সারাদেশের জলাবদ্ধতার মধ্যেই এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন পরীক্ষার্থীরা © টিডিসি সম্পাদিত
বন্যা, জলাবদ্ধতা আর প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে দুর্গত এলাকার শিক্ষার্থীদের। কোথাও কোমর পানি পেরিয়ে, কোথাও ভিজে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে হচ্ছে তাদের। দুর্যোগের কারণে স্বাভাবিক পড়াশোনা ও প্রস্তুতি ব্যাহত হলেও নির্ধারিত সময়েই পরীক্ষায় বসছেন তারা। এতে একদিকে যেমন তৈরি হচ্ছে মানসিক চাপ, অন্যদিকে ফলাফল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
সারাদেশে অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা হলেও স্থগিত হওয়া পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ভিন্নভাবেই নিতে হবে বোর্ডগুলোকে। এতে শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও প্রভাব পড়তে পারে এবং বৈষম্যেরও শিকার হবেন বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি শিক্ষাবোর্ডে পরীক্ষা স্থগিত থাকলেও অন্য বোর্ডে পরীক্ষা চলমান থাকায় পরীক্ষার সমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। যারা এখন পরীক্ষা দিচ্ছে তারা দুর্যোগের কারণে হয়তো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারেনি, আবার যাদের পরীক্ষা পরে হবে তারা অতিরিক্ত সময় পাবে। যদিও পরে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নের মান সমমানের রাখার চেষ্টা করা হয়, তবুও পার্থক্য তো থেকেই যায়। কারণ একই মানসিক ও বাস্তব পরিস্থিতিতে সব শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে না। তাই মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বা বৈষম্যের আশঙ্কা থেকেই যায়।
এইচএসসি পরীক্ষার্থী এমনকি শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরাও বিষয়টিকে তিন স্তরের বৈষম্য হিসেবে দেখছেন। তাদের ভাষ্য, প্রথমত—বন্যা, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে বিঘ্নতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে কম প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন দুর্যোগ প্রবণ অঞ্চলের পরীক্ষার্থীরা। দ্বিতীয়ত—স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলো পরবর্তী সময়ে নির্ধারণ করায় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও সময় কমে যাচ্ছে। তৃতীয়ত—আইনগত কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী ভর্তি নিলেও যোগ্যতার অভাবে বা কম নম্বর থাকায় যোগ্য শিক্ষার্থী হারানোর শঙ্কা রয়েছে।
বন্যা, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া ন্যায়সংগত মূল্যায়নের নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কেন্দ্রে পৌঁছানো, শারীরিক-মানসিক কষ্টসহ কম প্রস্তুতির ফলে প্রভাব পড়বে পরীক্ষা ফলাফলেও। স্থগিত পরীক্ষা পরে নেওয়া, কম প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দেওয়ায় গ্রুপ বিষয়ে নম্বর কম পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে ভর্তি পরীক্ষা অংশ নিতে পারবেন না অনেক শিক্ষার্থী। এমন পরিস্থিতিতে আইনগত কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী ভর্তি নিলেও যোগ্যতার অভাবে বা কম নম্বর থাকায় যোগ্য শিক্ষার্থী কমে যাবে। এতে শুধু উচ্চশিক্ষাসহ গবেষণায় মারাত্মক প্রভাব পড়বে। সবমিলিয়ে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তারা বলছেন, সব অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হতে পারবে না। এটা একটা চরম বৈষম্য। তাই দুর্যোগ পরিস্থিতিতে সার্বজনিন চিন্তা করেই পরীক্ষা স্থগিত রাখা দরকার ছিল। যেহেতু অভিন্ন প্রশ্নে সারাদেশে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে সারাদেশের ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্তটা নিতে পারত। এতে একদিকে যেমন বৈষম্য হত না, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষায় কোনো দুর্বল ব্যাচ ভর্তি হতে পারত না।
একটি ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু একজন শিক্ষার্থীর ওপর পড়ে না; এর প্রভাব পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, এমনকি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপরও পড়ে। দুর্বল প্রস্তুতি নিয়ে কোনো শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করলে সেই ঘাটতি পূরণের দায় শেষ পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়।
বন্যা, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া ন্যায়সংগত মূল্যায়নের নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কেন্দ্রে পৌঁছানো, শারীরিক-মানসিক কষ্টসহ কম প্রস্তুতির ফলে প্রভাব পড়বে পরীক্ষা ফলাফলেও। স্থগিত পরীক্ষা পরে নেওয়া, কম প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দেওয়ায় গ্রুপ বিষয়ে নম্বর কম পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে ভর্তি পরীক্ষা অংশ নিতে পারবেন না অনেক শিক্ষার্থী। এমন পরিস্থিতিতে আইনগত কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী ভর্তি নিলেও যোগ্যতার অভাবে বা কম নম্বর থাকায় যোগ্য শিক্ষার্থী কমে যাবে। এতে শুধু উচ্চশিক্ষাসহ গবেষণায় মারাত্মক প্রভাব পড়বে। সবমিলিয়ে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানান, বন্যা পরিস্থিতির কারণে অনেক পরীক্ষার্থী ঠিকমতো পড়াশোনার সুযোগ পাননি। অনেকের বই-খাতা টানা বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পড়ার পরিবেশও ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে কম প্রস্তুতি নিয়েই পরীক্ষার হলে বসতে হচ্ছে তাদের। ফলে বেশ কিছু বিষয়ে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এ ছাড়াও জলাবদ্ধতরার কারণে অনেকে কেন্দ্রে সময়মতো না পৌঁছানোর কারণে শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে বাকি থাকা পরীক্ষায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভর্তি পরীক্ষাসহ উচ্চশিক্ষায় প্রভাব পড়তে পারে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, পরীক্ষা নিয়ে স্বাভাবিক উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বন্যার আতঙ্ক। অনেকেই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিতে পারেননি। ফলে পরীক্ষার হলে বসেও আমরা মানসিক চাপে থাকছি। এ ছাড়াও স্থগিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কেমন হবে, সহজ নাকি কঠিন তা বুঝা যাচ্ছে না। সবাই এক প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছে, আমাদের ভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে হবে। সবমিলিয়ে আমাদের ফলাফলে ভিন্ন প্রভাব পড়বে এবং আমরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছি।
তারা আরও বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী এবার এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই বা দ্রুত সময়েই ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে নেওয়া হবে। মূল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর স্থগিত পরীক্ষা নেওয়া হবে। এতে আমাদের যারা স্থগিত পরীক্ষা দেবে তাদের ভর্তি প্রস্তুতির সময় কমে যাবে এবং প্রস্তুতিও সম্পন্ন হবে না। পাশাপাশি অনেকে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বসেত পারবে না। এ ছাড়াও দুর্যোগ পরিস্থিতিতে গ্রুপের সাবজেক্টের নম্বর কম থাকলেও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বসতে পারবেন না অনেকে।
অভিভাবকদের দাবি, দুর্যোগকবলিত এলাকার শিক্ষার্থীদের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে যারা স্বাভাবিক প্রস্তুতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের ফলাফলে যেন বিরূপ প্রভাব না পড়ে।
জানা গেছে, আজ সোমবার সারাদেশে ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের ষষ্ঠ দিনের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং ওই বোর্ডের আওতাধীন মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের ১৬ জুলাই পর্যন্ত পরীক্ষা আগেই স্থগিত করা হয়েছে। অন্য আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা যথারীতি অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের অনেক কেন্দ্রে বৃষ্টি উপেক্ষা করে পরীক্ষার্থীরা উপস্থিত হতে থাকেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন অভিভাবকেরাও।
‘দুর্যোগকবলিত এলাকার অনেক শিক্ষার্থী নিরাপদে কেন্দ্রে পৌঁছাতে শারীরিক কষ্ট, আর্থিক সংকট ও মানসিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছে। কেউ ভিজে, কেউ পানি অতিক্রম করে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাচ্ছে, ফলে পরীক্ষার আগে প্রয়োজনীয় মানসিক স্থিরতা বজায় রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। এর স্বাভাবিক প্রভাব পরীক্ষার ফলাফলেও পড়তে পারে’ -অধ্যাপক মনিরা জাহান, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের, জবি
দেশের কয়েকটি অঞ্চলে পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি দুর্বিষহ। নোয়াখালীর হাতিয়ার কয়েকটি কেন্দ্রে পানি জমে যায়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শত শত পরিবার জলাবদ্ধতায় আটকা পড়ে। কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ও ভাষাসৈনিক অজিত গুহ কলেজ কেন্দ্রেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
বিশেষ করে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, পরীক্ষার্থীরা নৌকা, ভ্যান এবং কোমরসমান পানি পেরিয়ে কেন্দ্রে যাচ্ছেন। এসব দৃশ্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই সোমবারের পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানান। তবে এমন পরিস্থিতির জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে দায়ি করছেন শিক্ষাবোর্ড।
রাজধানীর একটি কলেজের পরীক্ষার্থী তামিম রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, টানা বৃষ্টি, রাস্তায় জলাবদ্ধতা এবং বাসায় বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনা করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন অবস্থায় পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় বসতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের ফলাফলে প্রভাব পড়বে। এতে বুয়েট-বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে চিন্তিত। এসব বিষয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মনিরা জাহান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বাংলাদেশের এ সমস্যা প্রতিবছরি আমরা দেখে থাকি। এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। এবছর এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষার একটি বিশেষ দিক হল একই প্রশ্নের মাধ্যমে সকল বোর্ডের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। এটি একটি ভালো দিক। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, শিক্ষাদানের গুণগত মান ও শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা এসব বিষয়ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট। তাছাড়া পরীক্ষার সময়টিও বিবেচনার বিষয়।
তিনি বলেন, ‘গত দু’দিন ধরে বৈরি আবহাওয়ার কারণে একটি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। যে কোন জরুরি অবস্থায় যেমন, বন্যা, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া ন্যায়সংগত মূল্যায়নের নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ, দুর্যোগকবলিত এলাকার অনেক শিক্ষার্থী নিরাপদে কেন্দ্রে পৌঁছাতে শারীরিক কষ্ট, আর্থিক সংকট ও মানসিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছে। কেউ ভিজে, কেউ পানি অতিক্রম করে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাচ্ছে, ফলে পরীক্ষার আগে প্রয়োজনীয় মানসিক স্থিরতা বজায় রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। এর স্বাভাবিক প্রভাব পরীক্ষার ফলাফলেও পড়তে পারে।’
স্থগিত পরীক্ষা ও বৈষম্য নিয়ে অধ্যাপক মনিরা জাহান বলেন, একটি শিক্ষাবোর্ডে পরীক্ষা স্থগিত থাকলেও অন্য বোর্ডে পরীক্ষা চলমান থাকায় পরীক্ষার সমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। যারা এখন পরীক্ষা দিচ্ছে তারা দুর্যোগের কারণে হয়তো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারেনি, আবার যাদের পরীক্ষা পরে হবে তারা অতিরিক্ত সময় পাবে। যদিও পরে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার প্রশ্নের মান সমমানের রাখার চেষ্টা করা হয়, তবুও পার্থক্যতো থেকেই যায়। কারণ একই মানসিক ও বাস্তব পরিস্থিতিতে সব শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে না। তাই মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বা বৈষম্যের আশঙ্কা থেকেই যায়।
পরীক্ষার ফলাফল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে প্রভাব পড়তে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক শিক্ষার্থীর এক বা একাধিক বিষয়ে ফল খারাপ হতে পারে, যার প্রভাব পরবর্তীতে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা অর্জনেও পড়তে পারে। ফলে তাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অনেকে হয়তো তাদের পছন্দের বিষয়টিতে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ নাও পেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ‘এ কারণে দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মানসিক অবস্থা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের জন্য বিকল্প সময়সূচি, বিশেষ মূল্যায়ন ব্যবস্থা বা এমন নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তার শিক্ষাজীবনে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন না হয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বন্যা ও জলাবদ্ধতার মধ্যে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা একটি ‘অমানবিক’ সিদ্ধান্ত। গত কয়েক দিনের পরিস্থিতি, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতার চিত্র দেখার পরও পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই, সাধারণ ‘কাণ্ডজ্ঞানই যথেষ্ট’।
আরও পড়ুন: ৫৯ জেলার এইচএসসি নিয়ে আগের সিদ্ধান্তই বহাল, ব্যাখ্যা দিল আন্তঃশিক্ষা বোর্ড
তিনি বলেন, শিক্ষা প্রশাসনের মধ্যে স্পষ্ট সমন্বয়হীনতা রয়েছে। শিক্ষা কেবল পরীক্ষা নেওয়া, নম্বর দেওয়া বা ফল প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সমাজ, পরিবার, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক বাস্তবতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আবহাওয়ার মতো নানা বিষয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু যারা বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্বে রয়েছেন, তারা এসব বাস্তবতাকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিচ্ছেন না।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি কেবল একটি পরীক্ষার ফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আজকের একটি খারাপ ফল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, উচ্চশিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষার উদ্দেশ্য এবং এর সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে যাদের বাস্তব জ্ঞান রয়েছে, তাদের মতামতের ভিত্তিতেই নীতিনির্ধারণ হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের হাতে দিতে হবে। মন্ত্রী বা প্রশাসনের কাজ নীতিগত নেতৃত্ব দেওয়া, কিন্তু শিক্ষা-সংক্রান্ত কারিগরি সিদ্ধান্ত শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েই হওয়া উচিত। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যেমন স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে অস্ত্রোপচার করেন না, তেমনি শিক্ষা প্রশাসনেরও বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করা প্রয়োজন। ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু একজন শিক্ষার্থীর ওপর পড়ে না; এর প্রভাব পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, এমনকি পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপরও পড়ে। দুর্বল প্রস্তুতি নিয়ে কোনো শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করলে সেই ঘাটতি পূরণের দায় শেষ পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়।
অধ্যাপক মজিবুর রহমানের বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। বৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক, তবে সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা না থাকা এবং সেই অবস্থায় কোমরপানি পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে বাধ্য করা ‘মহা অপরাধ'। এ ধরনের সিদ্ধান্ত সমাজে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা, রাজনীতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।