ফাইল ছবি © সংগৃহীত
আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) থেকে সারা দেশের মতো ফেনীতেও শুরু হচ্ছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। তবে চলতি বছর ফেনী জেলায় এইচএসসি, আলিম ও কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ, আর্থিক সংকট এবং মেয়েদের দ্রুত বিয়ের প্রথা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাসের পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে।
জেলা প্রশাসনের শিক্ষা শাখা সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে ফেনীর ২২টি কেন্দ্রে ১২ হাজার ৪৮৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ১০ হাজার ৭০ জন, আলিম ১ হাজার ৭১৪ জন ও কারিগরি বোর্ডের অধীনে ৭০৩ জন।
গত তিন বছরের তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, ২০২৩ সালে ফেনীতে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১২ হাজার ৭৮৮ জন এবং ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ১৭৯ জনে। কিন্তু ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৪৮৭ জনে। বিশেষ করে আলিম পরীক্ষার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২৩ সালে আলিম পরীক্ষার্থী ছিল ২ হাজার ৬৩ জন, ২০২৪ সালে ১ হাজার ৯১০ জন আর এ বছর কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭১৪ জনে।
জেলা প্রশাসনের শিক্ষা শাখা সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে ফেনীর সদর উপজেলায় এইচএসসিতে পরীক্ষার্থী ৫ হাজার ৪১১ জন, আলিমে ৬০০ জন ও ভোকেশনালে ২৪৫ জন, পরশুরাম উপজেলায় এইচএসসিতে ৭৫৮ জন, আলিমে ৮৯ জন, ফুলগাজী উপজেলায় এইচএসসিতে ৭৭০ জন, আলিমে ৭৪ জন এবং ভোকেশনালে ১১০ জন, ছাগলনাইয়া উপজেলায় এইচএসসিতে ১ হাজার ২৩২ জন, আলিমে ৩৬৭ জন, সোনাগাজী উপজেলায় এইচএসসিতে ৫৭৪ জন, আলিমে ৩০৬ জন এবং দাগনভুঞা উপজেলায় এইচএসসিতে ১ হাজার ৩২৫ জন, আলিমে ২৭৮ জন এবং ভোকেশনালে ৩৪৮ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
আরও পড়ুন: ভাইভায় উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি অনিশ্চিত ৩০০০ প্রার্থীর
এদিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফেনী একটি রেমিট্যান্সনির্ভর এলাকা হওয়ায় এখানকার মানুষের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং এটি শিক্ষার্থী হ্রাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়াও উচ্চ শিক্ষা অনাগ্রহ থাকায় পরিবারগুলো মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয় এবং অনেক শিক্ষার্থী অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না, যা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমার অন্য একটি কারণ।
অর্থনৈতিক চাপে পড়ালেখা ছেড়ে ওমানে দাগনভূঞা উপজেলার আরিফুর রহমান। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরিবারে আর্থিক সংকট থাকায় পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া ছিল অসম্ভব। ফলে বাধ্য হয়ে বিদেশে পাড়ি জমান তিনি। বর্তমানে তিনি ওমানে কাজ করছেন।
আরিফ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘একাদশে ভর্তি হয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু পরিবার চালাতে বিদেশে যেতে হয়। অর্থের অভাবে আর লেখাপড়া চালাতে পারিনি। এখন ওমানে কাজ করছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফেনী সদর উপজেলার এক শিক্ষক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, অনেক শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও মাঝপথে পড়া ছেড়ে দিচ্ছে। এদের এক বড় অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে, আবার কেউ কেউ পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অন্যদিকে, আলিম পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, যা মাদ্রাসা শিক্ষায় আগ্রহ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকে ইঙ্গিত করে।
ফেনী সরকারি কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ এনামুল হক খোন্দকার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ফেনী জেলা প্রবাসী-অধ্যুষিত হওয়ায় বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বেশি এটি বড় কারণ হতে পারে। এ ছাড়া একাদশ শ্রেণি থেকে অনেক ড্রপ আউট হয়ে যায়। ফলে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। এ ছাড়া ফেনীর গেল বছরের বন্যার একটি প্রভাব থাকতে পারে বলে আমি মনে করছি।’
আরও পড়ুন: জাবির আবাসিক হল থেকে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফী উল্লাহ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘পরীক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া ভবিষ্যতের জন্য ভালো ইঙ্গিত নয়। উচ্চশিক্ষায় অনীহা হয়ে ফেনীতে মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা, ছেলেদের অল্প বয়সে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। যার কারণে এমনটা হতে পারে।’
ফেনীর বন্যার কারণে পরীক্ষার্থী কমেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বন্যা অল্প সময়ের জন্য ছিল, তাই আমার মনে হয় না যে এটি পরীক্ষার্থী হ্রাসের বড় কোনো কারণ। যদি বন্যা দীর্ঘমেয়াদী হতো, তাহলে প্রভাব ফেলতে পারত। তবে বাস্তবতা হলো অনেক দরিদ্র পরিবার শিক্ষা খরচ বহনে আগ্রহী নয়, যার ফলে অনেক শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণি থেকেই ঝরে পড়ে। এসব বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া জরুরি।
অন্যদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ বলছেন প্রস্তুতি ভালো, কেউ বলছেন আরেকটু সময় পেলে ভালো হত। এদিকে এইচএসসি পরীক্ষা পেছানোর দাবিতে ঢাকায় কয়েক দফা আন্দোলন করেছিলেন পরীক্ষার্থীরা।
ফেনী সরকারি কলেজের পরীক্ষার্থী হোসেন রিফাত বলেন, ‘প্রস্তুতি মোটামুটি ভালোই। কলেজে রিভিশন ক্লাস অনেক সাহায্য করেছে। ভয় একটু আছে, তবে নিজের ওপর ভরসা রাখছি। ইনশাআল্লাহ ভালো কিছু হবে।’
সাবিহা অর্পা নামে অপর এক পরীক্ষার্থী বলেন, ‘গত বছর আমাদের এলাকায় পানি উঠেছিল, কয়েক মাস পড়া হয়নি। পরে আবার সব গুছিয়ে নিতে হয়েছে। যদি আরও কিছু সময় পেতাম ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারতাম।’
আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ফুল ছিঁড়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ-বাড়িঘরে আগুন: পুলিশসহ আহত ৩০
পরশুরাম সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম সৌরভ বলেন, প‘রীক্ষার প্রস্তুতি মোটামুটি ভালো। তবে আরও কয়েক দিন সময় পেলে আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারতাম।’
নুরুন নবী নামে এক শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে দিনরাত পড়ছে। কিন্তু গেল বছরের সরকার পতন আন্দোলন, ফেনীর বন্যা পরিস্থিতি থাকায় মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটেছে। তবে আবার সময়মতো পরীক্ষাও হচ্ছে এটা অনেক ভালো হয়েছে।’
এ প্রসঙ্গে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফী উল্লাহ বলেন, বর্তমানে আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে এবং কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা নেই। পরীক্ষা গ্রহণে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। করোনাভাইরাস সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষার্থীদের মাস্ক পরা এবং ব্যক্তিগতভাবে সচেতন থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রের অন্যান্য নিয়মাবলিও আগের মতোই কার্যকর থাকবে।