বিমানবন্দরে প্রতিবন্ধী সন্তান নিয়ে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন এক মা © টিডিসি সম্পাদিত
প্রতিবন্ধী সন্তানকে হুইলচেয়ারসহ বিমানে তুলতে না পারায় গন্তব্যে ফিরে গেছেন এক মা। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস ও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনা ও হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন তিনি। যদিও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ধরনের সুবিধা পেতে নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। টিকিটে বিষয়টি উল্লেখ না করায় এমন পরিস্থিতি হয়েছে। তারপরও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ফাতেমা হ্যাপি নামের এক ভুক্তভোগী নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘বাসে হুইলচেয়ার যাত্রী ওঠানোর ব্যাবস্থা বাংলাদেশে নেই। ভেবেছিলাম বিমানে নিশ্চয়ই থাকবে! এটাতো আধুনিক! কিন্তু এয়ার এস্ট্রা নামের একটা বিমানের টিকিট করেও হুইলচেয়ার যাত্রী আমার মেয়ে মারিয়ামকে নিয়ে ফেরত আসতে হলো! বান্দরবান ভ্রমণের বহুদিনের আকাংখা মারিয়াম আর তার ভাই-বোনদের আপাতত বন্ধ হয়ে গেল। আশা করছি, খুব শিগগিরই দেশের যোগাযোগব্যবস্থা হুইলচেয়ার বান্ধব হবে ইনশাআল্লাহ।’
ভুক্তভোগী ফাতেমা হ্যাপি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমরা অনলাইনে টিকিট বুকিং করে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম। গতকাল (রবিবার) রাত ৮টায় আমাদের ফ্লাইট ছিল। আমার সঙ্গে তিন সন্তান ছিল। বড় ছেলে, হুইলচেয়ারে চলাফেরা করা একটি মেয়ে এবং ছোট আরেক মেয়ে। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মেয়েটি জন্মগতভাবে অসুস্থ এবং হাঁটতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা জানতাম, বিমানে হুইলচেয়ার ওঠানোর জন্য র্যাম্পের ব্যবস্থা থাকে। তাই আলাদাভাবে কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করিনি। কিন্তু বোর্ডিং পাস নিতে গেলে সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে জানতে চাওয়া হয়, আমার মেয়ে হাঁটতে পারে কি না। আমি জানাই, সে হাঁটতে পারে না। তখন তারা বলে, বিমানে উঠতে চার-পাঁচটি সিঁড়ি পার হতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি তাদের বলেছিলাম, কয়েকজন মিলে আমার মেয়েকে হুইলচেয়ারসহ সিঁড়ি দিয়ে তুলে দিতে পারেন। এরপর তাকে সিটে বসিয়ে হুইলচেয়ারটি ভাঁজ করে রাখা যাবে কি না। কিন্তু তারা জানায়, এটি তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এ কারণে আমাদের ফিরে আসতে হয়। কারণ মেয়েকে ছাড়া আমাদের কারও পক্ষে যাওয়া সম্ভব ছিল না।’
তার ভাষ্য, ‘চট্টগ্রামে আমাদের হোটেল বুক করা ছিল। সেখান থেকে বান্দরবান যাওয়ারও পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সবকিছু বাতিল করে সন্তানদের নিয়ে বাসায় ফিরে আসতে হয়েছে। এ সময় কেউ আমাদের কোনো সহযোগিতা করতে পারেনি।’
ফাতেমা বলেন, টিকিটের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের মামা একটি এজেন্সির মাধ্যমে টিকিট করেছিলেন। আমাদের জানানো হয়েছে, টিকিটের টাকা ফেরত নিতে হলে ওই এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। বিমান কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে কিছু জানে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সেখানে অনেক ঘোরাঘুরি করেছি। কিন্তু কেউ কোনো সহযোগিতা করতে পারেনি। বাংলাদেশ বিমান থেকে বলা হয়েছে, তাদের বড় উড়োজাহাজগুলোতে কিছুটা সুযোগ আছে। কিন্তু সেগুলোতে তখন আসন খালি ছিল না। ইউএস-বাংলারও একটি বড় ফ্লাইট ছিল। সেখানে হয়তো হুইলচেয়ার ওঠানোর ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সেখানেও কোনো আসন খালি ছিল না।’
তিনি আরো বলেন, ‘তারা যদি বলত হুইলচেয়ার ভেতরে নেওয়া সম্ভব নয়, তাহলে অন্তত সহযোগিতার কোনো ব্যবস্থা করার চেষ্টা করতে পারত। আমার ছেলে মোটামুটি বড়। আরও দুজনের সহায়তায় মেয়েকে ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু তারা কোনো ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেয়নি।’
‘শুধু বলেছে, তাকে নেওয়া যাবে না এবং সে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারবে কি না। তারা বলেছে, সিঁড়িটি এত ছোট যে একজনের ওঠাই কষ্টকর। আমি আগে এত ছোট সিঁড়ি দেখিনি। বিমানে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমার আছে। সাধারণত বড় গেট দিয়েই প্রবেশ করা যায় বলে জানতাম। এখানে পরিস্থিতি এমন হবে, তা আগে জানা ছিল না’, যোগ করেন তিনি।
ফাতেমা উল্লেখ করেন, ‘তারা চাইলে অন্য কোনো ব্যবস্থা করতে পারত। এমনকি চারজনের মধ্যে আমার মেয়েকে নিয়ে অন্য একটি বিমানে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারত, আর বাকি দুই যাত্রীকে তারা অন্য ফ্লাইটে নিতে পারত। কিন্তু এ ধরনের কোনো সহযোগিতার উদ্যোগই তারা নেয়নি। সরাসরি বলে দিয়েছে, সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত আমাদের ফিরে আসতে হয়েছে।’
এ বিষয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (সিনিয়র সহকারী সচিব) কে এম আবু নওশাদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ডমেস্টিক ফ্লাইটে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট সেবা রয়েছে। তবে এ জন্য আগে থেকেই এয়ারলাইন্সকে জানিয়ে হুইলচেয়ার সেবা অ্যাসাইন করে নিতে হয়। এ সেবা বিনামূল্যে দেওয়া হয়।’
আরও পড়ুন: বদলি আবেদনে ভোগান্তি, ঢাকায় এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে শিক্ষকরা
তিনি বলেন, ডমেস্টিক ফ্লাইটে সাধারণত বোর্ডিং ব্রিজের সুবিধা থাকে না। ফলে যাত্রীকে সিঁড়ি দিয়ে বিমানে উঠতে হয়। তবে চলাফেরায় অক্ষম যাত্রীদের জন্য ‘অ্যাম্বুলিফট’ বা অ্যাম্বুলেন্সের মতো বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। আগে থেকে এ বিষয়ে এয়ারলাইন্সকে জানালে নির্দিষ্ট সময়ে অ্যাম্বুলিফটের ব্যবস্থা করা হয়।’
এতে যাত্রীকে বিশেষ গাড়িতে তুলে বিমানের দরজা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যায় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ সেবার জন্য কোনো অতিরিক্ত ফি নেওয়া হয় না। কিছু কানেক্টিং ফ্লাইটে বোর্ডিং ব্রিজের সুবিধা পাওয়া যায়। সেসব ফ্লাইটের ক্ষেত্রে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী যাত্রীরা সরাসরি বোর্ডিং ব্রিজ দিয়ে বিমানে উঠতে পারেন। এ ছাড়া আগে থেকে তথ্য জানানো হলে এবং সুযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাত্রীর প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সহযোগিতাও করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো যাত্রী নিজে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে না পারলে পরিবারের সদস্য বা অন্য কাউকে দিয়ে জোর করে উঠানোর চেষ্টা করা ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এ ধরনের কাজে প্রশিক্ষিত না হওয়ায় কেউ পড়ে গেলে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ কারণে নির্ধারিত অ্যাম্বুলিফট সেবা নেওয়াই নিরাপদ।’
গতকাল একটি পরিবারের হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিশুকে নিয়ে বিমানে উঠতে না পারার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি মূলত আগে থেকে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সকে জানানোর সঙ্গে সম্পর্কিত। অ্যাম্বুলিফটের প্রয়োজন হলে আগে থেকেই তা বুক বা অ্যাসাইন করে রাখতে হয়। এভাবে জানানো থাকলে ডমেস্টিক ফ্লাইটেও চলাফেরায় অক্ষম যাত্রীর জন্য এ সেবা দেওয়া সম্ভব।’
বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে এয়ার এস্ট্রা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।