মো. ফিরোজ আলম © টিডিসি সম্পাদিত
বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে আবেদন করার বয়সসীমা ৩২ থেকে ৪০ বছর বৃদ্ধি করতে আন্দোলন করছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। সরকারি চাকরির পাশাপাশি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশেষ করে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, বেসরকারি এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোসমূহ বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণ করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে থাকেন। সরকারি নিয়োগ ব্যতীত যৎসামান্য ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উচ্চতর পদের জন্য বয়সসীমা কিছুটা শিথিল করা হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং বয়সসীমা বৃদ্ধির আন্দোলন বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় চলমান ছিলো। কোটা সংস্কার আন্দোলন দমন করতে নির্মম নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে জনরোষ থেকে জীবন বাঁচাতে ফ্যাসিস্ট ভারতে পালায়ন করেছে। পরবর্তীতে অন্তর্বতীকালীন সরকার বয়সসীমা ২ বছর বৃদ্ধি করে ৩০ বছর থেকে ৩২ বছর নির্ধারণ করেছে।
চাকরিতে বয়সসীমা বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ গুলোর মধ্যে রয়েছে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে চাকরিতে প্রবেশের অন্যতম শর্ত ছিলো ছাত্রলীগের পদধারী নেতা, আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান, এমপি কিংবা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সুপারিশ। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রীর পদমর্যাদায়) এবং সরকারের অন্যতম নীতিনির্ধারণী থিংক ট্যাংক হিসেবে পরিচিত এইচ টি ইমাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি (TSC) মিলনায়তনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের চাকরিতে পদায়নের বিষয়ে একটি বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি ছাত্রলীগকে বিসিএস বা সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন যে, তারা যেন লিখিত পরীক্ষায় ভালোভাবে পাস করে উত্তীর্ণ হন, আর ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষার বিষয়টি তিনি দেখে দেবেন বা সেটির ব্যবস্থা তিনি করবেন। (১২ নভেম্বর, ২০১৪ - ঢাকা ট্রিবিউন)। ছাত্রলীগের এই অলিখিত শর্ত পূরণ করতে না পারায় অনেক যোগ্য প্রার্থী প্রিলিমিনারি কিংবা লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও মৌখিক পরীক্ষায় বাদ পড়ে চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
করোনা মহামারির সময়ে ২-৩ বছর দেশে কার্যত প্রায় সকল নিয়োগ ব্যবস্থাই স্থবির ছিলো। ফ্যাসিবাদী আমলে চাকরির প্রশ্ন ফাঁস, ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির জন্য অনেক মেধাবী চাকরিপ্রত্যাশীরা বঞ্চিত হয়েছেন। আবেদনের বয়সসীমা বৃদ্ধি করলে বঞ্চিত মেধাবীদের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এছাড়াও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা ১৬-১৭ বছর বয়সে মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হলেও মাস্টার্স বা সমমান ডিগ্রি অর্জন করতে সাধারণত ২৪-২৬ বছর বয়স হয়ে যায়। কখনো কখনো সেশনজট কিংবা অন্যান্য কারণে আরও বেশি সময় দরকার হয়। তাছাড়া চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং অধিকাংশ একাডেমিক লেখাপড়ার মধ্যে যোজন যোজন পার্থক্য দেখা যায়। ৩২ বছরের বয়সসীমার মধ্যে মাত্র ৬-৭ বছর সময় পাওয়ার কারণে প্রার্থীরা পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও প্রতিযোগিতা করার সুযোগ সীমিত সময়ের জন্য পায়। বয়সসীমা অতিক্রম করায় পরবর্তীতে চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ না থাকায় বেকারত্বের হার আরও বেড়ে যায়।
চাকরির বয়সসীমা বৃদ্ধি করলে বেকারত্ব আরও বাড়তে পারে এই ধারণা দূর করতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের বয়সসীমা বিবেচনা করে তাদের পলিসি পর্যালোচনা করা যায়। ভারতের স্টেট পিএসসি পরীক্ষার ক্ষেত্রে পশ্চিম বঙ্গে বয়সসীমা শ্রেণি ভেদে ৪৫ বছর, বিহারে (বিপিএসসি) বয়সসীমা ২০-৩৭ বছর। উত্তর প্রদেশের (ইউপিপিএসসি)- ২১-৪০, মধ্য প্রদেশে (এমপিপিএসসি) - ২১-৪০, রাজস্থানে (আরপিপিএসসিতে) ২১-৪০ বছর। শ্রীলঙ্কার পাবলিক সার্ভিসসহ অধিকাংশ কম্বাইন্ড সার্ভিসের চাকরিতে আবেদনের জন্য ১৮-৪৫ বছর পর্যন্ত বয়সসীমা আছে।
নেপালের সরকারি চাকরি বা লোকসেবা (Loksewa) নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণত বেসামরিক চাকরিতে প্রবেশের বয়স ১৮-৩৫ বছর থাকলেও নারী ও সংরক্ষিত শ্রেণির প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়স ৪০ বছর পর্যন্ত নির্ধারিত হয়। ভুটানের রয়্যাল সিভিল সার্ভিস কমিশন (RCSC)-এ প্রেশার বা প্রাক-সেবা (Pre-service) প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর। ইন-সেবা বা ইতিমধ্যে কর্মরত আবেদনকারীদের জন্য ৪৫ বছর নির্ধারিত রয়েছে।
উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই চাকরিতে বয়সসীমা নেই। সিঙ্গাপুরের পাবলিক সার্ভিসে আবেদনের জন্য বয়সসীমা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিতে (USAJOBS) প্রবেশের জন্য বয়সসীমা উন্মুক্ত হলেও বিশেষ কিছু পেশা যেমন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (Law Enforcement), ফায়ার ফাইটার বা সামরিক বাহিনীতে কাজের ক্ষেত্রে শারীরিক সক্ষমতা ও বাধ্যতামূলক অবসরের জন্য প্রবেশের বয়সসীমা সাধারণত ৩৭ বছর। যুক্তরাজ্যে সিভিল সার্ভিস বা সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা উন্মুক্ত। একইসাথে বয়স বৈষম্যবিরোধী আইন (Equality Act 2010) অনুযায়ী সেখানে বয়সের ভিত্তিতে চাকরির আবেদন থেকে কাউকে বঞ্চিত করা বেআইনি।
বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি'র নির্বাচনী ইশতেহার ও রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার ২২নং দফায় উল্লেখ করা হয়েছে -"যুবসমাজের ভিশন, চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আধুনিক ও যুগোপযোগী যুব-উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এক বছরব্যাপী অথবা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত, যেটাই আগে হবে, শিক্ষিত বেকারদের বেকার ভাতা প্রদান করা হইবে। বেকারত্ব দূরীকরণের লক্ষ্যে নানামুখী বাস্তবসম্মত কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। যুব সমাজের দক্ষতা বৃদ্ধি করে 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' আদায়ের লক্ষ্যে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুষ্টির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়া মানবসম্পন্ন উন্নয়নে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করা হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধি বিবেচনা করা হবে।”
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণ বেকারের তুলনায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। রিপোর্ট অনুযায়ী -“বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ, চাকরির বাজারে প্রবেশ করা প্রতি ১০০ জন তরুণের মধ্যে প্রায় ৩৬ জনই বেকার থাকছেন- (২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬- যুগান্তর)।”
বয়সসীমা বাড়লে সরকারি কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের প্রমাণ করার সুযোগ পেতে পারে, যা উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।চাকুরীতে যোগদানের সময় বৃদ্ধি পেলে অধিকাংশ প্রার্থীই শুধুমাত্র চাকরির প্রস্তুতির জন্য নিজেকে নিয়োজিত না রেখে পড়ালেখা এবং প্রস্তুতির সঙ্গে পার্টটাইম চাকরি কিংবা তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে নিজে উপার্জনের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
লেখক: ফেলো, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও এম.ফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]