ড. মো: শিবলুর রাহমান © টিডিসি সম্পাদিত
রাত গভীর। ঘুমানোর আগে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য ফোন হাতে নেওয়া। উদ্দেশ্য ছিল একটি খবর দেখা। কিন্তু একটি খবরের পর আরেকটি, তারপর আরও একটি ভিডিও। যুদ্ধ, দুর্ঘটনা, রাজনৈতিক সংঘাত, বন্যা, অগ্নিকাণ্ড কিংবা মানুষের দুর্ভোগের ছবি ও ভিডিও চোখের সামনে আসতেই থাকে। সময় গড়ায়, রাত বাড়ে, কিন্তু স্ক্রল থামে না।
এ দৃশ্য আমাদের অনেকের কাছেই পরিচিত। আধুনিক ডিজিটাল জীবনের এই অভ্যাসের নাম ডুমস্ক্রোলিং (Doomscrolling)। অর্থাৎ অনলাইনে একের পর এক নেতিবাচক, উদ্বেগজনক বা ভয়াবহ খবর দেখতে থাকা, এমনকি যখন আমরা বুঝতে পারি যে এগুলো আমাদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলছে।
ডুমস্ক্রোলিং শুধু একটি প্রযুক্তিগত অভ্যাস নয়; এটি আমাদের মানসিক অবস্থারও একটি প্রতিফলন। মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই বিপদ বা নেতিবাচক তথ্যের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। বিবর্তনের ইতিহাসে এই প্রবণতা বেঁচে থাকার জন্য জরুরি ছিল। কিন্তু ডিজিটাল যুগে সেই একই প্রবণতা অনেক সময় আমাদের অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও জানে আমরা কোন ধরনের কনটেন্টে বেশি সময় দিচ্ছি। ফলে আমরা যত বেশি নেতিবাচক তথ্য দেখি, ততই একই ধরনের আরও তথ্য আমাদের সামনে আসতে থাকে। উদ্বেগ থেকে তথ্য খোঁজা শুরু হলেও তা অনেক সময় উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
সাম্প্রতিক গবেষণায় ডুমস্ক্রোলিংয়ের সঙ্গে উদ্বেগ, মানসিক অস্বস্তি, নেতিবাচক চিন্তা এবং ঘুমের সমস্যার সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও এটি সরাসরি মানসিক রোগ সৃষ্টি করে বলে এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, তবুও গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে নেতিবাচক খবরের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ মানুষের মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় ৪০০ জন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর ওপর গবেষণায় ডুমস্ক্রোলিংয়ের সঙ্গে mental well-being-এর সম্পর্ক পাওয়া যায়; mindfulness ও secondary traumatic stress-ও এ সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আরেকটি cross-cultural গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডুমস্ক্রোলিংয়ের সঙ্গে existential anxiety-এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অন্যের দুর্ভোগ, মৃত্যু কিংবা সংকটের খবর বারবার দেখার ফলে অনেকেই পরোক্ষ মানসিক আঘাতের অভিজ্ঞতা লাভ করেন।
ডুমস্ক্রোলিংয়ের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ক্ষতি দেখা যায় ঘুমের ক্ষেত্রে (ঘুমের সময় চুরি হয়ে যাওয়া)। আমরা অনেকেই শোবার আগে কিছুক্ষণ ফোন ব্যবহার করি। কিন্তু সেই “কিছুক্ষণ” কখনো আধা ঘণ্টা, কখনো এক ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি হয়ে যায়। ফলাফল হলো ঘুমের সময় কমে যাওয়া, ঘুমের মানের অবনতি এবং পরদিন ক্লান্তি, বিরক্তি ও মনোযোগের ঘাটতি। ঘুমের সঙ্গে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিযোগিতা শুরু হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা।
ডুমস্ক্রোলিংয়ের সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর দিক হলো, আমরা অনেক সময় এটিকে “তথ্য সংগ্রহ” বলে মনে করি। বাস্তবে তথ্য গ্রহণ এবং ডুমস্ক্রোলিং এক বিষয় নয়। তথ্য মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে; ডুমস্ক্রোলিং অনেক সময় শুধু উদ্বেগ বাড়ায়। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই নিজেকেই করতে হবে: আমি কি সত্যিই তথ্য সংগ্রহ করছি, নাকি শুধু নিজের উদ্বেগকে আরও খাওয়াচ্ছি?
তাহলে মুক্তির পথ কী?
প্রথমে অনুসরণ করা যেতে পারে ‘Stop–Check–Choose’ পদ্ধতি। ফোন খোলার আগে ভাবুন, কেন খুলছি; কী জানতে চাই; এবং জানার পর কী করব। নির্দিষ্ট সময়ে খবর দেখুন, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন এবং শোবার ঘরকে ‘No-scroll zone’ বানান। সম্ভব হলে বিছানা থেকে ফোন দূরে রাখুন।
এ সমস্যা থেকে মুক্তির পথ প্রযুক্তিকে ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং প্রযুক্তির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। খবর জানার জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রতিটি নোটিফিকেশনের পেছনে ছুটে না গিয়ে দিনে এক বা দুইবার নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে খবর জানাও যথেষ্ট হতে পারে। শোবার ঘরকে ফোনমুক্ত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা, অপ্রয়োজনীয় নেতিবাচক কনটেন্ট এড়িয়ে চলা এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বেছে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ একটি ঘটনার পঞ্চাশটি পোস্ট দেখা মানেই পঞ্চাশ গুণ বেশি তথ্য জানা নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো জীবনে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা। শুধু খারাপ খবরের স্রোতে ডুবে না থেকে বিজ্ঞান, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, প্রকৃতি, গবেষণা এবং মানুষের ইতিবাচক উদ্যোগের গল্পও জানা দরকার। পৃথিবীতে যেমন সংকট আছে, তেমনই আশা, উদ্ভাবন এবং সমাধানের গল্পও আছে। বাস্তবতাকে সম্পূর্ণভাবে দেখতে হলে এই দুই দিকই জানা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে স্ক্রিনের বিকল্পও তৈরি করতে হবে। হাঁটা, বই পড়া, ব্যায়াম, ধর্মীয় চর্চা, পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া শুধু ডুমস্ক্রোলিং কমায় না, মানসিক সুস্থতাও বাড়ায়। একটি ক্ষতিকর অভ্যাসকে দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তার জায়গায় অর্থবহ আরেকটি অভ্যাস গড়ে তোলা।
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে বিশ্বের খবর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। কিন্তু তথ্যের নাগরিক হওয়া আর তথ্যের বন্দি হয়ে যাওয়ার মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। আমাদের শিখতে হবে কখন খবর জানতে হবে, আর কখন নিজের মনকে বিশ্রাম দিতে হবে।
কারণ পৃথিবীর সব দুঃসংবাদ বহন করা আমাদের দায়িত্ব নয়। আমাদের দায়িত্ব সচেতন থাকা, কিন্তু মানসিক শান্তি হারিয়ে নয়। তাই আজ রাতে ফোন হাতে নেওয়ার আগে হয়তো আমরা সবাই নিজেকে একটি প্রশ্ন করতে পারি; আমার কি সত্যিই আরেকটি খবর জানা দরকার, নাকি আমার মন এখন একটু বিশ্রাম চায়?
হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নোটিফিকেশন টি আমাদের ফোনে আসে না। সেটি আসে আমাদের নিজের শরীর ও মনের কাছ থেকে—‘এবার থামো।’
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং পরিচালক, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তর, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: [email protected]