আনোয়ারার পারকি সমুদ্র সৈকতে আটক রোহিঙ্গাদের একটি দল © টিডিসি ফটো
মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশ আশ্রয়ক্যাম্প ছেড়ে গোপনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দালালচক্রের সহায়তায় সাগরপথ ব্যবহার করে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার পারকি সমুদ্র সৈকত ও কর্ণফুলী টানেলসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকাকে ‘নিরাপদে নামার পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, গত এক বছরের বেশি সময় ধরে পারকি সমুদ্র সৈকত, কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এরিয়া ও রাঙ্গাদিয়া মাছের চরসহ উপকূলের বিভিন্ন নির্জন স্থানে মাঝেমধ্যে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে রোহিঙ্গাদের নামানো হচ্ছে। পরে তারা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে সিএনজি ও অটোরিকশা যোগে বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়।
রোহিঙ্গা আসার বিষয়ে এখনো আমাদের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই—কর্ণফুলী থানার বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আবদুল্লাহ আল নোমান
সবশেষ গত শুক্রবার (৩ এপ্রিল) ভোরে পারকি সমুদ্র সৈকতে শিশু ও নারীসহ প্রায় ২০ জন রোহিঙ্গার একটি দল আসে। সকাল ১০টার দিকে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) ও কর্ণফুলী টানেল এলাকার আশপাশে কাঁদামাখা অবস্থায় ঘোরাফেরা করতে দেখে স্থানীয়রা তাদের আটক করেন।
তবে আটক হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী থানা পুলিশের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি। স্থানীয়দের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সক্রিয়ভাবে এগোয় না। পরে স্থানীয়রা আটক রোহিঙ্গাদের নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী তাদের পুনরায় আশ্রয়ক্যাম্পে পাঠায় বলে জানা যায়।
রোহিঙ্গা আটকের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এক মিনিট ২৯ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের ওই ভিডিওতে এক রোহিঙ্গা যুবককে বলতে শোনা যায়, ‘ভাসানচর ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসেছি। সেখানে গ্যাস সংকট রয়েছে। পরিবার বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে আমরা কক্সবাজার ক্যাম্পে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছি।‘
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা জাহেদুল আলম বলেন, শুক্রবার সকালে শরীরে কাঁদামাখা নারী-শিশুসহ প্রায় ২০ জনকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখি। কথা বললে তারা জানায়, ভাসানচর আশ্রয়ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসেছে। পরে পুলিশ ফাঁড়িতে নিতে চাইলে তারা যেতে রাজি হয়নি এবং সেখান থেকে অন্যত্র চলে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা এম. লোকমান শাহ বলেন, মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়া হলেও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ক্যাম্প ছেড়ে বের হওয়ার প্রবণতা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। কয়েক বছর ধরে সাগরপথে পারকি সৈকত ও টানেল এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে লোকালয়ে প্রবেশের ঘটনা ঘটছে। এসব এলাকায় কঠোর নজরদারি জরুরি।
এক রোহিঙ্গা যুবককে বলতে শোনা যায়, ‘ভাসানচর ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসেছি। সেখানে গ্যাস সংকট রয়েছে। পরিবার বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে আমরা কক্সবাজার ক্যাম্পে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছি।‘
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কর্ণফুলী থানার বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, রোহিঙ্গা আসার বিষয়ে এখনো আমাদের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী এবং কর্ণফুলী থানার ওসি মো. শাহীনূর আলম বলেন, শুক্রবার রোহিঙ্গা আসার কোনো তথ্য আমাদের কাছে ছিল না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে।
উল্লখ্য, এই রুট ব্যবহার করে রোহিঙ্গা আসার ঘটনা নতুন নয়। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এরিয়া থেকে ভাসানচর থেকে পালিয়ে আসা ৩১ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি রায়পুর চুন্নাপাড়া এলাকা থেকে শিশুসহ সাতজন রোহিঙ্গা আটক হয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে পারকি সমুদ্র সৈকত ও টানেলসংলগ্ন এলাকা থেকে রোহিঙ্গাদের আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দালালচক্রের মাধ্যমে গত কয়েক বছরে ভাসানচর ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা অন্তত দুই শতাধিক রোহিঙ্গা উপকূলীয় এলাকায় পৌঁছেছে। টাকার বিনিময়ে নৌকাযোগে তাদের পারকি এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর পরিকল্পিতভাবে তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মিশে যাওয়ার চেষ্টা করে।