দুর্ঘটনার কবলে পড়া বাসটিকে উদ্ধারের তৎপরতা চালাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিস © সংগৃহীত
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে চলন্ত বাসের ব্রেক ফেল করার পর যাত্রীদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন দুলাল (২৫) নামে এক তরুণ বাস হেলপার। বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে চলন্ত গাড়ি থেকে নেমে চাকার নিচে কাঠের গুড়ি দিতে গিয়ে তিনি নিজের গাড়ির চাকার নিচেই পিষ্ট হন।
শুক্রবার (২৯ মে) রাত সাড়ে ৮টার দিকে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ধলেশ্বরী টোল প্লাজা এলাকায় এই বীরত্বপূর্ণ ও মর্মস্পর্শী দুর্ঘটনাটি ঘটে।
নিহত দুলাল কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বাসিন্দা। তিনি কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ‘আহসান পরিবহন’ নামের একটি দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসের হেলপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ফায়ার সার্ভিস ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, নৈশকালীন যাত্রীবাহী বাসটি কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী এলাকা থেকে ছেড়ে এসে পদ্মা সেতু পার হয়ে ঢাকার দিকে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে এক্সপ্রেসওয়ের ধলেশ্বরী টোল প্লাজার কাছাকাছি পৌঁছালে হঠাৎ করেই বাসটির ব্রেকিং সিস্টেম সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। এক্সপ্রেসওয়ের ঢালু রাস্তায় চলন্ত বাসটি তীব্র গতিতে টোল প্লাজার দিকে এগোতে থাকে। চালক আপ্রাণ চেষ্টা করেও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গাড়িটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিলেন না।
টোল প্লাজার ব্যারিয়ার এবং সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যান্য যানবাহনের সাথে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঠিক আগ মুহূর্তে বাসের ভেতরে থাকা প্রায় ৪০-৫০ জন যাত্রীর জীবন বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন হেলপার দুলাল। তিনি নিজের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত চলন্ত বাস থেকে নেমে পড়েন এবং চাকার গতি টেনে ধরতে পেছনের চাকার নিচে ভারী একটি কাঠের টুকরো ছুড়ে মারার চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত গতিশীল বাসের চাকাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি তাঁর শরীরের ওপর দিয়ে চলে যায়। এতে চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই দুলালের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
তবে দুলালের এই তাৎক্ষণিক ও অসম সাহসী পদক্ষেপের কারণে বাসটির গতি কিছুটা কমে যায় এবং চালক গাড়িটিকে একপাশে চেপে থামাতে সক্ষম হন। ফলে নিশ্চিত এক বড় বিপর্যয় ও সংঘর্ষ থেকে রক্ষা পায় বাসটি। বাসের ভেতরে থাকা কোনো যাত্রী হতাহত হননি বলে নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিস।
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পরপরই ধলেশ্বরী টোল প্লাজা এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। দুর্ঘটনার শিকার যাত্রীদের চিৎকারে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির তৈরি হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং বিশৃঙ্খলা এড়াতে সংশ্লিষ্ট লেনে কিছু সময়ের জন্য টোল আদায় সম্পূর্ণ বন্ধ রাখে কর্তৃপক্ষ। খবর পেয়ে সিরাজদিখান ফায়ার সার্ভিসের একটি উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাসের নিচে আটকে থাকা নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে হাইওয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
মুন্সিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সফিকুল ইসলাম দুর্ঘটনার বিবরণ দিয়ে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বাসটি যখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তখন সামনে বড় ধরনের প্রাণহানি অবধারিত ছিল। হেলপার দুলাল নিজের জীবনের পরোয়া না করে চলন্ত বাসের চাকা টেনে ধরার যে মরিয়া চেষ্টা করেছেন, তা সাধারণত দেখা যায় না। তিনি নিজে পিষ্ট হয়ে গেছেন, কিন্তু বাসের ভেতরে থাকা সব যাত্রীকে অক্ষত রেখে গেছেন। এটি এক অনন্য কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক আত্মত্যাগ।’