে নিশ্চিত হলেন?
সিআইডির কর্মকর্তা বলেন, ভিডিওটি পাওয়ার পর তারা সেটি সাফারি পার্কের কর্মকর্তাদের দেখান। পার্কের কর্মকর্তারা লেমুরগুলোকে দীর্ঘদিন কাছ থেকে দেখেছেন। পরে তারাই মোটামুটিভাবে নিশ্চিত করেন, বাংলাদেশ থেকে চুরি যাওয়া দুটি লেমুরও সেখানে রয়েছে।
এরপর লেমুর দুটি দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ পুলিশ ইন্টারপোলের সহযোগিতা চায়। দাবির পক্ষে তথ্য-প্রমাণ দিতে বলা হলে দেখা যায়, সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু ছবি ও ভিডিও ছাড়া শক্ত কোনো প্রমাণ নেই।
তারেক রহমান বলেন, এর আগে এ ধরনের পাচারের ঘটনা না ঘটায় লেমুরগুলোর জেনেটিক প্রোফাইল বা ডিএনএ পরীক্ষার কথা তাদের মাথায় ছিল না। এ ধরনের পরীক্ষা করার সক্ষমতাও পার্ক কর্তৃপক্ষের নেই।
তবে তখন জীবিত থাকা লেমুরটির নমুনা সংগ্রহ করে জেনেটিক প্রোফাইল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর রিপোর্ট পাওয়া গেলে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ভারতে থাকা লেমুর দুটির জেনেটিক প্রোফাইলের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা হবে।
সিআইডির ওই কর্মকর্তা বলেন, তিনটি লেমুর একই পরিবারের হওয়ায় জেনেটিক মিল পাওয়ার আশা করছেন তারা। সেই মিল পাওয়া গেলে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করা সহজ হবে। একই সঙ্গে লেমুর দুটি দেশে ফিরিয়ে আনার পথও তৈরি হতে পারে।
এদিকে লেমুর দুটির বিষয়ে অভিযোগের ব্যাপারে ভান্তারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।