এক বছরে ১৪০ জন অপহৃত, আতঙ্কে টেকনাফের মানুষ

টেকনাফে পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অভিযান

টেকনাফে পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অভিযান © টিডিসি

কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়ন একসময় ছিল বন ও পাহাড়নির্ভর জীবিকার এলাকা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অপহরণ ও মানব পাচারের ভয়ংকর নেটওয়ার্ক। পাহাড়ের ভেতরে গোপন আস্তানায় মানুষকে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় এবং সুযোগ পেলেই সাগর পথে মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ায় পাচার করার অভিযোগও রয়েছে। সম্প্রতি বাহারছড়ার পাহাড়ি এলাকায় তিনজনের মরদেহ উদ্ধার এবং আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবিতে ৯ জন জীবিত উদ্ধার ও বহু নিখোঁজের ঘটনায় সীমান্তজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

স্বজন হারানোর আশঙ্কায় ভেঙে পড়ছে পরিবারগুলো, অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে পাহাড়ি-উপকূলের মানুষ। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গতকাল বুধবার সকাল থেকে অপহরণ ও মানব পাচার দমনে পাহাড়ি এলাকায় যৌথ অভিযান শুরু করেছে নৌবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উখিয়া সার্কেল) রকিবুল হাসান বলেন, ‘আমরা বাহারছড়াসহ পাহাড়ে অপরাধীদের আস্তানাগুলোয় নৌবাহিনীসহ যৌথ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি। আজকেও (বুধবার) বাহারছড়ায় পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে কয়েকটি অপহরণ-মানব পাচারকারীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছি। স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করছি।’

গত মঙ্গলবার শীলখালী বাহারছড়া এলাকায় পাহাড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন জানিয়ে তিনি বলেন, অপহরণ-মানব পাচারে জড়িতদের দ্রুত আইনের মুখোমুখি করা হবে।

এক বছরে ৯৫ ঘটনায় অপহৃত ১৪০
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচার ও অপহরণ কার্যত একই অপরাধ চক্রের অংশ। উপকূলজুড়ে সক্রিয় এই নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে প্রলোভন, জোর-জবরদস্তি ও অপহরণের মাধ্যমে সাগর পথে পাচার করছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে কক্সবাজার উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়াগামী অন্তত ৩ হাজার ১৩৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের বড় অংশই রোহিঙ্গা। এ সময়ের মধ্যে উখিয়া ও টেকনাফ থানায় ১১৫টি মামলায় প্রায় ১ হাজার ১০০ জনকে আসামি করা হয় এবং ৬০০ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে। গত ৪ জানুয়ারি সেন্টমার্টিন দ্বীপে মালয়েশিয়া পাচারের সময় নারী-শিশুসহ ২৬৩ জনকে উদ্ধার ও ১০ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়।

যৌথ বাহিনীর অভিযান
অন্যদিকে অপহরণের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। গত তিন বছরে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৮৫ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গত এক বছরেই ৯৫টি ঘটনায় অন্তত ১৪০ জন অপহৃত হন, যাদের মধ্যে ৮৬ জন রোহিঙ্গা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছেন। অপহরণের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে টেকনাফ সদর, হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও বাহারছড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম।

বাহারছড়া ও কচ্ছপিয়া ঘুরে জেলে, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে অপহরণ ও মানব পাচারের ভয়াবহ চিত্র মিলেছে। তাদের মতে, এসব অপরাধের পেছনে মাদক ও পণ্যের চোরাচালান, মানব পাচার চক্র, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়হীনতাই মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে।

দক্ষিণ বাহারছড়ার পাহাড়ঘেরা একটি এলাকায় স্থানীয় একটি মুদিদোকানে জমিসংক্রান্ত সালিশ শেষে উপস্থিত ৮-১০ জন জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে কথা হয়। সবার চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু অপহরণ ও মানব পাচারের বিস্তার।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল আজিজ বলেন, প্রায় প্রতিদিনই অপহরণের ঘটনা ঘটছে। সাগর পথে মানব পাচারও বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান কমে যাওয়ায় এসব ঘটনা বাড়ছে। পাহাড়জুড়ে এখন আতঙ্কের পরিবেশ। তিনি আরও বলেন, ‘এখানে এখন শুধু ভয়। সন্ধ্যা নামলেই আমরা সন্তানদের বাইরে যেতে দিই না। কখন কাকে ধরে। নিয়ে যায়, কেউ জানে না। অনেকেই জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।’

স্থানীয় বাসিন্দা মুদি দোকানি জালাল উদ্দিন বলেন, সন্ধ্যার পর এখানে চলাফেরা করা কঠিন। কখন কাকে ধরে নিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে বলা মুশকিল। আবার মুক্তিপণ না পেলে দালালদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তারা পাচার করে দেয় সাগর পথে।

সম্প্রতি মানব পাচারকারীর আস্তানা থেকে ফিরে আসা নুর আলম বলেন, ‘চোখ খুলে দেখি চারপাশে দুই শতাধিক মানুষ বন্দি। প্রতিদিনই চলে নির্ঘাতন। আমার কাছ থেকেও পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের জন্য অত্যাচার করা হয়। অন্যদের ক্ষেত্রেও একইভাবে পরিবারের কাছে ফোন দিয়ে নির্যাতনের শব্দ শুনিয়ে টাকা দাবি করা হয়। টাকা না পেলে তাদের মানব পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। যেদিন পালিয়ে আসি, সেদিনও আরও কয়েকজন আটক ছিল।’

কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এইচ এম নজরুল বলেন, অপহরণ ও মানব পাচার একই সূত্রে গাথা। শক্তিশালী এই চক্র ভাঙতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা জরুরি। ২০১৫ সালের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ হতে পারে।

বাহারছড়ার ইউপি সদস্য ফরিদ উল্লাহ বলেন, অপহরণ ও মানব পাচার বেড়ে যাওয়ায় সাত গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চৌকি স্থাপন জরুরি। পাচারকারীদের তালিকা পুলিশের কাছে রয়েছে। দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। মাছ ধরার নৌযানগুলোও নিবন্ধন ও চিহ্নিত করা দরকার। কারণ এসব নৌযানই পাচারে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, পর্যটকদের মেরিন ড্রাইভে বিশেষ করে সন্ধ্যার পর একা চলাচল থেকে বিরত থাকা উচিত। শীলখালী, বড়ডেইল, গর্জন বাগান, বাঘঘোনা ও কচ্ছপিয়া এলাকায় সতর্কতা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অস্থায়ী চেকপোষ্ট বসানো প্রয়োজন।

স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ নিয়োগ দেবে সুপারভাইজার, আবেদন শ…
  • ২৩ এপ্রিল ২০২৬
এসএসসি বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষার প্রশ্ন দেখুন এখানে
  • ২৩ এপ্রিল ২০২৬
ঝিনাইদহে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে কৃষক নিহত, আহত ১০
  • ২৩ এপ্রিল ২০২৬
স্পেশালাইজড হাসপাতাল থেকে চুরি হওয়া ৪ ট্রাক সামগ্রী উদ্ধার,…
  • ২৩ এপ্রিল ২০২৬
এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় বাড়ল
  • ২৩ এপ্রিল ২০২৬
জনবল নিয়োগ দেবে আড়ং, আবেদন শেষ ২৮ এপ্রিল
  • ২৩ এপ্রিল ২০২৬