শিক্ষা সংকট পর্যালোচনা ও উত্তরণের উপায়

২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৭ PM , আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৭ PM
প্রফেসর ড. আবু মুসা মোহাম্মদ আরিফ বিল্লাহ

প্রফেসর ড. আবু মুসা মোহাম্মদ আরিফ বিল্লাহ © টিডিসি সম্পাদিত

শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। অথচ শিক্ষার মূল লক্ষ্য যখন জ্ঞানার্জন ও দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে সনদনির্ভরতা, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ব্যক্তিস্বার্থে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই সংকটে পড়ে। বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ পর্যালোচনা করলে শিক্ষার মান, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং পাঠ্যক্রমের যথার্থতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আমার বিবেচনায়, বাংলাদেশের শিক্ষাসংকট কেবল পাঠ্যপুস্তক কিংবা পরীক্ষা পদ্ধতির সমস্যা নয়; এর গভীরে রয়েছে নীতিনির্ধারণী দুর্বলতা, যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়নের অভাব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাবের বিস্তার। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন মৌলিক ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার।

সনদ নয়, প্রকৃত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে
পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভালো ফলই প্রকৃত শিক্ষার একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও বাস্তব জ্ঞান যাচাই না করে শুধু নম্বর ও সনদের ভিত্তিতে শিক্ষার মান নির্ধারণ করলে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

একইভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণের পাশাপাশি শিক্ষার মান নিশ্চিত করাও জরুরি। উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান বাড়লেই শিক্ষার মান বাড়ে না। যোগ্য শিক্ষক, মানসম্মত পাঠদান, গবেষণার পরিবেশ এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। অনিয়মের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে উচ্চশিক্ষা সনদ অর্জনের বাণিজ্যে পরিণত না হয়।

পাঠ্যক্রম প্রণয়নেও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও তথ্যনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, জাতীয় পরিচয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে। ইতিহাসের উপস্থাপনায় রাজনৈতিক পক্ষপাত নয়, প্রামাণ্য তথ্য ও গবেষণাকে প্রাধান্য দিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয়করণ বন্ধ না হলে শিক্ষার মুক্তি অসম্ভব
বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মুক্তবুদ্ধির কেন্দ্র। কিন্তু উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ও ডিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

আমার পর্যবেক্ষণ হলো, সরকার পরিবর্তন হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দলীয় প্রভাবের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা যাচ্ছে না। যে সরকারের আমলেই হোক, যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া হলে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব নির্বাচনে গবেষণা, শিক্ষাদান, প্রশাসনিক দক্ষতা ও নৈতিকতাকে প্রধান বিবেচ্য করতে হবে।

এ জন্য একটি নিরপেক্ষ সার্চ কমিটির মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই করে সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রস্তুত করা যেতে পারে। দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের সম্পৃক্ত করে স্বচ্ছ মূল্যায়নপ্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। নিয়োগের মানদণ্ড প্রকাশ এবং সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের সুযোগ অনেকাংশে কমবে।

যোগ্য শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন জাতির ক্ষতি
একজন শিক্ষকের পেশাগত অগ্রগতি নির্ভর করা উচিত তাঁর যোগ্যতা, গবেষণা, প্রকাশনা ও শিক্ষাদানের মানের ওপর। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে পদোন্নতি ও নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলে তা শুধু ব্যক্তির প্রতি অবিচার নয়, বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর।

আমার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেও পদোন্নতি ও পেশাগত অগ্রগতির ক্ষেত্রে আমি প্রত্যাশিত মূল্যায়ন পাইনি বলে মনে করি। যুক্তরাজ্যের SOAS-এ পড়াশোনা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা, যুক্তরাজ্য ও ইরানে শিক্ষাদান, সাতটি ভাষায় দক্ষতা এবং দেড় শতাধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও আমার পেশাগত জীবনে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। একপর্যায়ে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে দেশের বাইরে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিই।

দেশে ফিরে পেশাগতভাবে কাজ করার আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ ও চাকরির মেয়াদসংক্রান্ত বিষয়ে আবারও হতাশার মুখোমুখি হয়েছি। আমার প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষকের যোগ্যতা ও গবেষণাকর্মের যথাযথ মূল্যায়ন যদি না হয়, তাহলে নতুন প্রজন্মের মেধাবী শিক্ষক ও গবেষকেরা কীভাবে উচ্চশিক্ষায় অবদান রাখতে উৎসাহিত হবেন?

আমার অভিযোগ, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিজ্ঞতা আমাকে হতাশ করেছে। এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং স্বচ্ছ সমাধান থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গবেষণাপত্রে জালিয়াতি কিংবা নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেগুলোরও যথাযথ তদন্ত করতে হবে। যোগ্য ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা এবং অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া—দুটিই শিক্ষার মানের জন্য বিপজ্জনক।

স্বায়ত্তশাসনই হতে পারে উত্তরণের পথ
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন মানে জবাবদিহিহীনতা নয়; বরং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থেকে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের অধীনে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নিয়োগ ও একাডেমিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে কার্যকর স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

আমার প্রস্তাব হলো, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ও ডিন নিয়োগে স্বাধীন সার্চ কমিটির সুপারিশ এবং নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড কার্যকর করতে হবে। শিক্ষক সমিতির স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ছাত্র সংসদগুলোও সক্রিয় করতে হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের বিকাশ, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে জবাবদিহি বাড়ানো সম্ভব।

বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার বিতরণের ক্ষেত্র বানানো যাবে না। বরং দেশের মেধাবী ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষাবিদদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে যোগ্য ব্যক্তিদের সুযোগ দেওয়া গেলে গবেষণা, পাঠদান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয় প্রয়োজন
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে ইসলামের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামের ইতিহাস, সভ্যতা, দর্শন, নৈতিকতা এবং মুসলিম মনীষীদের অবদান যথাযথভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আধুনিক ভাষা ও আন্তর্জাতিক জ্ঞানচর্চার সুযোগও সম্প্রসারিত করতে হবে।

ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক শিক্ষাকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং নৈতিকতা, যুক্তিবোধ, গবেষণার মানসিকতা ও মানবকল্যাণের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। পাঠ্যক্রমে কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায় সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক ধারণা তৈরি না করে প্রামাণ্য তথ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জ্ঞানচর্চাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

শিক্ষা সংস্কারে চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা
বাংলাদেশের শিক্ষাসংকট থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। প্রথমত, পরীক্ষার ফলাফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা এবং সমান সুযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাব কমিয়ে যোগ্যতাভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে। চতুর্থত, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, ছাত্র সংসদ ও শিক্ষক সমিতিকে দলীয় আধিপত্যের বাইরে রেখে কার্যকর করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা প্রশাসনের নিয়োগনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকার বদলে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষা কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের ভিত্তি।

উপসংহার
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সংকট থেকে মুক্ত করতে হলে প্রথমেই যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। যে ব্যবস্থায় মেধাবী শিক্ষক ও গবেষকেরা অবমূল্যায়িত হন, সেখানে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা কঠিন।

আমার বিশ্বাস, নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি, স্বচ্ছ নিয়োগনীতি, কার্যকর জবাবদিহি এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা গেলে উচ্চশিক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। একই সঙ্গে জাতীয় ইতিহাস, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের নৈতিক, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

শিক্ষাব্যবস্থাকে দলীয় আনুগত্যের কাছে জিম্মি রেখে মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। যোগ্যতার মর্যাদা, গবেষণার স্বাধীনতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করাই শিক্ষা সংকট থেকে উত্তরণের প্রধান শর্ত।

লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ট্যাগ: মতামত
দেশের ইন্টেরিয়র ডিজাইন শিল্পে পেশাগত দক্ষতা ও মানোন্নয়নের …
  • ২৯ অক্টোবর ২০২৬
যাঁদের হাতে জাতির প্রথম অক্ষর, তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায়ে ম…
  • ২৯ অক্টোবর ২০২৬
বাঁশঝাড় থেকে মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ উদ্ধার
  • ২৯ অক্টোবর ২০২৬
বিয়ের দাবিতে ১০০ ফুট টাওয়ারের মাথায় তরুণী, শেষ পর্যন্ত অনলা…
  • ২৯ অক্টোবর ২০২৬
৫ ঘণ্টা পর অবশেষে রওনা হলো প্রধানমন্ত্রীর বিমান, দেখুন সরাস…
  • ২৯ অক্টোবর ২০২৬
পাবনায় বিএনপি নেতাসহ ২ জনকে গুলি করে হত্যা
  • ২৯ অক্টোবর ২০২৬