গরুর একটি খামার © টিডিসি
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে উত্তরের জেলা গাইবান্ধায় কোরবানির পশুর বাজার এখন সরব। জেলার সাতটি উপজেলার খামারগুলোয় প্রস্তুত হয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৯০০টি কোরবানিযোগ্য পশু। অথচ স্থানীয় চাহিদা মাত্র ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০টি। চাহিদার তুলনায় ৪০ হাজার ৪০০টি পশু বেশি থাকায় জেলা থেকে অন্যান্য জেলায় পশু পাঠানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা।
গাইবান্ধার সাত উপজেলা সদর, সুন্দরগঞ্জ, পলাশবাড়ী, গোবিন্দগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সাদুল্যাপুর জুড়ে এবার কোরবানির পশু কেনাবেচার জন্য ৩২টি হাট নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি স্থায়ী ও ১৩টি অস্থায়ী হাট। উল্লেখযোগ্য হাটগুলোর মধ্যে রয়েছে সদরের কামারজানি হাট, কালিরপাট হাট, দাড়িয়াপুর হাট, সুন্দরগঞ্জের মাঠেরহাট, পাঁচপীর হাট, গোবিন্দগঞ্জের ধাপেরহাট, পলাশবাড়ীর ভরতখালি হাট ও সাঘাটার লক্ষ্মীপুর হাট।
হাট ইজারাদার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে এসব হাটে নিরাপত্তাবেষ্টনী, পশুর পানি ও খাদ্যের ব্যবস্থা এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগের চিকিৎসা ক্যাম্প তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এসব হাট পুরোদমে জমে উঠবে বলে আশা করছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।
সরেজমিনে বেশ কয়েকটি খামার ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে পশুর সেবাযত্ন। কেউ ঘাস কাটছেন, কেউ খইল-কুড়া মিলিয়ে খাবার তৈরি করছেন, কেউ বা স্নান করিয়ে পশুকে প্রস্তুত করছেন ঈদের বাজারের জন্য।
খামারি মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আমরা কোনো ক্ষতিকর ইনজেকশন বা ওষুধ দিইনি। সম্পূর্ণ দেশীয় খাবার ভুসি, খইল, গমের কুঁড়া, ঘাস খাইয়ে গরু মোটাতাজা করেছি। এতে পশুর মাংস স্বাস্থ্যসম্মত হয়। ক্রেতারাও এখন এমন পশুই বেশি চান।’
পালাশবাড়ী উপজেলার খামারি বিল্লাল মিয়া বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা প্রাকৃতিক নিয়মেই গরু লালন করি। এবার ১৫টি গরু প্রস্তুত করেছি। খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ বেশি হয়েছে, কিন্তু হাটে যদি ভালো দাম পাই, তাহলে লাভ থাকবে।’
সুন্দরগঞ্জের মাঠেরহাট এলাকার খামারি সাজ্জাদ রহমান রাসেল বলেন, ‘গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় পশু পালনের খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। তবু আশা করছি, হাটে ভালো দাম পেলে লাভবান হব।’
সাঘাটা উপজেলার ক্রেতা আব্দুল মতিন বলেন, ‘আমি প্রতি বছরই হাট থেকে পশু কিনি। এবার শুনেছি চাহিদার চেয়ে পশু বেশি আছে, তাই দাম যেন অনেকের নাগালে থাকে সেদিকে নজর দিতে বলি।’
লাভের আশা থাকলেও খামারিদের চোখে-মুখে শঙ্কার ছাপ। সদর কালিরপাট এলাকার খামারি আনোয়ার হোসেন ও দুই শতাধিক গরুর মালিক জুয়েল মিয়া জানান, তারা ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বড় বিনিয়োগ করেছেন।
জুয়েল মিয়া বলেন, ‘আমাদের প্রধান ভয় হলো—যদি ভারত বা অন্য কোনো দেশ থেকে অবৈধভাবে গরু বাজারে ঢুকে পড়ে, তাহলে আমরা চরম লোকসানের মুখে পড়ব। প্রশাসনকে সেদিকে কঠোর নজর দিতে হবে।’
অপর দিকে ক্রেতারাও আশঙ্কা করছেন দালাল চক্রকে নিয়ে। সুন্দরগঞ্জের বাসিন্দা ও চাকরিজীবী সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর হাটে গিয়ে দেখি, দালালরা মিলে দাম ঠিক করে দেয়। সরাসরি খামারির কাছ থেকে পশু কেনা মুশকিল হয়ে যায়। এবার যেন এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয় প্রশাসন।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান, জেলায় ১৭ হাজার ৩৩১টি খামারে বর্তমানে ৩৭ হাজার ৬৬০টি ষাঁড়, ৩ হাজার ৫৭২টি বলদ, ২২ হাজার ৪৬০টি গাভী, ১৫৩টি মহিষ, ১ লাখ ২ হাজার ৯৩৮টি ছাগল, ১০ হাজার ২৮৯টি ভেড়া ও ৪টি দুম্বা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘জেলায় চাহিদার চেয়ে ৩৯ হাজার ৪৮৩টি পশু বেশি আছে। এটি গাইবান্ধার জন্য বড় সম্ভাবনা। আমরা প্রতিটি হাটে মেডিকেল টিম মোতায়েন করব। পশু স্বাস্থ্য পরীক্ষা, জাল টাকা রোধ ও দালাল চক্র নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে। কোনো অসুস্থ বা অস্বাভাবিক পশু হাটে তোলা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’