৮৬ বছরের বৃদ্ধ সবুজ শেখ ও তার স্ত্রী © টিডিসি সম্পাদিত
‘আল্লাহ আমাদের খাবার দাও’ অনাহারে থাকা ৮৬ বছরের বৃদ্ধ সবুজ শেখের এমন আকুতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শেরপুর সদর উপজেলার খনুয়া চরপাড়ার অসহায় এই বৃদ্ধ ও তার ৭৮ বছর বয়সী স্ত্রী নূরজাহানের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের দুই মাসের খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতি মাসে তাদের খাবারের দায়িত্বও নেওয়া হয়েছে।
সোমবার দুপুরে বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে গিয়ে তাদের খোঁজখবর নেন জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন। এ সময় তিনি তাদের হাতে ফল ও বিভিন্ন ধরনের খাবারসামগ্রী তুলে দেন। পরে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য শহরের আবেদীন হাসপাতালে নূরজাহানের ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা বিনতে রফিকসহ কর্মকর্তারা ছিলেন।
সোমবার রাতে হাসপাতালে ছুটে যান মহিলা সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা। তিনি নূরজাহানের খোঁজখবর নেন এবং একটি হুইলচেয়ার দিয়ে যান। এ ছাড়া শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম রাশেদের পক্ষ থেকেও অসহায় বৃদ্ধ দম্পতিকে সহযোগিতা করা হয়।
এর আগে রবিবার রাতে বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে যান জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সদর বিএনপির আহ্বায়ক মো. হযরত আলী। তিনি তাদের রান্না করা খাবার খাওয়ান এবং আর্থিক সহায়তা দেন। ভবিষ্যতেও পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি। জেলা যুবদলের পক্ষ থেকেও আতাউর রহমান আতাসহ নেতারা চাল, ডালসহ খাদ্যসামগ্রী ও আর্থিক সহায়তা দেন।
আরও দেখুন: গাঁজা সেবনকালে হাতেনাতে আটক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৭০ বছর আগে বিয়ে হয় সবুজ শেখ ও নূরজাহানের। তাদের ছয় সন্তান। তিন মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তিন ছেলের মধ্যে দু’জন দিনমজুর। আরেক ছেলে করোনাকালে নিখোঁজ হন। দিনমজুর ছেলে নূর ইসলাম সাধ্যমতো বাবা-মাকে সহায়তা করতেন। সম্প্রতি তার স্ত্রী দুরারোগ্য ব্যাধিতে মারা যাওয়ায় তিনিও আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
প্রায় পাঁচ বছর আগে পড়ে গিয়ে নূরজাহানের কোমরের হাড় ভেঙে যায়। এরপর থেকেই তিনি শয্যাশায়ী। নিজের বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা ও আর্থিক অনটনের মধ্যেও স্ত্রীকে একাই দেখাশোনা করে আসছেন সবুজ শেখ। মাঝেমধ্যে কাজের সন্ধানে খনুয়া বাজারে গেলেও বয়স ও শারীরিক অক্ষমতার কারণে কেউ তাকে কাজে নিতেন না।
উপার্জনের কোনো পথ না থাকায় কয়েক বেলা তাদের বাড়িতে চুলায় আগুন জ্বলেনি। ওষুধ কেনা বা চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর স্থানীয় এক তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটর সবুজ শেখের কোলে শয্যাশায়ী স্ত্রী নূরজাহানের একটি ছবি তুলে তাদের অসহায়ত্বের কথা ফেসবুকে প্রকাশ করেন। ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি জেলা প্রশাসকের নজরে আসে। পরে সদর ইউএনওকে ওই বাড়িতে পাঠান তিনি।
ইউএনও আসমা বিনতে রফিক বলেন, ‘অসহায় দম্পতির হাতে দুই মাসের খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ তুলে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি মাসে তাদের খাবারের দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে।’
জেলা ছাত্রদলের সভাপতি নাঈম হাসান বলেন, ‘অসহায় মানুষটির আল্লাহ আমাকে খাবার দেন এই আকুতি হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। তাদের পাশে দাঁড়াতে সদর বিএনপির আহ্বায়ক হযরত আলী ওই পরিবারের বাজার-খরচসহ যাবতীয় ব্যয় বহনের দায়িত্ব নিয়েছেন। রাজনীতি শুধু মিছিল-মিটিং নয়, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও প্রকৃত জনসেবা।’
আরও দেখুন: হাসপাতালে অগ্নিকান্ড, হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে নিহত শাহজাহানের বাড়িতে শোকের মাতম
মো. হযরত আলী বলেন, ‘বৃদ্ধ দম্পতির অসহায়ত্বের খবর পেয়ে তিনি রান্না করা খাবার ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে তাদের বাড়িতে যান। ভবিষ্যতেও ওই দম্পতিকে সর্বাত্মক সহায়তা করবেন।’
জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘বয়োবৃদ্ধ দম্পতির অসহায়ত্বের বিষয়টি জানতে পেরে জেলা প্রশাসন তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা দু’জনই বয়স্ক ভাতা পান। তবে তাদের দারিদ্র্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যতেও প্রশাসনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’