সাতক্ষীরায় থমকে প্রতিবন্ধী উন্নয়ন কমিটির চাকা, উপবৃত্তি পাচ্ছে মাত্র ২ শতাংশ

২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৬ PM , আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৯ PM
সাতক্ষীরা সমাজসেবা অধিদপ্তর

সাতক্ষীরা সমাজসেবা অধিদপ্তর © ফাইল ছবি

সাতক্ষীরা জেলায় ৬৭ হাজারের বেশি প্রতিবন্ধী মানুষের বসবাস থাকলেও তাদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামোর সঠিক প্রয়োগ নেই বললেই চলে। একদিকে শিক্ষা উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত বিশাল এক অংশ, অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ের সুরক্ষা কমিটিগুলোর নিষ্ক্রিয়তা, এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন জেলার হাজার হাজার প্রতিবন্ধী মানুষ।

জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলায় মোট নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা ৬৭ হাজার ৮৬ জন। এর মধ্যে ৫৫ হাজার ৭২৫ জন মাসিক ভাতা পেলেও শিক্ষা উপবৃত্তি পাচ্ছেন মাত্র ১ হাজার ৩৬৫ জন শিক্ষার্থী। শতাংশের হিসেবে যা মোট প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মাত্র ২ শতাংশের সামান্য বেশি। তবে জেলায় মোট প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান জেলা শিক্ষা অফিস বা পরিসংখ্যান অফিসে সংরক্ষিত নেই।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, উচ্চশিক্ষার খরচ মেটাতে না পেরে অনেকেই মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে সমাজসেবা কার্যালয় জানিয়েছে, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় আবেদনকারী সকল যোগ্য শিক্ষার্থীকে এই তালিকার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।

উপবৃত্তি না পাওয়ার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেক শিক্ষার্থী। এমনই একজন সাতক্ষীরা সদরের শিমুলবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী আশিস বিশ্বাস, যিনি হাতের কম্পনজনিত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে এবারের (২০২৬) পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।

পরীক্ষা কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে আশিস বলেন, আমি কোনো শিক্ষা উপবৃত্তি পাই না। অভাবের সংসারে পড়াশোনা চালানোই কঠিন। গতকাল প্রথম পরীক্ষার দিনেও সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে সময় নিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত সময় পাওয়ার কথা থাকলেও আমাকে তা দেওয়া হয়নি। নির্ধারিত সময়েই খাতা নিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমার জন্য স্বাভাবিক গতিতে লেখা সম্ভব না।

তিনি আরও জানান, শিক্ষকদের কাছ থেকে জেনেছেন নির্ধারিত ফরমে আবেদন করে শ্রুতিলেখকের অনুমতি নিতে হয়। তবে এ বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও সহায়তা না পাওয়ায় তিনি সময়মতো আবেদন করতে পারেননি। ফলে নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়েই পরীক্ষা দিতে হচ্ছে তাকে।

অন্যদিকে, প্রতিবন্ধকতা যে মেধার পথে বাধা হতে পারে না, তার উদাহরণ মো. সিহাব সিদ্দিকী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েও তিনি ২০১৯ সালে ‘শাপলা প্রতিবন্ধী যুব উন্নয়ন সংস্থা’ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে ৬২ জন সদস্যের এই সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০২২ সালে এসএসসি ও ২০২৪ সালে এইচএসসি পাস করেছেন সিহাব।

তবে নিজের অভিজ্ঞতায় বৈষম্যের চিত্রই তুলে ধরেন তিনি। সিহাব বলেন, একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষাজীবন এক ধরনের যুদ্ধ। আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত সময় ও শ্রুতিলেখকের সুবিধা থাকলেও বাস্তবে তা অনেক সময় পাওয়া যায় না। ফলে পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে শিক্ষার্থীদের এসব অধিকার পেতে অনুরোধ করতে হয়।

তিনি আরও বলেন, জেলায় ভাতার তুলনায় উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম, যা প্রমাণ করে প্রতিবন্ধীদের প্রতি সহানুভূতি থাকলেও তাদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ কম। পাশাপাশি প্রতিবন্ধীদের জন্য গঠিত উপজেলা সুরক্ষা কমিটিগুলোও কার্যত নিষ্ক্রিয়। নিয়মিত সভা না হওয়ায় তাদের দাবি ও সমস্যাগুলো সামনে আসে না।

এই প্রতিকূলতার চিত্র আরও ভয়াবহ নারী প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের জন্য পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটাই কঠিন, তার ওপর পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে আরও সমস্যায় পড়তে হয়। শ্রুতিলেখক বা অতিরিক্ত সময় পাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে পরিষ্কারভাবে কেউ আগে থেকে জানায় না। মেয়েদের ক্ষেত্রে যাতায়াত ও কেন্দ্রে ওঠানামার সমস্যাও থাকে। অনেক সময় এসব কারণে ঠিকমতো পরীক্ষা দিতে পারি না।

‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’-এর ২৩ ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি উপজেলায় একটি সংবিধিবদ্ধ 'প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা কমিটি' থাকার বিধান রয়েছে। প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতি তিন মাসে অন্তত একবার এই কমিটির সভা হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু সাতক্ষীরার চিত্র ভিন্ন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে এসব কমিটির কোনো সভা হচ্ছে না।

প্রতিবন্ধীব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা সংক্রান্ত উপজেলা কমিটির সভাপতি এবং সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্ত বলেন, আমরা নিয়মিত তদারকির চেষ্টা করি। তবে অনেক সময় দাপ্তরিক ব্যস্ততায় নির্দিষ্ট সময় অন্তর সভা করা সম্ভব হয় না। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ম অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে কেন্দ্র সচিবদের সঙ্গে কথা বলা হবে।

সাতক্ষীরা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সায়েদুর রহমান মৃধা নিয়মিত সভা না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমাদের উপজেলা পর্যায়ে কাজের চাপ অনেক বেশি থাকে, যে কারণে প্রতি তিন মাস পর পর সভা করা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। সাধারণত যখন বিশেষ কোনো প্রয়োজন দেখা দেয়, তখনই আমরা সভা আহ্বান করি। তবে নিয়মিত না হলেও বছরে গড়ে ১টি বা ২টি সভা হয়ে থাকে। আমরা চেষ্টা করছি সামনের দিনগুলোতে এই সমন্বয় আরও বাড়াতে।
 
গত এক বছরে জমা পড়া অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। তবে অনেক সময় ভুক্তভোগীরা আমাদের কাছে এসে মৌখিকভাবে তাদের সমস্যার কথা জানান। আমরা চেষ্টা করি তাৎক্ষণিকভাবে সেসব সমস্যার সমাধান করে দিতে।

উপবৃত্তির সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, জেলায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ উপবৃত্তি থেকে বঞ্চিত থাকার মূল কারণ হলো চাহিদার তুলনায় বরাদ্দের স্বল্পতা। বরাদ্দ কম থাকায় অনেক সময় আবেদনকারী সকল যোগ্য শিক্ষার্থীকে এই তালিকার আওতায় আনা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

সাতক্ষীরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী এসএম বিপ্লব হোসেন মনে করেন, কমিটির এই নিষ্ক্রিয়তা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ এটি একটি সংবিধিবদ্ধ আইন যার বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক। আইনের ২৩ ধারা অনুযায়ী উপজেলা কমিটিগুলোর নিয়মিত সভা না হওয়া এবং নীতিমালার তোয়াক্কা না করে পরীক্ষা কেন্দ্রে অতিরিক্ত সময় না দেওয়া সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। এমনকি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্থানীয় সরকারের স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত না করাও তাদের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার শামিল।
 
তিনি আরও বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা 'কাজের চাপে' সভা করতে না পারার যে অজুহাত দিচ্ছেন, তা আইনি দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এই কমিটিগুলো গঠিত হয়েছে বিশেষ একটি জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন যদি আইন ও নীতিমালার এই ব্যত্যয়গুলো দ্রুত সমাধান না করে, তবে ভুক্তভোগীরা আইনি প্রতিকারের জন্য উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ রাখেন।

মানবাধিকার কর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, কাজের চাপের অজুহাত দিয়ে একটি সংবিধিবদ্ধ কমিটির সভা বন্ধ রাখা যায় না। এর ফলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তাদের অধিকার ও অভাব-অভিযোগ জানানোর কোনো কার্যকর প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছেন না। আইন অনুযায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে তাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। কিন্তু সভা না হওয়া মানে তাদের সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া। নিয়মিত তদারকি না থাকায় ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদের স্থায়ী কমিটিগুলোতেও প্রতিবন্ধীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হচ্ছে না।

অপরদিকে, জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, পাবলিক ও শ্রেণি পরীক্ষায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা শারীরিক অক্ষমতার কারণে যারা লিখতে পারেন না, তাদের জন্য শ্রুতিলেখক ও সহায়তাকারীর স্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। নতুন নীতিমালা (২০২৫) অনুযায়ী, একজন পরীক্ষার্থী চাইলে নিজের পছন্দের বা কেন্দ্র থেকে সরবরাহকৃত যোগ্যতাসম্পন্ন শ্রুতিলেখকের সাহায্যে পরীক্ষা দিতে পারবেন। এক্ষেত্রে পরীক্ষার্থী প্রতি ঘণ্টায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় পাওয়ার অধিকারী।
 
শিক্ষা অফিস আরও জানায়, নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষার আগে নির্ধারিত ফরমে কর্তৃপক্ষের কাছে শ্রুতিলেখকের অনুমতির আবেদন করতে হয়। শ্রুতিলেখককে অবশ্যই পরীক্ষার্থীর চেয়ে অন্তত এক বা দুই ধাপ নিচের ক্লাসের (যেমন এসএসসির জন্য ৮ম বা ৯ম শ্রেণি) শিক্ষার্থী হতে হবে। বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই যোগ্যতা যাচাই করে অনুমোদন প্রদান করেন। তবে শিক্ষা অফিসে এ সংক্রন্ত কোনো অভিযোগ কেউ করেনি। 

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আলমগীর কবীর বলেন, শ্রুতিলেখকের অনুমতির জন্য এখন পর্যন্ত কেউ আবেদন করেনি। এছাড়া কতজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, সে সম্পর্কেও আমাদের কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছি। কেউ যদি কোনো সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব।

জাতীয় সংসদে বীরশ্রেষ্ঠদের নামে গ্যালারি নামকরণ
  • ২২ এপ্রিল ২০২৬
২৪ পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাংলাদেশ ব্যাংকের, আবেদন ২৮ এপ্রিল থ…
  • ২২ এপ্রিল ২০২৬
চট্টগ্রামে সংঘর্ষ: অস্ত্রের প্রতিবাদে ‘কলম মিছিল’ হলো ঢাকা …
  • ২২ এপ্রিল ২০২৬
আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ও ত্যাগীদের সঙ্গে বিতর্কিতরাও মূল্য…
  • ২২ এপ্রিল ২০২৬
দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন মেসি
  • ২২ এপ্রিল ২০২৬
আন্তর্জাতিক একাডেমিক সহযোগিতায় চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের…
  • ২২ এপ্রিল ২০২৬