হবিগঞ্জে ২০ গ্রাম প্লাবিত © সংগৃহীত
টানা ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদের পানি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদের প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জের অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আকস্মিকভাবে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় হাজারো মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গবাদিপশু, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন দুর্গতরা।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদের প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে।
আকস্মিক বন্যায় অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে, কেউ স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন। গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নিতে দেখা যায় অনেক পরিবারকে। শহরের কামড়াপুর ও দানিয়ালপুর এলাকাতেও পানি প্রবেশ করেছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ উপচে হাওরে পানি প্রবেশ করে। ফলে ওই এলাকার নিম্নাঞ্চলেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে চুনারুঘাট উপজেলার নালমুখ বাজারসংলগ্ন এলাকায় খোয়াই নদীর ভাঙন আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীর পানির চাপ বাড়তে থাকায় ভাঙন দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এতে রবিদাসপাড়ার অন্তত ১৫টি পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনাও হুমকির মুখে পড়েছে।
মাছুলিয়া পয়েন্টের শহর রক্ষা বাঁধেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বাঁশ ও বালুর বস্তা দিয়ে অস্থায়ীভাবে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছেন। তাঁদের অভিযোগ, আগেভাগে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো।
রাতে বাঁধ ভাঙার খবর পেয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মইনুল ইসলাম, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহেরসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
রাত ১১টার দিকে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হবিগঞ্জ–মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পানি আরও বাড়লে সড়কটি দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সদর উপজেলার সঙ্গে মিরপুর ও আশপাশের এলাকার যোগাযোগে প্রভাব ফেলতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে খোয়াই নদীর বাল্লা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৯২ সেন্টিমিটার, শায়েস্তাগঞ্জ পয়েন্টে ১১৩ সেন্টিমিটার এবং মাছুলিয়া পয়েন্টে ১৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ ছাড়া কুশিয়ারা নদীর কয়েকটি পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সন্ধ্যার পর কয়েকটি পয়েন্টে নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও দুটি স্থানে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পানি আবার বাড়লে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহের বলেন, “বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।”
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করা হয়েছে। জরুরি ত্রাণ সহায়তার জন্য ৫ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল এবং ১ হাজার ৮২০ প্যাকেট শুকনা খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।