অর্থের বিনিময়ে মিলছে এইচএসসির অতিরিক্ত উত্তরপত্রও © টিডিসি এআই সম্পাদিত
চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য এবং উত্তরপত্র বিতরণে ব্যাপক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান পরীক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে অতিরিক্ত উত্তরপত্র বরাদ্দ সব ক্ষেত্রেই ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয়। এই সিন্ডিকেটকে টাকা দিলেই হওয়া যাচ্ছে প্রধান পরীক্ষক। অর্থের বিনিময়ে মিলছে অতিরিক্ত উত্তরপত্রও।
অনুসন্ধানে প্রধান পরীক্ষক হওয়া একাধিক শিক্ষক এবং অতিরিক্ত উত্তরপত্র পাওয়া কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধান পরীক্ষক হওয়ার জন্য ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একজন উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মাধ্যমে ৫ হাজার টাকা করে ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ওই উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের কর্মচারীদের ৫০০ টাকা দিলে ৫০টি অতিরিক্ত উত্তরপত্র দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি উত্তরপত্র বিতরণ করা হয়েছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একাধিক সূত্র জানায়, একজন পরীক্ষকের জন্য সাধারণত ২৫০ থেকে ৩০০টি উত্তরপত্র বরাদ্দ দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থের বিনিময়ে অনেক বেসরকারি কলেজের শিক্ষক ৫০০ থেকে ৭০০টি পর্যন্ত উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব পেয়েছেন। এতে উত্তরপত্র মূল্যায়নের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে জানা গেছে, রাজবাড়ীর কালুখালী কলেজের মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০টি উত্তরপত্র গ্রহণ করেছেন। রাজবাড়ীর বহরপুর কলেজের একজন শিক্ষকও অতিরিক্ত উত্তরপত্র পেয়েছেন। এ ছাড়া রাজবাড়ীর একটি কলেজের একজন শিক্ষক ৫ হাজার টাকা দিয়ে প্রধান পরীক্ষক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একজন উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং তার দপ্তরের অফিস সহায়কদের অর্থ দিয়ে প্রধান পরীক্ষক ও অতিরিক্ত উত্তরপত্র পেয়েছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এইচএসসির খাতা বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে। আগামীকাল (শনিবার) বোর্ডে গিয়ে কাকে কতগুলো খাতা দেওয়া হয়েছে সেটি যাচাই করা হবে। এ ধরনের অনিয়মকে কোনো ভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।—অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান, চেয়ারম্যান, ঢাকা শিক্ষাবোর্ড
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ঢাকা কলেজের এক প্রভাষক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বাংলা, ইংরেজি ও আইসিটির মতো অধিক উত্তরপত্রের বিষয়গুলোতে বিতরণ ব্যবস্থাপনায়ও ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ছিল। উত্তরপত্র বিতরণের সময় প্রকৃত হিসাব অনুযায়ী বরাদ্দ না দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে কম খাতা দেওয়া হয়। পরে অর্থের বিনিময়ে অতিরিক্ত উত্তরপত্র বিতরণের সুযোগ তৈরি করা হয়। এমনকি প্রাথমিক বরাদ্দ শেষ হওয়ার পর আবারও ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে শিক্ষকদের ফোন দিয়ে অতিরিক্ত উত্তরপত্র নেওয়ার জন্য ডাকা হয়েছে।’
সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের একজন প্রভাষক বলেন, চায়ের দোকানদারকে দিয়ে যেমন উত্তরপত্র মূল্যায়ন করালে শিক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংস অনিবার্য, তেমনি যোগ্যতা ও নীতিমালা উপেক্ষা করে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করানোও শিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, উত্তরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে শিক্ষার্থীরা ন্যায্য মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হবে। তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছ নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন।
এছাড়াও বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, ২৫০ থেকে ৩০০টি উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য সাধারণত ১২ থেকে ১৫ দিন সময় দেওয়া হয়। একই সময়ে ৫০০ থেকে ৭০০টি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করলে যথাযথভাবে খাতা দেখা সম্ভব নয়। এতে শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, যারা উত্তরপত্র দেখার জন্য শিক্ষকদের দায়িত্ব দেবেন, তারা যদি সমঝোতা করেন তাহলে কিছুই ঠিক থাকে না। শিক্ষার্থীরাও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়ে যায়। এসব সংকট সমাধানে সরকার শক্ত নয়। মেরুদণ্ডওয়ালা ব্যক্তিরা শিক্ষকতা পেশায় কম আসছেন। দেশে কোনো শিক্ষানীতি নেই, শিক্ষা দর্শন নেই। সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল ছয় মাসের মধ্যে শিক্ষা কমিশন গঠন করার। কিন্তু পাঁচ মাসেও কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না।'
‘একজন পরীক্ষকের জন্য সাধারণত ২৫০ থেকে ৩০০টি উত্তরপত্র বরাদ্দ দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থের বিনিময়ে অনেক বেসরকারি কলেজের শিক্ষক ৫০০ থেকে ৭০০টি পর্যন্ত উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব পেয়েছেন।’
এদিকে সরকারি কলেজের বিসিএস ক্যাডার সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকদের মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ সরকারি কলেজ শিক্ষকদের বাদ দিয়ে তুলনামূলক জুনিয়র কিংবা বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের প্রধান পরীক্ষক ও পরীক্ষক হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এটি নিয়োগ নীতিমালা ও পেশাগত মর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই অভিযোগের সত্যতা মিলেছে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি (দ্বিতীয় পত্র), বিষয় কোড–২৬৮-এর পরীক্ষক তালিকা বিশ্লেষণে। তালিকা অনুযায়ী, প্রধান পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ১০ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন সরকারি কলেজের বিসিএস ক্যাডার শিক্ষক। অর্থাৎ মোটের ৪০ শতাংশ। অন্যদিকে ১০৩ জন পরীক্ষকের মধ্যে সরকারি কলেজের বিসিএস ক্যাডার রয়েছেন মাত্র ১৩ জন, যা প্রায় ১৩ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন আত্মীকৃত কলেজের কয়েকজন বিসিএস শিক্ষক যুক্ত করলেও এ সংখ্যা ২০ জনের বেশি হবে না।
এইচএসসির খাতা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ডের সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এইচএসসির খাতা বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে। আগামীকাল (শনিবার) বোর্ডে গিয়ে কাকে কতগুলো খাতা দেওয়া হয়েছে সেটি যাচাই করা হবে। এ ধরনের অনিয়মকে কোনো ভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।’