জাগদল থেকে বিএনপি: বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা

৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫৭ PM
মোঃ রুহুল আমিন

মোঃ রুহুল আমিন © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত গণতন্ত্রের জন্য ধারাবাহিক সংগ্রামের ইতিহাস। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাজনৈতিক দল, সামরিক হস্তক্ষেপ, একদলীয় ব্যবস্থা, বহুদলীয় রাজনীতির প্রত্যাবর্তন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নানা বাঁক পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি আজকের অবস্থানে এসেছে। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে বিএনপির ইতিহাস কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে বহুদলীয় ব্যবস্থা, নির্বাচন, বিরোধী রাজনীতি এবং ক্ষমতার পালাবদলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।

বিএনপির রাজনৈতিক যাত্রা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) এর সময়ে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রথমে জাগদল গঠনের উদ্যোগ এবং পরবর্তী সময়ে সেটিকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রূপ দিয়ে বিএনপি প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করে। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রমনা রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে।

জাগদল ছিল বিএনপি গঠনের পূর্ববর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্যোগ। বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে সমন্বয়ক করে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তিকে সংগঠিত করার যে প্রয়াস শুরু হয়েছিল, সেটিই পরবর্তী সময়ে বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট এবং বিএনপি গঠনের পথ তৈরি করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও পেশার মানুষকে একত্রিত করার চেষ্টা ছিল এই প্রক্রিয়ার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল এর বহুমাত্রিকতা। দলটির প্রথম আহ্বায়ক কমিটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ ও পেশার মানুষ যুক্ত ছিলেন। দলটির সদস্যদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রাজনীতিতে নতুন এবং তরুণ ছিলেন।

এই বৈচিত্র্যকে শুধু দলীয় সংগঠন বিস্তারের কৌশল হিসেবে দেখলে বিষয়টির রাজনৈতিক গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়। বাংলাদেশের মতো একটি বহুধাবিভক্ত সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও রাজনৈতিক মতের মানুষকে একটি প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র কেবল ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা নয়; এটি বিভিন্ন মত, স্বার্থ ও পরিচয়ের মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া। সেই দিক থেকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন বহুমাত্রিক সাংগঠনিক চরিত্র বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন একটি প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।

বিএনপির গণতান্ত্রিক ভূমিকা আলোচনা করতে গেলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় বহুদলীয় রাজনীতির প্রসঙ্গ। বিএনপির ঘোষিত রাজনৈতিক দর্শনে বহুদলীয় ব্যবস্থা, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদীয় সরকার এবং জাতীয় সংসদের ভিত্তি শক্তিশালী করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ এবং গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থাকে রক্ষা করার বিষয়টিও দলীয় লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এখানে বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের হাতে থাকবে না, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। সংসদকে গণতান্ত্রিক জীবনের রক্ষাকবচ হিসেবে দেখার যে ধারণা বিএনপির ঘোষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে রয়েছে, তা দলটির রাজনৈতিক দর্শনে নির্বাচনী গণতন্ত্রের গুরুত্বকে স্পষ্ট করে।

বিএনপির বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারণার মূল্যায়নে প্রধান যে বিষয়টি রয়েছে তা হচ্ছে বহু মতের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি।
বিএনপির রাজনৈতিক বিকাশে নির্বাচন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বড় বিজয় অর্জন করে। এই নির্বাচনে ২৯৮টি আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৭টি আসনে জয়ী হয়েছিল।

এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিকে সামরিক-প্রভাবিত শাসন থেকে নির্বাচনী রাজনীতির দিকে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং জনগণের ভোটের মাধ্যমে সংসদ গঠনের প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক উপাদান।
সুতরাং, বিএনপির প্রতিষ্ঠার সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতা গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তনের সূচনার কথাই বলে। 

বিএনপির গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার সামরিক শাসনের প্রত্যাবর্তন ঘটে। এই সময়ে বিএনপি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

বিএনপি সাত দলীয় জোট গঠন করে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে এবং এরশাদ আমলের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কয়েকটি পর্যায় বর্জন করে। এই আন্দোলনে বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলও ভূমিকা রাখে।

এই সময় বিএনপির গণতান্ত্রিক রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানে দলটি ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাসীন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির অস্তিত্ব তখন কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক ছিল না; বরং রাজপথের আন্দোলন, জোট গঠন এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিও তার কর্মসূচির অংশ হয়ে ওঠে।

১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক শক্তির আন্দোলনের ফলে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। এরপর নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার অধীনে ১৯৯১ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অনেকেই এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। 

১৯৯১ সালের নির্বাচন বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার ইতিহাসেও তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বেশি আসন লাভ করে সরকার গঠন করে। এর পর সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায়।
এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক গভীর। ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে নতুন ভিত্তি দেয়। রাষ্ট্রপতি-কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সংসদীয় সরকার প্রতিষ্ঠা ক্ষমতার কাঠামোয় একটি বড় পরিবর্তন আনে।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার এই পরিবর্তনের মাধ্যমে দেখিয়েছিল যে ক্ষমতায় থাকা কোনো দলের জন্যই রাষ্ট্রব্যবস্থা অপরিবর্তনীয় নয়; রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা সম্ভব। সংসদীয় গণতন্ত্রের এই পুনঃপ্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।

১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর বিএনপি বিরোধী দলে যায়। অর্থাৎ ক্ষমতা থেকে বিরোধী দলে যাওয়ার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কার্যকর ছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বড় বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনে চারদলীয় জোট ২১০টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছিল।

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির জন্য একটি যুগের অবসান এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের সূচনা ঘটে। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার নির্ধারিত মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের পরপরই নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সঙ্গে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক সংকট ক্রমেই গভীর হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং সামরিক সমর্থিত ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে একটি ‘অস্বাভাবিক’ রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

এই সময়টিই বিএনপির রাজনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে। তৎকালীন দলের সিনিয়র নেতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ গ্রেপ্তার করা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে খালেদা জিয়াকেও গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় দলকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

কিন্তু বিএনপি সেই ধাক্কা সামলে সাংগঠনিকভাবে টিকে থাকে। দলের তৎকালীন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও চাপ সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বড় অংশ দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং বিএনপি দীর্ঘমেয়াদি বিরোধী রাজনীতির পর্যায়ে প্রবেশ করে। এরপর শুরু হয় বিএনপির জন্য আরও দীর্ঘ ও কঠিন অধ্যায়।

২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। বিএনপি এই সিদ্ধান্তকে নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতার জন্য 
বড় আঘাত হিসেবে দেখে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এরপর দলটি প্রায় ১৫ বছর ধরে গ্রেপ্তার, মামলা, হয়রানি ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যায়। 

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বিএনপির রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি বড় বাঁক। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবি পূরণ না হওয়ায় বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। 

২০১৪ সালের আওয়ামী লীগের অবৈধ নির্বাচনের পর বিএনপি আরও কঠোর আন্দোলনের পথে যায়। ২০১৫ সালে অবরোধ, হরতালসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে দলটি। 

২০১৮ সালে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়। এটি ছিল ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের পর দলটির নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন। বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল ও পরিবেশ নিয়ে বিএনপি ব্যাপক অভিযোগ তোলে এবং নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তী বছরগুলোতে বিএনপির অভিযোগ আরও জোরালো হয় নির্বাচনী ব্যবস্থা, প্রশাসন, বিরোধী নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক মাঠে সমান সুযোগ না থাকার বিষয়ে।

এ সময় দলটির নেতৃত্বের ওপরও বড় আঘাত আসে। খালেদা জিয়াকে তথাকথিত দুর্নীতি মামলায় কারাগারে আটকে রাখা হয়। বিএনপির জন্য এটি ছিল রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত কঠিন সময়। দলের চেয়ারপারসন কারাগারে এবং তারেক রহমান দেশের বাইরে থাকায় নেতৃত্বের একটি বড় অংশ দূর থেকে পরিচালিত হতে থাকে।

২০১৮ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি বুঝতে পারে যে শুধু নির্বাচনের অপেক্ষায় থাকলে রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। ফলে দলটি ধীরে ধীরে সংগঠন পুনর্গঠন এবং রাজপথের আন্দোলনকে নতুনভাবে সাজাতে শুরু করে।

সভা, সমাবেশ, বিভাগীয় গণসমাবেশ, পদযাত্রা, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক জোট গঠনের মধ্য দিয়ে বিএনপি আবার মাঠে সক্রিয় হয়। দীর্ঘ সময়ের এই আন্দোলনে বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার হন।

২০২৩-২৪ সালে বিএনপির আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। দলটি জাতীয় নির্বাচনের আগে নির্দলীয় সরকারের দাবি সামনে রেখে ব্যাপক কর্মসূচি পালন করে। কিন্তু ২০২৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে।

এরপর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ২০২৪ এর জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যান এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। 

বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দল দীর্ঘ সময় ধরে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছে এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান সেই সংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক পরিণতি। 
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপির সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। দীর্ঘদিনের আন্দোলনরত দলকে এবার ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হয়।

দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সংগ্রামের সবচেয়ে বড় পরিণতি আসে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে। নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনে বিএনপি ২১২ আসনে জয় পায় এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটির সরকার গঠন করে। এটি বিএনপির ইতিহাসে এক অসাধারণ রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন।

২০০৬ সালে যে দলটি ক্ষমতা ছেড়েছিল, ২০০৭ সালে যার শীর্ষ নেতৃত্ব গ্রেপ্তার হয়েছিল, ২০১৪ সালে যে দল নির্বাচন বর্জন করেছিল, ২০১৮ সালে যে দল নির্বাচনে অংশ নিয়ে ফল প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং ২০২৪ সালে যে দল নির্বাচনের বাইরে থেকে আন্দোলনে ছিল; দুই দশক পর সেই দলই আবার জনগণের ভোটে সরকার গঠন করেছে। এখানেই বিএনপির গত দুই দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।

সামগ্রিকভাবে বলা যায় ২০০৬ সালের ক্ষমতা হস্তান্তর থেকে ২০২৬ সালের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত বিএনপির রাজনৈতিক পথচলা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বিএনপির এই উত্থান-পতনের ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিষয় প্রতিষ্ঠা করে তা হচ্ছে, বিএনপি শুধু একটি আন্দোলনভিত্তিক দল নয়; এটি দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচনে অংশ নেওয়া, সরকার গঠন করা এবং বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্রে বিএনপির আরেকটি উল্লেখযোগ্য অবদান হলো জোট রাজনীতির বিকাশ। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সাত দলীয় জোট, পরবর্তী সময়ে চারদলীয় জোট এবং আরও পরে ১৮ দলীয় ও ২০ দলীয় জোটের ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় জোটভিত্তিক রাজনীতিকে শক্তিশালী করেছে।

বিএনপির ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলোতে গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার, সংসদীয় সরকারব্যবস্থা এবং নির্বাচিত সংসদের ভিত্তি শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। এমনকি দলটির ঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যে রাজনৈতিক গোপন সংগঠন ও সশস্ত্র ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির বিরোধিতার কথাও রয়েছে।

সবশেষে বলা যায় ‘জাগদল থেকে বিএনপি’ কেবল একটি দলের জন্মকথা নয়; এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের উত্থান-পতন, সংগ্রাম ও পুনর্গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। 

বিএনপির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই তা হচ্ছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একবারের কোনো রাজনৈতিক অর্জন নয়; এটি প্রতিদিনের চর্চা, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হয়। আর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অতীতের সাফল্য ও ব্যর্থতা থেকে কতটা শিক্ষা নিয়ে জনগণের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতে পারে, তার ওপর।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, গংগাচড়া উন্নয়ন ফোরাম, রংপুর

১১ বছর পর চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় নতুন পে-স্কেল, বাস্তবা…
  • ৩১ আগস্ট ২০২৬
ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে সংঘর্ষ, আহত ৫
  • ৩১ আগস্ট ২০২৬
দেশের বাজারে লঞ্চ হলো ভিভো ভি৮০ লাইট ৫জি
  • ৩১ আগস্ট ২০২৬
যশোরের ‘সবজি চারা গ্রামে’ বৃষ্টির ক্ষত, ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্ট…
  • ৩১ আগস্ট ২০২৬
দুই হাত নেই, মুখে কলম ধরে দাখিল পাস রিয়াদের
  • ৩১ আগস্ট ২০২৬
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আলোকচিত্রীর বিরুদ্ধে ভয়ভীতি সৃষ্টি…
  • ৩১ আগস্ট ২০২৬