কোরবানির ঈদ
আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে সরকার © ফাইল ছবি
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাট। সারা বছরই এ হাটে চামড়া বেচাকেনা হলেও কোরবানির ঈদের মৌসুমি বাজার ধরতে অপেক্ষায় থাকেন ব্যবসায়ীরা। এবার ঈদের আগেই ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা নেমেছে।
কয়েকটি কারণে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও মৌসুমি ব্যবসাীরা চামড়ার বাজার নিয়ে শঙ্কিত। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে চামড়া সংরক্ষণের প্রধান অনুষঙ্গ লবণের দাম বাড়ছে। একই সঙ্গে ট্যানারি মালিকদের কাছে পাওনা টাকা বকেয়া রয়েছে। ব্যাংক ঋণ না পাওয়ায় চড়া সুদে মহাজন কিংবা এনজিও থেকে টাকা নিতে হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কিনে সংরক্ষণের পর ন্যায্য দাম মিলবে কি না, সেটি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। প্রতিবছর সরকার দাম নির্ধারণ করলেও মনিটরিংয়ের অভাবে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও মৌসুমী ব্যবসায়ীদের পথে বসার উপক্রম হয়।
জানা গেছে, আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে সরকার। ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। নির্ধারিত দামে চামড়া বেচাকেনা হবে কিনা, সেটি নিয়ে প্রান্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। নানা সংকটের কারণে এবারে কোরবানিতে চামড়া বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজারহাটের মোকামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, পশুর চামড়া সংরক্ষণের অন্যতম অনুসঙ্গ লবন। ইতোমধ্যে প্রতি বস্তায় লবনের দাম ১০০ টাকা বেড়েছে। লবনের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চামড়া সংরক্ষণের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। সরকারিভাবে বিনামূল্যে লবন দেওয়া হলেও সেটি ব্যবসায়ীরা পান না। মাদরাসা-এতিমখানায় বিনামূল্যে লবন বিতরণ করা হলেও সেটি কাজে না লাগিয়ে আলাদা করে বিক্রি করা হয়। এ জন্য ব্যবসায়ীদের বিনামূল্যে লবণ দিলে উপকৃত হতো।
আরেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আনন্দ দাস বলেন, ‘আমাদের মত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা নেই। ফলেবাধ্য হয়েছে এনজিও, মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে পুঁজি জোগাড় করি। সেই পুঁজির টাকায় চামড়া কিনে ন্যায্য দাম বঞ্চিত হই। কোরবানিতে কখনই সরকার নির্ধারিত দামে বেচাকেনা করতে পারি না।’
রাজারহাট মোকামের আড়তদার আবদুল মালেক বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে কোটি কোটি টাকা পাওনা রয়েছে আড়তদারদের। দীর্ঘদিনেও বকেয়া আদায় না হওয়ায় পুঁজি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। ঈদের আগে বকেয়া আদায় না হলে পুঁজি সংকট বাড়বে।
একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, ‘সরকার প্রতিবছর চামড়ার দাম নির্ধারণ করেন। কিন্তু সেই দামে সব চামড়া বেচাকেনা হয় না। চামড়া পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর থাকতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের দেশের চামড়া চায়নায় রপ্তানি করা হয়। চীননির্ভর রপ্তানি থেকে বেরিয়ে ইউরোপের বাজার ধরতে হবে। তাহলে চামড়া শিল্প চাঙা হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বাঁচবে। নতুন সরকার এ বিষয়ে বিবেচনা করবেন।’
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘চামড়ার বাজার মনিটরিং ও পাচার রোধে জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সপ্তাহের প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার রাজারহাটে যশোরসহ খুলনা বিভাগের দশ জেলার পাশাপাশি ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, ঝালকাঠি, রাজশাহী, পাবনা, ঈশ্বরদী ও নাটোরের ব্যবসায়ীরা চামড়া কেনাবেচা করেন। ছোট-বড় মিলিয়ে এখানে দুই শতাধিক আড়ত রয়েছে। যেখানে কাজের সুযোগ হচ্ছে অন্তত দুই হাজার মানুষের।