স্কুলে ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি বাতিল নিয়ে কেন এত বিতর্ক?

১৭ মার্চ ২০২৬, ০৮:০৬ PM
বই হাতে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা

বই হাতে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা © সংগৃহীত

বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান লটারি পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার পর এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক দেখা দিয়েছে সচেতন মহলে।

অনেকেই প্রথম শ্রেণিসহ শিক্ষা জীবনের শুরুর কয়েকটি শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার বিরোধিতা করে বলছেন ওই বয়সের শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেওয়া অনুচিত। তারা ‘এন্ট্রি লেভেলে’ শিশুদের ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করছেন।

আবার কেউ বলছেন, প্রথম শ্রেণি বা পরবর্তী আরও কয়েকটি শ্রেণির শিশুদের বয়স উপযোগী করেই ওইসব ক্লাসের ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে।

তবে লটারি পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে এখন প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য কোচিং বাণিজ্য আরও রমরমা হয়ে উঠতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে 'ভালো স্কুল' হিসেবে পরিচিতি পাওয়া স্কুলগুলোর শিক্ষকদের কেউ কেউ এসব বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ার অনেক উদাহরণ আছে ।শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা তাই বলছেন, কেজি ও প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি থাকা যৌক্তিক হবে না।

আবার কেউ বলছেন, পুরো ভর্তি প্রক্রিয়া হওয়া উচিত 'ক্যাচমেন্ট এরিয়া' ভিত্তিক অর্থাৎ যেই এলাকার শিশু সেই এলাকার স্কুলে ভর্তি হবে এবং সব স্কুলে মানসম্মত শিক্ষকসহ সমান সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত সরকারের।

লটারি শুরু থেকেই আলোচনায়

বাংলাদেশে ২০১০ সালে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত প্রাথমিক স্কুলগুলোতে প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ছাত্র ভর্তি করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে তখন বলা হয়েছিল যে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি হবে পরীক্ষার মাধ্যমেই।
তখন সরকার এর পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেছিল, "যে শিশু শিক্ষাজীবন শুরুই করেনি তাকে ভর্তি পরীক্ষায় বসানোর কোন যুক্তি নেই। বরং উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমে ভর্তি করার কারণে, এক্ষেত্রে আর প্রভাব খাটানো সম্ভব হবে না"।

একই সঙ্গে তখন বলা হয়েছিল, লটারির মাধ্যমে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির পদ্ধতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না, কারণে এসব স্কুলে ভর্তির চাপ কম।

কিন্তু পরে কোভিড মহামারির সময়ে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে সারাদেশের সরকারি বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তির জন্য পরীক্ষা না নিয়ে ডিজিটাল লটারি করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ওই বছরেই বেসরকারি স্কুলে প্রথম থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তির লটারি পদ্ধতি চালু হয়।

ওদিকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সবশেষ স্কুল ভর্তির যে নীতিমালা সংশোধন করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, 'জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ অনুযায়ী ১ম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর বয়স ন্যূনতম ধরে ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাবর্ষের ১লা জানুয়ারি তারিখে শিক্ষার্থীর সর্বনিম্ন বয়স ৫ বছর এবং ৩১ ডিসেম্বর তারিখে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত হবে'।

এখন বিশেষজ্ঞরা এবং অনেক অভিভাবক মনে করছেন, ৫-৭ বছর বয়েসী একটি শিশুকে তার শিক্ষাজীবনের প্রথম ক্লাসটিতে ভর্তির জন্য পরীক্ষার টেবিলে বসতে বাধ্য করা উচিত হবে না।

শিক্ষামন্ত্রী যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন

সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রচলিত লটারি পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্তের কথা জানান।

"আমরা লটারি পদ্ধতি প্রত্যাহার করলাম। দ্যাটস ইট। লটারি কোনো শিক্ষা ব্যবস্থায় থাকতে পারে না। ভর্তি পরীক্ষা যেটা হয় সেটায় লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি," বলেছেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "লটারি কি শিক্ষার কোনো মাপদণ্ড হতে পারে ? লটারি ভর্তির সমাধান নয়। আমরা ব্যাপক আলোচনার মধ্য দিয়ে করেছি। গত একমাস ধরে আলোচনা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি"।

শিশুদের ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে যে সমালোচনা সেই প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, "ক্লাস ওয়ানে মেধা যাচাইয়ের প্রশ্ন আসে না। খুবই সিম্পল ওয়েতে পরীক্ষা নিবো। এমন কিছু আনবো না যা ওদের জন্য প্রযোজ্য নয়। লটারি কোনো শিক্ষা ব্যবস্থায় থাকতে পারে না"।

এর ফলে কোচিং বাণিজ্য শুরু হওয়ার উদ্বেগ প্রসঙ্গে করা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "কোচিং বাণিজ্য হবে না। এটা প্রাথমিক পর্যায়। আমরা তাদের পরীক্ষা নিবো। ক্লাস ওয়ানে আমরা নিউরোসার্জন বানানোর চেষ্টা করবো না"।

"শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে লটারি অনেকটা জুয়া খেলা, ভর্তিতে লটারি কোনো ব্যবস্থা হতে পারে না। ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে কেউ কোচিং বাণিজ্য করতে চাইলে সরকার বসে থাকবে না। সরকার ইনহাউজ কোচিংয়ের ব্যবস্থা করবে," বলেছেন মন্ত্রী।

মন্ত্রীর ঘোষণায় তীব্র প্রতিক্রিয়া


শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ বিষয়ে তাদের মতামত জানিয়েছেন সামাজিক মাধ্যমে।

এসব প্রতিক্রিয়ার বেশিরভাগই মূলত প্রথম শ্রেণিতে কোনো ধরনের পরীক্ষা পদ্ধতির বিরোধিতা করেছেন। যদিও তাদের সবাই যে লটারি পদ্ধতি সমর্থন করছেন তাও নয়।

বরং তাদের বক্তব্য হলো এন্ট্রি ক্লাস অর্থাৎ শিক্ষা জীবনের প্রথম ক্লাসটিতে ভর্তির জন্য শিশুদের যেন কোনো প্রতিযোগিতা বা লড়াইয়ে নামতে না হয় সেটি নিশ্চিত করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কামরুল হাসান মামুন তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, "যারা ভর্তি পরীক্ষা চায় তারা কোচিং ব্যবসা চায়। আর কারা কোচিং ব্যবসা দিয়ে রাজনীতি করে আমরা জানি। যারা লটারি চায় তারা সব স্কুল কলেজকে এক মানের করতে ব্যর্থতা ঢাকতে ধান্দাবাজি করে"।

তিনি আরও লিখেছেন, "সমস্যার কারণ মেরামত না করলে লটারি থাকবে না ভর্তি কোচিং থাকবে এই বিতর্ক থাকবেই। লটারি থাকবে এবং ভর্তি কোচিং কোনটিই থাকা উচিত না। বিশেষ করে প্রাথমিক স্কুলে বা প্রাথমিক ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মেধাবী ট্যাগ দেওয়া অসভ্যতা"।

শামারুহ মির্জা লিখেছেন, "ক্লাস ওয়ান এর বাচ্চা পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হবে? আশা করছি হবে না। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া কোথাও এন্ট্রি লেভেলে ভর্তি পরীক্ষা হয় না"।

তিনি আরও লিখেছেন, "... কম্পিটিশন ভালো, কিন্তু ক্লাস ওয়ান এ? এখন কোচিং সেন্টারগুলোও ঝাঁপিয়ে পড়বে ক্লাস ওয়ান এর বাচ্চাদের উপরে!"

ওদিকে ভিকারুননিসা স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থীদের সংগঠন ভিকারুননিসা অ্যালামনাই এসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে লটারি পদ্ধতি বাতিলের দাবি করে মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন চালুর দাবি জানিয়েছে।

"প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের সূচনা। তাই শুধুমাত্র লটারির উপর নির্ভর না করে একটি মানবিক, পর্যবেক্ষণভিত্তিক এবং স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা হলে তা শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য অধিক কার্যকর হতে পারে," বিবৃতিতে বলেছে সংগঠনটি।

কানাডা প্রবাসী লেখক ও গবেষক ডঃ মঞ্জুরে খোদা টরিক তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় লিখেছেন, "শিশুশিক্ষা বা প্রথম শ্রেণিতে যারা ভর্তি হয় তাদের বয়স ৪ থেকে ৬ বছরের মধ্যে। এই সময় শিশুরা কেবল তাদের মত করে কথাবার্তা ও যোগাযোগ করতে শেখে। শিশুরা তখন প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ, পরিবার ও সমাজের সাথে পরিচিত হতে থাকে। তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি এমন পর্যায়ে থাকে না যে তাদের মেধা ও জানা-শোনা পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই যোগ্য। সেটা করা মানে শিশুদের প্রতি অবিচার ও অভিভাবকদের জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করা"।

তার মতে, "বাংলাদেশের এই প্রচলিত অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি থেকে বেড়িয়ে আসতে "জোনিং বা ম্যাপিং স্কুল সিস্টেম" চালু করতে হবে। যে, যে এলাকায় বাস করে, তাকে সেই এলাকার স্কুলে যেতে, পড়তে বাধ্য করতে হবে। এক এলাকার ছেলেমেয়ে অন্য এলাকায় যেতে বা পড়তে পারবে না"!

"প্রস্তুতিমূলক বা ক্লাস ওয়ানে তো কোনো শিশুর কিছু শিখে আসার কথা নয়। কারণ এখান থেকেই তাদের শিক্ষাজীবন শুরুর কথা। ওখানে ভর্তি পরীক্ষা থাকার মানে হলো কোচিংকে সুবিধা দেওয়া। আবার সেটি হলে গরীব পরিবারের শিশুরা সেই সুযোগ পাবে না। ধনী গরীব, শহর, গ্রাম-- সবার জন্য লটারি একটা সুযোগ হতে পারে ক্লাস ওয়ানের জন্য," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

তিনি বলেন, সব শিশুরই ভর্তির সুযোগ পাওয়া উচিত কিন্তু কথিত ভালো স্কুলে পড়ার জন্য প্রাইভেট টিউটর দিয়ে বা কোচিং করে প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিতে আসতে হবে এটা সুস্থ চিন্তা না।

শিক্ষা বিষয়ক আরেকজন বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলছেন, লটারি বা ভর্তি পরীক্ষা- দুটির কোনো সিস্টেমই ভালো নয়। বরং তার মতে, ক্যাচমেন্ট এরিয়া (স্কুল সংলগ্ন এলাকা) অনুযায়ী ভর্তির ব্যবস্থা করা উচিত।

"স্কুলগুলোর মান উন্নত করা দরকার যাতে করে শিক্ষার্থীরা নিজের এলাকার স্কুলে পড়তে পারে। তাহলে মিরপুর থেকে এসে ভিকারুননিসায় সন্তানকে ভর্তি করানোর চেষ্টা বন্ধ হবে। বাচ্চাদের সব শিখিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় বসানো কিংবা লটারির মাধ্যমে ভাগ্য নির্ধারণ-কোনোটাই উচিত নয়," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

ইসরায়েল ও মার্কিন সংবাদমাধ্যম ট্রাম্পকে ‘ভুল পথে পরিচালিত …
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ নেবে শিক্ষক-প্রদর্শ…
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
জুলাই গণ-আন্দোলন: ন্যারেটিভ, সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় বৈধতা
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল পর হাতিয়ার ইউএনওকে ওএসডি
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
‘শক্তিশালী’ ইহুদি লবির চাপে ইরানে আগ্রাসন চালিয়েছে যুক্তরাষ…
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে যেসব নির্দেশনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী
  • ১৭ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence