পে-স্কেল © প্রতীকী ছবি
স্বাধীনতা পরবর্তী ৫৫ বছরে এখন পর্যন্ত দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য মোট ৮ বার পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে, সবশেষটি হয়েছিল ১১ বছর আগে ২০১৫ সালে। এরপর থেকে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট হারে (বর্তমানে পাঁচ শতাংশ) বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বা বেতন বৃদ্ধি হলেও, নতুন করে আর আনুষ্ঠানিক বেতন কাঠামোর ঘোষণা আসেনি। নিয়মিত বেতন বাড়লেও মূলত মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বেতন বৈষম্য দূর করার জন্য নতুন পে-স্কেলের প্রয়োজন হয়।
এদিকে, দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময়ের পর সরকারি সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রত্যাশিত নবম জাতীয় পে স্কেলের সুপারিশমালা চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আজ সোমবার ( ৩১ আগস্ট) মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন এই বেতন কাঠামো দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বাজেটের ওপর চাপ কমাতে দুই অর্থবছরে মোট চার ধাপে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ সামলানোর মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য বজায় রাখতেই মূলত ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের এই কৌশল গ্রহণ করছে সরকার।
অর্থ বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, সরকারের বর্তমান লক্ষ্য হচ্ছে আসন্ন সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে নবম পে-স্কেলের আনুষ্ঠানিক গেজেট বা প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী অক্টোবর মাস থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পেতে শুরু করবেন। গেজেট প্রকাশে কিছুটা সময় লাগলেও নতুন বেতন কাঠামোটি চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে।
এর ফলে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসের বেতন পুনর্নির্ধারণ করে বকেয়া অর্থ পরবর্তী সময়ে সমন্বয়ের সুযোগ রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ গেজেট প্রকাশে দেরি হলেও বেতন বৃদ্ধির কার্যকর তারিখ কোনোভাবেই পিছিয়ে যাচ্ছে না।
মন্ত্রিসভার পর আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং পে-স্কেলের মূল বিষয়গুলো এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে এটি অনুমোদিত হওয়ার পর প্রস্তাবটি প্রয়োজনীয় যাচাই ও পর্যালোচনার (ভেটিং) জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই প্রজ্ঞাপন জারির চূড়ান্ত পথ উন্মুক্ত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুকেও এই সংক্রান্ত তথ্যের প্রতিফলন ঘটেছে।
অর্থ বিভাগের একাধিক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে বিষয়টি চূড়ান্ত করে আজ মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। কমিশনের সুপারিশ বনাম সচিব কমিটির প্রতিবেদন নবম জাতীয় বেতন কমিশন বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছিল।
কমিশনের এই প্রস্তাবে বিভিন্ন পর্যায়ে বেতন ও ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশের বেশি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল, যা বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন ছিল। পরবর্তীতে গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে গঠিত ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি এই সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে।
দেশের সার্বিক আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং বাস্তবায়নের কৌশল বিবেচনা করে সচিব কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
অর্থাৎ, কমিশনের মূল সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বৃদ্ধির হার কিছুটা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা হচ্ছে। একইসঙ্গে ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন পে স্কেলের মূল বেতন ও ভাতাগুলো চার ধাপে বাস্তবায়িত হবে: প্রথম ধাপ: চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের ৩০ শতাংশ কার্যকর করা হবে; দ্বিতীয় ধাপ: আগামী বছরের জানুয়ারি (বছরের শুরু) থেকে আরও ৩৫ শতাংশ কার্যকর করা হবে; তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপ: মূল বেতনের অবশিষ্ট অংশ পরবর্তী অর্থবছরের জুলাইয়ে এবং এরপর ওই একই অর্থবছরের জানুয়ারিতে ভাতাগুলো বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কৌশল বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার একদিকে যেমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করতে যাচ্ছে, অন্যদিকে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দিচ্ছে না।
জানা যায়, অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যবিশিষ্ট নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। কমিশন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি।
কমিশন প্রধান ছিলেন সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান। বিদ্যমান গ্রেড ২০টি বহাল রেখে কমিশন বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করে জাকির আহমেদ খান কমিশন। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়। আর সর্বোচ্চ বেতনকাঠামো নির্ধারিত ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সুপারিশ করা হয় নির্ধারিত ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
এদিকে ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে বলে গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা একই বেতনকাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে। তাই ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় খুব বেশি নয়।