প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা: শিশুর শৈশবকে অক্ষুণ্ন রেখে যেভাবে নেবেন প্রস্তুতি

২৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৭ PM
লেখক

লেখক © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, লটারির পরিবর্তে পুনরায় ১ম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা চালু হতে যাচ্ছে। একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে আপনার মনে উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ এবং সন্তানকে একটি ভালো স্কুলে ভর্তি করানোর তাড়না থাকাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। আমাদের দেশে মানসম্মত স্কুলের অভাব এবং তার কারণে প্রতিযোগিতামূলক আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এই উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। তবে মনে রাখতে হবে, মাত্র ৬-৭ বছরের একটি শিশুর জন্য এই পরীক্ষা যেন কোনোভাবেই মানসিক ট্রমা বা ভয়ের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।

এই বয়সে শিশুর বিকাশের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ‘আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষা’। প্রতিযোগিতার বাজারে সন্তানকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি তার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রেখে কীভাবে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া যায়, সে বিষয়ে একটি গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো।

পড়াশোনা ও অ্যাকাডেমিক প্রস্তুতি: মুখস্থ নয়, ধারণার স্পষ্টতা জরুরি
১ম শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষায় খুব কঠিন কিছু জানতে চাওয়া হয় না, বরং প্রাক-প্রাথমিক স্তরের মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর শিশুর দখল কেমন, তা যাচাই করা হয়।

ভাষা: বাংলা ও ইংরেজি বর্ণমালা শুধু মুখস্থ বলা ও লেখার চেয়ে, বর্ণ চেনার ওপর বেশি জোর দিতে হবে। যেমন— এলোমেলো বর্ণ সাজিয়ে লেখা, অনেকগুলো ভিন্ন বর্ণের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি বর্ণ খুঁজে বের করা, ছবি দেখে ছবির নামের প্রথম বর্ণটি বলা, ছবির সাথে ছবির নামের প্রথম বর্ণটির মিল করা। যেমন— বামপাশে কলা, খরগোশ, গরু, ঘড়ি ইত্যাদির ছবি দেওয়া আছে আর ডান পাশে এলোমেলোভাবে ক, খ, গ, ঘ দেওয়া আছে। কলা, খরগোশ, গরু, ঘড়ি ইত্যাদির ছবির সাথে ছবির নামের প্রথম বর্ণটির মিল করবে। এজন্য শিশুকে বর্ণানুক্রমিক পদ্ধতিতে না শিখিয়ে বাক্যানুক্রমিক পদ্ধতিতে বর্ণ শেখাতে পারেন। এতে শিশুর শিখন কার্যকর ও স্থায়ী হবে। এছাড়া এগুলো নিয়মিত অনুশীলনের জন্য বিভিন্ন ওয়ার্কশিট প্রস্তুত করে দিলে শিক্ষার্থীরা প্র্যাকটিস করতে পারবে। শিশুর শব্দভাণ্ডার বাড়াতে প্রতিদিন নিয়মিত ছোট ছোট ছড়া ও গল্প পড়ে শোনাতে পারেন।

গণিত: সংখ্যা গণনা ও লেখার পাশাপাশি ‘সংখ্যাগত ধারণা’ তৈরি করুন। পরিচিত বস্তু দিয়ে গণনা শেখাতে পারেন। যেমন— ঘরে কয়টি চেয়ার আছে, সিঁড়িতে ওঠার সময় প্রতিটি ধাপে শিশুকে জোরে জোরে ১, ২, ৩…… বলানো যেতে পারে। হাতের আঙুল দিয়েও গণনা শেখানো ও যাচাই করা যায়। তুলনার ক্ষেত্রে ছোট-বড়, কাছে-দূরে, লম্বা-খাটো, হালকা-ভারী ইত্যাদির ধারণা আশপাশের পরিচিত বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে দিতে পারেন। যোগ-বিয়োগের ক্ষেত্রেও একই কথা, শুধু মুখস্থ ও খাতা-কলমে লিখিত ধারণা না দিয়ে দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত বস্তু দিয়ে শেখানো ও যাচাই করা ভালো। যেমন— মুখস্থ ২+৩=৫ না শিখিয়ে ৫টি কাঠি বা মার্বেল দিয়ে যোগ-বিয়োগের ধারণা দেওয়া। এগুলো বাস্তব উপকরণের মাধ্যমে শেখালে শিশুর মনে থাকবে এবং পরীক্ষায় ভুল করবে না।

নিজের পরিচয় ও মৌলিক সাধারণ জ্ঞান: শিশু যেন নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম, নিজের বয়স, বাসার ঠিকানা এবং বাবা-মায়ের মোবাইল নম্বর স্পষ্ট করে বলতে ও লিখতে পারে। এছাড়া আমাদের জাতীয় প্রতীকসমূহ (যেমন: জাতীয় ফুল, ফল, পাখি), চারপাশের পরিচিত পশুপাখি, ফলমূল ও রঙের নাম তাকে খেলার ছলে শেখান।

শিশুর পড়াশোনা মানেই টেবিল-চেয়ার আর খাতা-কলম নয়। তাকে রান্নাঘরে আলু গুনতে দেওয়া, কিংবা দেয়ালে থাকা ক্যালেন্ডারের তারিখ খুঁজে বের করা, বাজারে নিয়ে বিভিন্ন শাকসবজি, ফলমূলের ধারণা দেওয়া, হাঁটতে হাঁটতে ছোট-বড়, কাছে-দূরে ইত্যাদি খেলার ছলে শেখান এবং অনুশীলন করান। আর পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য রঙিন অ্যাক্টিভিটি শিট দিয়ে অনুশীলন করান।

মানসিক সাপোর্ট
এই বয়সের শিশুরা বাবা-মায়ের মানসিক অবস্থা খুব দ্রুত বুঝতে পারে। আপনি যদি চিন্তিত থাকেন, তবে শিশুও একধরনের অদৃশ্য চাপ অনুভব করবে, যা তার পরীক্ষার পারফরম্যান্স নষ্ট করতে পারে। তা ছাড়া অনেক বাবা-মা নিজে স্ট্রেস নেওয়ার পাশাপাশি শিশুকেও চাপ দেন, যা একেবারেই অনুচিত। এই ছোট্ট বয়সে অতিরিক্ত চাপ তার মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পুরো প্রক্রিয়াটি খুব সতর্কতার সাথে, বাড়তি চাপ না দিয়ে, আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে শিশুর মতো করেই পরিচালনা করতে হবে। কখনোই পড়তে বসার জন্য বা লেখার জন্য অতিরিক্ত চাপ দেওয়া যাবে না।

শিশুর সামনে ‘পরীক্ষা’, ‘পাস-ফেল’ বা ‘ভর্তি হতে না পারলে মান-সম্মান যাবে’ এই জাতীয় শব্দ একদম ব্যবহার করবেন না। এটিকে নতুন স্কুলে যাওয়ার আনন্দের অভিজ্ঞতা বা নতুন বন্ধু পাওয়ার সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করুন। অন্য কোনো আত্মীয় বা শিশুর সাথে কোনোভাবেই তুলনা করা যাবে না।

অনেক সময় শিশু সব পেরেও পরীক্ষার হলে অপরিচিত শিক্ষক বা পরিবেশ দেখে ভয় পেয়ে কান্নাকাটি করে এবং কিছু লেখে না। সেজন্য ঘরে মাঝেমধ্যে অপরিচিত কাউকে (যেমন কোনো আত্মীয় বা প্রতিবেশী) শিক্ষকের ভূমিকায় বসিয়ে ছোটখাটো ২০-৩০ মিনিটের পরীক্ষা নেওয়ার অভিনয় করুন। এতে অপরিচিত মানুষের সামনে কথা বলা বা লেখার জড়তা কাটবে। আর লিখিত বিষয়ের জন্য পূর্ণাঙ্গ মডেল টেস্ট প্রস্তুত করে অনুশীলন করাতে পারেন। কয়েকটি মডেল টেস্ট নেওয়ার পর আস্তে আস্তে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে বলুন, তাতে পরীক্ষার হলে সময়মতো শেষ করার অনুশীলন হয়ে যাবে। মডেল টেস্টে ভালো না করলে বকাবকি না করে উৎসাহ দিন, যেসব বিষয়ে ভুল হচ্ছে সেগুলো চিহ্নিত করে বারবার অনুশীলন করান।

ভয়ভীতি নয়, প্রেষণা দিন
মনোবিজ্ঞানে ‘পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট’ বা ইতিবাচক পুনর্বলন শিশুর ভালো আচরণ ও প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিশুকে আশ্বস্ত করুন যে সে পরীক্ষায় কেমন করল, তার ওপর আপনার ভালোবাসা নির্ভর করে না। তাকে বলুন, তুমি চেষ্টা করছ, এটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে আনন্দের। চান্স পাওয়া বা না পাওয়া বড় বিষয় নয়। শিশুকে ভয় দেখালে (যেমন— চান্স না পেলে খবর আছে, বা ভালো স্কুলে ভর্তি হতে না পারলে তোমার সাথে কথা বলব না) তার মস্তিষ্কে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়, যা তার মনোযোগ ও স্মৃতিধারণ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে ব্যাহত করে। তার চেয়ে তাকে বলুন, এই স্কুলে ভর্তি হলে তোমার অনেক নতুন বন্ধু হবে, তুমি তাদের সাথে খেলতে পারবে। শিশু কোনো লেখা সুন্দর করে লিখলে বলুন, বাহ! তুমি অনেক মনোযোগ দিয়ে চেষ্টা করেছ, তাই লেখাটা সুন্দর হয়েছে। তুমি পরীক্ষায় অনেক ভালো করবে, এভাবে উৎসাহ দিন।

স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংক্রান্ত
পরীক্ষার প্রস্তুতির এই সময়ে শিশুর পুষ্টির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। অপুষ্টি বা অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড শিশুর মনোযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। শিশুর খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন ডিম, দুধ, বাদাম এবং সবুজ শাকসবজি রাখুন। অতিরিক্ত মিষ্টি, চিপস বা সফট ড্রিংকস শিশুকে সাময়িকভাবে চঞ্চল করে তোলে, কিন্তু পরবর্তীতে তার মনোযোগ কমিয়ে দেয়। ভর্তি পরীক্ষার চাপে শিশুর স্বাভাবিক শৈশব, অর্থাৎ খেলাধুলা, যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়। প্রতিদিন বিকেলে অন্তত এক ঘণ্টা শিশুকে মাঠে বা খোলা জায়গায় সমবয়সীদের সাথে দৌড়াদৌড়ি করে খেলতে দিন।

শারীরিক কসরত মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায়, যা শিশুর মনোযোগ ও পড়াশোনার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। শিশুর হাতে কোনোভাবেই মোবাইল বা ট্যাব তুলে দেওয়া যাবে না। মোবাইল, টিভি, কার্টুনের মতো ডিজিটাল বিনোদনের চেয়ে ছবি আঁকা, ক্লে দিয়ে ক্রাফটিং করা, ব্লক দিয়ে ঘর বানানোর মতো সৃজনশীল কাজে তাকে ব্যস্ত রাখুন। এতে তার হাতের আঙুলের পেশি শক্তিশালী হবে, যা দ্রুত ও সুন্দর লেখার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এ ছাড়া প্রস্তুতির এই সময় নিয়মিত রাতে অন্তত ৮-৯ ঘণ্টা নিশ্ছিদ্র ঘুম নিশ্চিত করুন। ঘুম মস্তিষ্কে সারা দিনের শেখা বিষয় গুছিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

পরিশেষে, অভিভাবক হিসেবে আপনার সন্তান কোন স্কুলে পড়বে, তা নিয়ে আপনার স্বপ্ন থাকাটা অন্যায্য নয়। তবে মনে রাখবেন, এটি যেন কোনোভাবেই শিশুর জন্য অতিরিক্ত চাপ না হয়ে যায়। খুবই সাধারণ ও মৌলিক বিষয়গুলো আনন্দদায়ক পদ্ধতিতে শেখানো এবং নিয়মিত অনুশীলন করানোর মাধ্যমে আপনি তাকে যেকোনো ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে সক্ষম হবেন। আপনার ধৈর্য, ভালোবাসা এবং সঠিক দিকনির্দেশনাই তার জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষাটিকে একটি সফল ও আনন্দময় অভিজ্ঞতায় রূপ দেবে। এই প্রত্যাশায়…।

মেহেদী হাসান
এডুকেশন প্রফেশনাল 
সাবেক শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যাত্রীবেশে ইজিবাইক ছিনতাইচেষ্টা, অস্ত্রসহ তিন সদস্য গ্রেপ্ত…
  • ২৬ জুলাই ২০২৬
কুকুর পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
  • ২৬ জুলাই ২০২৬
চমক রেখে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টের দল ঘোষণা বিসিবির
  • ২৬ জুলাই ২০২৬
হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণে যুবদলের পদবঞ্চিতদের মানববন্ধন গু…
  • ২৬ জুলাই ২০২৬
৬ মাসে একদিনও অফিস করেননি খুলনা বক্ষব্যাধি হাসপাতাল তত্ত্বা…
  • ২৬ জুলাই ২০২৬
দুই কারণে আটকা ৯ম শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি
  • ২৬ জুলাই ২০২৬