সফিকুলের ৪ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্সের গল্প

কোচিংয়ে ক্লাসের সময় শুধু ভাবতাম, চারপাশে কত স্মার্ট-ট্যালেন্টেড ছাত্র-ছাত্রী, আমি কি পারব?

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০৮ PM , আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৮ PM
সফিকুল ইসলাম

সফিকুল ইসলাম © টিডিসি সম্পাদিত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের মার্কেটিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. সফিকুল ইসলাম। পিএসসিতে জিপিএ ৩.২৫, জেএসসিতে ২.৬২ ও এসএসসিতে ৩.৮৩ পেয়েছিলেন তিনি। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় উচ্চশিক্ষার পথটাও তার জন্য সহজ ছিল না। এসএসসির পর একপর্যায়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। তবে পরিবারের আর্থিক অবস্থা বদলানোর সংকল্প থেকে নতুন করে পড়াশোনায় মনোযোগ দেন। এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে নিজ উপজেলায় প্রথম হওয়ার পর ভর্তি পরীক্ষায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান তিনি।

নিজের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময়কার অভিজ্ঞতা জানিয়ে সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কোচিংয়ে ভর্তির পর কোচিংয়ে যখন ক্লাস করতে যেতাম তখন আশেপাশের ছাত্র-ছাত্রীদের দেখতাম আর আমি হতাশ হয়ে পড়তাম। আমি ভাবতাম, তারা কত স্মার্ট, কত ট্যালেন্টেড, তাদের মধ্যে থেকে আমি কি পারব?’

তবে সেই হতাশাকেই পরে নিজের অনুপ্রেরণায় পরিণত করেন তিনি। সফিকুল বলেন, ‘একসময় এই বিষয়কেই আমি মোটিভেশনে রূপান্তরিত করলাম। তারা যদি পারে আমি কেন পারব না? আমিও পারব, আমাকে পারতেই হবে। তারাও মানুষ, আমিও মানুষ। আমার ভেতরে তখন একটা জেদ কাজ করল। এভাবে নিজেকে মোটিভেট করতাম এবং তুমুল হারে পড়াশোনা করতে লাগলাম। এককথায় জরুরি প্রয়োজনীয় কাজের সময় বাদ দিয়ে বাকি সময়টুকু পুরোটাই পড়াশোনার মধ্যে থাকতাম।’

সফিকুলের পড়াশোনার শুরুটা অবশ্য এমন ছিল না। প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত নিজেকে সাদামাটা শিক্ষার্থী হিসেবেই মনে করতেন তিনি। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিল না। ফলে পিএসসিতে ৩.২৫, জেএসসিতে ২.৬২ এবং এসএসসিতে ৩.৮৩ জিপিএ পান।

তিনি বলেন, ‘আমার অ্যাডমিশন জার্নির কথা বলতে গেলে আমাকে প্রথম থেকে শুরু করতে হবে। শুরু থেকে বলতে গেলে একদম প্রাইমারি লেভেল থেকে। প্রাইমারি থেকে হাইস্কুল পর্যন্ত আমি একদম সাদামাটা একজন ছাত্র ছিলাম। অন্যরা স্কুলে যেত তাই আমিও যেতাম। লেখাপড়া করে কী করব না করব কিছুই তখন মাথায় আসেনি। আমার পরিবারের অবস্থাও ভালো ছিল না, বলা যায় নিম্নবিত্ত।’

তিনি বলেন, এসএসসি রেজাল্ট পাওয়ার পর আমার এক বন্ধুর দেখাদেখি আমি প্রাইভেট পলিটেকনিকে ডিপ্লোমা করার সিদ্ধান্ত নিই। যেহেতু আমার এসএসসি রেজাল্ট খারাপ ছিল, সেক্ষেত্রে আমার ভালো কোনো সরকারি কলেজ বা সরকারি পলিটেকনিকে ভর্তি হওয়ার বা চান্স পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই আমি এই সিদ্ধান্তটি নিই। কিন্তু সিদ্ধান্তের কথা পরিবারকে জানালে তারা একবারে না করে দেয়। কারণ একটা প্রাইভেট পলিটেকনিকে ডিপ্লোমা করতে গেলে ৪ বছরে মিনিমাম ৪-৫ লক্ষ টাকা লাগবে। যেটা আমার পরিবারের পক্ষে বহন করা কোনোদিন সম্ভব নয়। থাকার এবং খাওয়ার খরচ তো আছেই।’

পরিবারের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েকদিন পড়াশোনা না করার জেদ ধরেছিলেন সফিকুল। পরে বড় ভাই তাকে স্থানীয় একটি কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন। ধীরে ধীরে পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি উপলব্ধি করে নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন তিনি।

সফিকুল বলেন, ‘কিছুদিন যাওয়ার পর আমার পরিবারের অবস্থা আমি ভাবতে থাকি। আমি তখন বুঝতে পারি, আমার পরিবারের এই অবস্থা থেকে আসলেই এত টাকা বহন করা সম্ভব ছিল না। এত টাকা আমার পিছনে খরচ করতে গেলে আমার পরিবারকে দিনে একবার না খেয়ে থাকতে হবে।’

এরপর পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তনের জন্য ভালোভাবে পড়াশোনা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কলেজের প্রথম বর্ষেই প্রথম ‘অ্যাডমিশন’ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত হন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার লক্ষ্য ঠিক করেন।

এইচএসসি পরীক্ষা শেষে গ্রামের বাড়ি থেকে শহরে গিয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য পরিবারকে রাজি করান সফিকুল। তার পরিবারের কেউই তখন বিশ্ববিদ্যালয় বা ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে খুব বেশি জানতেন না। তবে তার আগ্রহ দেখে পরিবার তাকে সমর্থন করে।

শহরে এসে একটি কোচিংয়ে ভর্তি হওয়ার পর শুরু হয় তার ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। নির্দিষ্ট কোনো রুটিন না থাকলেও কীভাবে বেশি সময় পড়াশোনা করা যায়, সেটিই ছিল তার লক্ষ্য। কোচিংয়ের দৈনিক ও সাপ্তাহিক পরীক্ষাগুলোতে ১০০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায়ই প্রথম পাঁচজনের মধ্যে থাকতেন।

একপর্যায়ে তার ভালো ফল দেখে কোচিংয়ের এক শিক্ষক তাকে অফিসে ডেকে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি তো নিয়মিত পরীক্ষায় অন্য ছাত্র-ছাত্রীদের তুলনায় অনেক ভালো করতেছ। তুমি পরীক্ষায় নকল করতেছ নাকি?’

ঘটনাটিতে হতাশ হলেও সেটিকেও নিজের জেদে পরিণত করেন সফিকুল। তিনি বলেন, ‘বিশ্বাস করেন, এই কথাটি শোনার পর আমি এমনভাবে আশাহত হয়েছিলাম তা বলার বাইরে। আমি এই কথাটা বিন্দুমাত্র প্রত্যাশা করিনি। কথাটা শোনার পর আমি অনেক রাগী হয়ে প্রকাশ্যে শুধু বলেছিলাম, "না, স্যার।" কিন্তু মনে মনে বলেছিলাম, "খেল তো আভি বাকি হে!"’

এর মধ্যেই এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। জিপিএ-৫ পাওয়ার পাশাপাশি নিজ উপজেলায় প্রথম হন তিনি।

কোচিংয়ের একটি পরীক্ষার ঘটনাও এখনও মনে আছে তার। তিনি বলেন, একটা কথা আমার আজও মনে আছে, নিয়মিত পরীক্ষার মতো একদিন কোচিংয়ে পরীক্ষা নিয়েছিল ১০০ মার্কসের। আমি ১০০ মার্কসের মধ্যে ওইদিন ৮৫.২৫ মার্কস পেয়েছিলাম এবং বাকি সবাই ৫০ মার্কসের নিচে। সেইদিন কোচিংয়ের একজন শিক্ষক সবার সামনে আমাকে দাঁড় করিয়ে বলেছিলেন, তোমাদের সবার মধ্যে থেকে কারও যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার যোগ্যতা থাকে সেটা হচ্ছে আমি। তিনি ১০০ পার্সেন্ট শিওর হয়ে বলেছিলেন, আমি অবশ্যই কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবই। সেদিন ওনার এই কথাগুলো শুনে আমি যে কী পরিমাণ খুশি হয়েছিলাম সেটা আর কী বলব!

এরপর একে একে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন সফিকুল। শেষ পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় তার অবস্থান ছিল ২৭৪১তম।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার মুহূর্তটি ছিল তার জন্য বিশেষ আনন্দের। সফিকুল বলেন, ‘প্রথম যখন আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাই তখন আমি যে কী পরিমাণ খুশি হয়েছিলাম। খুশিতে আমি সেদিন কান্না করে দিয়েছিলাম। আর সর্বপ্রথম আমি আমার বড় ভাইকে এই খবরটি জানাই। কারণ আমার বড় ভাইয়ের অবদান আমার জীবনে যে কী সেটা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।’

ভর্তি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে সফিকুল বলেন, ‘কখনও নিজের যোগ্যতা অন্যের যোগ্যতার সাথে তুলনা করতে যাবেন না। সবসময় প্রতি আত্মবিশ্বাস রাখবেন। অন্যজন পারলে আপনিও পারবেন ইনশাআল্লাহ।’

প্রস্তুতির ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে পড়াশোনার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘অ্যাডমিশন সময়ে যখন একা একাই প্রিপারেশন নেওয়া শুরু করতে যান তখন হয়তো প্রিপারেশনটা এলোমেলো হয়ে যায়। আজ একটা পড়তেছেন, কাল আরেকটা পড়তেছেন। আসল কথা কোনো সিকুয়েন্স খুঁজে পান‌ না। তাই আমার ব্যক্তিগতভাবে সাজেশন থাকবে কোনো একটা কোচিংয়ে ভর্তি হওয়া। যাতে প্রিপারেশনটা সমানভাবেই আগায়।’

তবে কোচিংয়ে ভর্তি হলেই সাফল্য আসবে—এমন ধারণা না রাখার পরামর্শ তার। তিনি বলেন, ‘আর কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে কোনোদিন মনে করবেন না যে, কোচিং আপনাকে চান্স পাইয়ে দেবে। সবসময় মনে রাখবেন, আপনার একান্ত নিজের পড়াশোনা, পরিশ্রম শুধু আপনাকে চান্স পাইয়ে দেবে। আবার পরিশ্রম বলতে গাধার মতো পরিশ্রম করতে যাবেন না। পরিশ্রম করবেন কৌশলে।

সবশেষে ভর্তি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে সফিকুল বলেন,  অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করবেন না এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস রাখবেন। 

ঢামেক ও মুগদা মেডিকেলের সাবেক অধ্যাপক ডা. আফরিনা বেগম মারা …
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
লিজেন্ডস লিগে সাকিবকে মিস করবেন নাসির
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিক্ষকদের চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধি নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রীর …
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্বামীর পূর্ণ সমর্থন, সংসার-সন্তান আর পড়াশোনা সামলে আফরিনা …
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সেবার মান না বাড়ালে বাস কোম্পানির রুট পারমিট বাতিল: যোগাযোগ…
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাধারণ সেবাগ্রহীতার বেশে ভূমি অফিসে ডিসি ফরিদা
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬