অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ © টিডিসি ফটো
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে দীর্ঘস্থায়ী রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীল বাজার, বিশ্বব্যাপী লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং ডলার সংকটের কারণে বিশ্বের বাঘা বাঘা অর্থনীতি যখন হিমশিম খাচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, কাঁচামালের আকাশচুম্বী মূল্য এবং ব্যাংকের উচ্চ সুদের হারের চাপে দেশের বহু কলকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আজ অস্তিত্ব সংকটে; ধুঁকছে দেশের উৎপাদন খাত।
ঠিক এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর ও নাজুক পরিস্থিতিতে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত তরুণ বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সাম্প্রতিক গৃহীত উদ্যোক্তাবান্ধব বাণিজ্যনীতি ও সংস্কারমুখী উদ্যোগগুলো নতুন করে আশা জাগাচ্ছে। সুদীর্ঘ ৪০ বছর যাবৎ আমি বাণিজ্যের একজন ছাত্র। ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ততার জায়গা থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক নীতিনির্ধারণী কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এখন এমন নেতৃত্ব রয়েছেন, যিনি নিজে শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে সবাইকে নিয়ে কাজ করার স্পৃহা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মেলবন্ধন স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে। অর্থনীতির জন্য ব্যবসায়ীদের অবদান কেবল তাত্ত্বিক নীতি বা অঙ্কে বেঁধে ফেললে চলবে না, তাঁদের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে—এই বোধের জায়গা থেকেই সাম্প্রতিক অংশগ্রহণমূলক ও সংস্কারমুখী উদ্যোগগুলো গৃহীত হচ্ছে, যা ব্যবসায়ী সমাজ ও উদ্যোক্তাদের কাছে অত্যন্ত প্রত্যাশিত।
প্রখ্যাত ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ওয়ারেন বেনিস বলেছিলেন, "নেতৃত্ব হলো রূপকল্পকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা।" বাণিজ্যমন্ত্রীর প্রাত্যহিক কার্যক্রমে এই দর্শনেরই প্রতিফলন দৃশ্যমান। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (DCCI) এবং বিটিটিএমইএ-র মতো শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার সুবাদে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়িক সংকটগুলো তাঁর নখদর্পণে রয়েছে। প্রতিকূলতার মাঝেও যেসব উদ্যোক্তা নিজেদের মেধা ও পুঁজি বিনিয়োগ করে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন, তাঁরাই অর্থনীতির 'আসল নায়ক'; বাণিজ্যমন্ত্রীর এই গভীর অনুধাবন অত্যন্ত ইতিবাচক। এই উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দিতে এবং ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে সনাতন ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার বাইরে গিয়ে তিনি একটি প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন। বাজারে অসাধু সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য রুখতে ৩০টি নিত্যপণ্যের ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা এআই-ভিত্তিক বাজার নজরদারি চালুর যে সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন, তা আধুনিক ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত।
দেশের সামগ্রিক ব্যবসা সহজীকরণে (Ease of Doing Business) বাণিজ্যমন্ত্রী যেসব কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, তা নিঃসন্দেহে বৈপ্লবিক। বাংলাদেশে একটি ব্যবসা শুরুর প্রশাসনিক সময়কাল ৩৫৫ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা তিনি নির্ধারণ করেছেন। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের চিত্র আমূল পাল্টে যাবে। একই সঙ্গে দেশের বার্ষিক রপ্তানি আয়কে বর্তমানের ৫০-৫৫ বিলিয়ন ডলার থেকে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার যে রূপকল্প তিনি গ্রহণ করেছেন, তা বাস্তবায়নে রপ্তানি বহুমুখীকরণের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যমান শিল্পকারখানাগুলোর চাকা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাকে বাণিজ্যমন্ত্রী সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কৃষিপণ্য ও সবজির অপচয় রোধ করে সাপ্লাই চেইন নির্বিঘ্ন রাখতে দেশজুড়ে প্রায় ২,০০০টি আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন; এটা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নবজাগরণ তৈরি করবে।
তৈরি পোশাক, চামড়া, পাট ও আইটি খাতের মতো বিপুল কর্মসংস্থানমুখী শিল্পগুলোকে বৈশ্বিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে বাণিজ্যমন্ত্রী নতুন নতুন আন্তর্জাতিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) ও বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করছেন। ফলে দেশের ভেতরে লাখো নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে আশা জাগাচ্ছে। রাষ্ট্রের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এমন মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতৃত্ব থাকায়, উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা ও চাওয়া-পাওয়াগুলো এখন সরাসরি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রতফলিত হচ্ছে। বৈশ্বিক এই মহাসংকটের কালে বাণিজ্যমন্ত্রীর এই গতিশীল নেতৃত্ব ও বাস্তবমুখী নীতিগুলো দেশের ব্যবসা খাতকে একটি স্বনির্ভর, স্থিতিশীল এবং দুর্নীতিমুক্ত ভিত্তি প্রদান করবে—এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও উদ্যোক্তা; পরিচালক, ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (IBA), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়