ভৈরব নদে ভাঙনের ফলে অনেক পরিবার তাদের শেষ সম্বল হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে © টিডিসি
‘যে নদী একসময় ছিল বাঁচার অবলম্বন, সেই নদীই আজ আমাকে উচ্ছেদ করেছে। ঘরবাড়ি সব গিলে ফেলেছে।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন বাগেরহাট সদর উপজেলার ভৈরব নদের তীরবর্তী বাসিন্দা মশিউর রহমান। তার মতোই একই দুর্দশার শিকার হয়েছেন এই অঞ্চলের শতাধিক পরিবার।
বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের ডিংশাইপাড়া গ্রামে দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ভৈরব নদের ভাঙন। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই নদীর তীব্র স্রোতে ভেঙে যাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও গাছপালা। একসময় জনবসতিপূর্ণ বিস্তীর্ণ এলাকা এখন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ইতোমধ্যে ডিংশাইপাড়া গ্রামের বড় একটি অংশ নদে তলিয়ে গেছে। অনেক পরিবার তাদের শেষ সম্বল হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে।
ভুক্তভোগী মশিউর রহমান বলেন, ‘একসময় এই নদীতে ট্রলার চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতাম। নদের ঘাটেই ছিল আমার বাড়ি। এখন সব শেষ। ঘরবাড়ি, জমিজমা সব নদীর মধ্যে চলে গেছে। যে নদী আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, সেই নদীই আজ আমাকে নিঃস্ব করেছে।’
আরেক ক্ষতিগ্রস্ত আবদুস সাত্তার বলেন, ‘এই নদীর পাড়েই আমাদের বসতভিটা ছিল। এমনকি পারিবারিক কবরস্থানও ছিল এখানে। এখন সব নদীগর্ভে। আমরা অন্যত্র গিয়ে বসবাস করছি। দ্রুত বাঁধ নির্মাণ না হলে আরও অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়বে।’
স্থানীয় যুবক শেখ আলামিন বলেন, ‘ছোটবেলায় এখানে অসংখ্য বাড়িঘর দেখেছি। মানুষ এই নদীর ওপর নির্ভর করে জীবন-জীবিকা চালাতো। এখন সেই সবকিছুই হারিয়ে গেছে। অনেক পরিবার চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। বর্ষা আসার আগেই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।’
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন অব্যাহত থাকলেও টেকসই কোনো প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।
তাদের দাবি, ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে। অন্যথায় পুরো ডিংশাইপাড়া গ্রামই একসময় নদীতে বিলীন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
এ বিষয়ে বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান।
বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মনজুরুল হক রাহাদ বলেন, ‘ভৈরব নদীর ভাঙন কবলিত এলাকায় দ্রুত বেড়িবাঁধ নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।’
এদিকে বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে। তাদের আশঙ্কা, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এবারের বর্ষায় আরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের পাশাপাশি স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। নইলে যে নদী একসময় এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল, সেই নদীই একদিন পুরো জনপদকে মানচিত্র থেকে মুছে দেবে।