পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার ভুল প্রশ্ন © সংগৃহীত
ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার (১৩ জুলাই) সারাদেশে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝে পরীক্ষা দিতে এসে পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্রে বড় দুটি ভুল পেয়ে চরম বিভ্রান্তি ও মানসিক চাপের মুখে পড়েছে পরীক্ষার্থীরা। ঘটনাটিকে ‘অপদার্থতার ভালো নজীর’- বলেও মন্তব্য করেছেন রাবির সবেক উপাচার্য।
পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিশ্লেষণ ও পদার্থবিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের ২ নম্বর সেটের (যমুনা) ৬ নম্বর উদ্দীপকের প্রশ্ন গ-তে গড় মুক্ত পথ নির্ণয় করতে বলা হয়েছে। কিন্তু আলোচ্য উদ্দীপকে গড় মুক্ত পথ বের করার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এখানে অনুর কার্যকর ব্যাস উল্লেখ করা নেই।
একই প্রশ্নপত্রের ৭ নম্বর উদ্দীপকে দুটি ভেক্টরের একটার কোন লব্ধির সাথে ২৫° দেওয়া আছে। কিন্তু উদ্দীপকের দুটো ভেক্টরের মধ্যবর্তী কোণ হিসাব করলে ৬.৪১° হয়; যা যুক্তিসঙ্গত নয়। দুটি ভেক্টরের মধ্যবর্তী কোণ অবশ্যই ২৫° এর চেয়ে বড় হতে হবে— এমনভাবে ভেক্টর দুটোর তথ্য দেওয়া উচিত ছিল— এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে চলতি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী লিজন মাহমুদ বলেন, এই প্রশ্ন দুটো উত্তর করার সময় সঠিক তথ্যগুলো বুঝতে পারছিলাম না। সেজন্য অনেকটা সময় চিন্তা-ভাবনা করেও উত্তর করতে পারিনি। এতে আমার সময় নষ্ট হয়েছে। মনে একটা সন্দেহ ছিল ‘বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্ন ভুল হতে পারে না’। তাই প্রশ্নগুলোর পেছনে সময় নষ্ট হয়েছিল।
এম এ মামুন খান নামে বিজ্ঞানের এক ছাত্র বলছেন, ‘সান্সের পড়াশোনা ছেলে-খেলা নয়। অণুর ব্যাস বা ব্যাসার্ধ দেওয়া নেই। গড় মুক্ত পথ বের করতে হবে। দুটো ভেক্টরকে ভেক্টর ফরমেটে দিয়ে আবার OA বরাবর গতিশীল করতে কোণের মান কত চাইছে। বাহ কি চমৎকার!’
আরও পড়ুন: এইচএসসি পরীক্ষা: প্রধানমন্ত্রীর ফোন, কেন্দ্র বদল ও অতিরিক্ত ৩০ মিনিট
প্রশ্নপত্রে ভুলের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সাবেক উপাচার্য ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব। পোস্টে তিনি জানান, ইনবক্সে অনেকগুলো অনুরোধের প্রেক্ষিতে লেখা। এসএসসি এবং এইচএসসি এই দেশের সবচেয়ে বড় দুটো পাবলিক পরীক্ষা। এই দুই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কারা প্রনয়ণ করবেন? অবশ্যই শিক্ষক হিসেবে যারা সেরা, তারা। প্রশ্নপত্র কারা মডারেট করবেন? অবশ্যই যারা বিষয়জ্ঞানে সেরা, তারা। পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্ন দেখলাম। অপদার্থতার ভালো নজীর।
বিজ্ঞান শিখতে এবং শেখাতে হলে কতগুলো জিনিস মাথায় রাখতে হয়। এক- ছবি এবং ছবিতে দেওয়া গাণিতিক তথ্য সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। দুই- শুধু ম্যাথম্যাটিকাল কন্সিসটেন্সি থাকাটা যথেষ্ট নয়। ঠিকঠাক অংক করে যদি একটা অদ্ভুত ফলাফল আসে, তাহলে অংকটার সেট আপ ঠিক হয় নি। একটা উদাহরণ দিই, ধরা যাক অংকের ফলাফল হচ্ছে একজন মানুষের ভর। ঠিকঠাক অংক করে ফল পাওয়া গেল ১০০০০ কিলোগ্রাম। এটা কোন প্রশ্নই হয় নি। তিন- অংক করতে যা না জানলেই নয়, তা সরবরাহ করেতে হবে। না করা হলে, প্রশ্নের বৈধতা থাকে না। চার- যদি এডুকেটেড গেস করার প্রশ্ন থাকে, তাহলে সেটা রিজনেবল হওয়ার সুযোগে থাকতে হবে। অনুর ব্যাস যেখানে angstrom (অ্যাংস্ট্রম) অর্ডারে, সেখানে অংক মেলাতে গিয়ে যদি সেটা সেন্টিমিটারে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে সেটা কোন অংকই হয় নি।
আরও পড়ুন: ‘স্থগিত’ ইস্যুতে পর্যালোচনায় এইচএসসি পরীক্ষা, সংগ্রহ হচ্ছে কেন্দ্রের তথ্য
উপরের প্রতিটি সমস্যা এই বছরের পদার্থবিজ্ঞান প্রশ্নে আছে। কেন এমন হল? আমার এডুকেটেড গেস হচ্ছে - প্রশ্নকারী এবং মডারেটর বাছাই করা হয়েছে, কে কাকে চেনে সেই ভিত্তিতে অথবা রাজনৈতিক বিবেচনায়। যোগ্যতার ধার ধারা হয় নি। আমরা যদি মেরিট্রকেসিকে মূল্য না দেওয়া শিখি, তাহলে শুধু পরীক্ষার প্রশ্নই নয়, জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এমন সার্কাস দেখতে হবে।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জেসমিন তাসলিমা বানূর সঙ্গে মুঠোফোনে অন্তত ৫ বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ‘মিটিংয়ে আছেন’ বলে তার অফিস থেকে জানানো হলে পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হয়; সিন করলেও এতে তার রেসপন্স পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ চেষ্টা করেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।