চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে খনার মেলা শুরু © টিডিসি
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী ‘খনার মেলা’ শুরু হয়েছে। প্রাচীন কৃষিজ্ঞান ও খনার বচনকে ঘিরে আয়োজিত এ মেলায় গান, পালাগান ও নানা সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর হয়ে উঠেছে আঙ্গারোয়া গ্রাম। এবারের প্রতিপাদ্য ‘খনা আছে জনে জনে, খনা আছে সব জীবনে’।
বাংলার লোকজ ঐতিহ্য, প্রাচীন কৃষি জ্ঞান ও আবহমান জীবনবোধকে ধারণ করে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার গড়াডোবা ইউনিয়নের আঙ্গারোয়া গ্রামে ‘মঙ্গলঘর পরিসর’-এর আয়োজনে এবং কুল এক্সপোজারের সহযোগিতায় আজ ১৩ এপ্রিল চৈত্রসংক্রান্তির সূর্যোদয় থেকে ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের সূর্যোদয় পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘তৃতীয় খনার মেলা’।
মানুষের সুখ-দুঃখ, জীবন-জ্ঞান ও সত্যের আলোকবর্তিকা হিসেবে পরিচিত জ্যোতির্ময়ী খনাকে স্মরণ করে এআয়োজন করা হচ্ছে। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন নয়,প্রকৃতির ভোরের হাওয়াই এমেলার সূচনা ঘটাবে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) ভোরে উপজেলা গড়াডোবা ইউনিয়নে আঙ্গারোয়া গ্রামে উপস্থিত অতিথিরা এ মেলার উদ্বোধন করেন।
মঙ্গল ঘর নামের একটি সংগঠনসহ স্থানীয় এলাকাবাসীসহ সার্বিক সহযোগিতায় রয়েছে কুল এক্সপোজার। মিডিয়া পার্টনার হিসেবে চ্যানেল আই ও নিউজ পোর্টাল নিউজট্রেইল, ট্রান্সপোর্ট পার্টনার হিসেবে এসআর পরিবহন এবং মেডিকেল পার্টনার হিসেবে যুক্ত রয়েছে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। এ ছাড়া পিআর ও মার্কেটিং সহযোগিতায় রয়েছে কুল এক্সপোজার।
বাংলা ১৪৩১-কে বিদায় জানাতে কেন্দুয়া উপজেলা কবি সাহিত্যিকের উর্বর ভূমি ও ময়মনসিংহে গীতিকার ঐতিহ্যবাহী উপজেলা কেন্দুয়ার গড়াডোবা ইউনিয়নের আঙ্গারোয়া গ্রামে এই আয়োজন করা হয়েছে।
খনার ওপর বিশেষ আলোচনা পর্বে খনা আছে জনে জনে,খনা আছে সব জীবনে প্রতিপাদ্যের আলোকে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, উপমহাদেশের প্রখ্যাত খনাবিষয়ক গবেষক ও কন্ঠ শিল্পী মৌসুমী ভৌমিক, কেন্দুয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কবি আব্দুল হাই সেলিম, সংস্কৃতিবিষয়ক সংগঠক আবুল কালাম আজাদ, লোক সাহিত্য গবেষক বাবু রাখাল বিশ্বাস, কেন্দুয়া রিপোর্টার্স ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, চর্চা সাহিত্য আড্ডার সমন্বয়ক কবি রহমান জীবন, মঙ্গলঘর পরিসরের প্রধান সংগঠক বদনূর চৌধুরী লিপন প্রমুখ।
মেলায় সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় বরেণ্য শিল্পী কফিল আহমেদের পরিচালনায় লোকগান ও পুঁথি পাঠ পরিবেশিত হবে। এ ছাড়া কৃষ্ণকলি ও তার দল, সংগঠন সমগীত, ব্যান্ড সহজিয়া, মুসা কলি মুকুল, নূপুর সুলতানা, বাউল ফকির সাহেব, মঙ্গলঘরের শিল্পী কৃষক দুদু কাঞ্চনসহ আরও অনেকেই গান পরিবেশন করবেন।
আয়োজনে বয়াতি পালা গান, জারি গান, কেচ্ছা গান, লাঙ্গল, কোপিবাতি, বিন্দা, মাটির পাত্র, বাঁশের তৈরী বিভিন্ন তৈজসপত্রসহ গ্রামের ঐতিহ্যের সব কিছু এখানে তুলে ধরা হয়। তবে মেলা বলতে সাধারণত নানা পণ্যের পসরা বোঝালেও এই মেলা সেই মধ্যে মেলা নয়। এখানে কথা-গানের ভরপুর আয়োজন চলে। আর সেই কথায় বা গানে গানে গ্রামীণ চিরায়ত চিত্র ফুটে উঠেছে।
বয়াতিরা নিজেদের ভাষায় পালা গানের মাধ্যমে তুলে ধরেন এই গ্রামীণ সংস্কৃতি। খনার বচনের মধ্যে অন্যতম বচনগুলো ছিল ‘জল ভালা ভাসা, মানুষ ভালা চাষা’, ‘চৈতে লতা, বৈশাখে পাত ‘। অর্থাৎ কৃষি উপজীব্যকে সামনে তুলে আনতেই এমন আয়োজন। আর এই আয়োজনে গ্রামে বেড়াতে আসা বিভিন্ন বয়সের শ্রেণি-পেশার মানুষও উপস্থিত থেকে বৈশাখের ছুটির আনন্দ উপভোগ করেছে। শুধু গ্রামের মানুষই নয়,জেলা ছাড়াও ঢাকা,চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছেন অনেকেই।
বিভিন্ন শিল্পীরাও পরিবেশন করেছেন স্থানীয় বাউল সাধকদের গান। এ ছাড়াও স্থানীয় বয়াতিরা পালা গান, জারি গান, কেচ্ছা গান পরিবেশন করে। সবাই মিলে গ্রামীণ খাবার খেয়েছেন মাটির পাত্রে। পুরনো আসবাবপত্র তুলে ধরা হয় নতুন প্রজন্মকে চিনিয়ে দিতে।
এ ছাড়া মেলায় থাকবে ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ, লণ্ঠন উৎসব এবং বিশেষ স্মারক ‘ভোরের হাওয়া’-র উন্মোচনসহ নানা সৃজনশীল আয়োজন।
খনার মেলায় কিশোরগঞ্জ থেকে আসা আসমা আক্তার বলেন, এই যে গ্রামে এই সময়ে আনন্দ করছে মানুষ, এটাই তো হারিয়ে গিয়েছিল। এটি আবারো জাগ্রত হলে আবার গ্রামে ফিরবে মানুষ।
এই মেলায় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত শিল্পকলা ও নাট্যকলা শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষার্থীদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, শুনেছি গত ২ বছর যাবৎ এআয়োজন হচ্ছে । খনাকে নিয়ে আয়োজন এটা তৃতীয়বারের মতো। আমরা চাই প্রতিবছর আয়োজনটি বড় পরিসরে হোক এবং গ্রামের ঐতিহ্য ধরে রাখুক।
মেলা উদযাপন কমিটির উদ্দোক্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, গত দুই বছর থেকে আঙ্গারোয়া গ্রামে তারা এ মেলা শুরু করেছে। মেলার আয়োজন করতে পেরে তাদের এক ধরনের নতুন অনুভূতি ও আত্মতৃপ্তির সৃষ্টি হয়। মেলায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কবি ও সংস্কৃতিকর্মী ছাড়াও নানা-শ্রেণির মানুষজন আসে।
প্রধান আয়োজক গড়াডোবা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বদনূর চৌধুরী লিপন জানান, মঙ্গল ঘর নামে তাদের একটি মাত্র কক্ষ রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন আড্ডা হয়।
এসব আড্ডায় ভালো ভালো চিন্তা বেরিয়ে আসে। আর সেখান থেকেই এই খনার মেলার আয়োজন। এবছর তৃতীয়বারের মতো এমন আয়োজনে স্থানীয় গ্রামের মানুষ আনন্দ নিচ্ছে এটাই অনেক বড়। বিশেষ করে খনার বচন এখন আর শোনাই যায় না। খনার বচনের সঙ্গে প্রকৃতির সব কিছু মিশে আছে। এগুলো নতুন প্রজন্ম শুনবে এবং ধারণ করবে এটাই প্রত্যাশা করেন তিনি।