প্রতীকী ছবি © টিডিসি সম্পাদিত
মাধ্যমিক স্তরে এসএসসি পরীক্ষার জন্য নিবন্ধিত হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমে টিকে থাকতে পারেননি। বর্তমান এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ব্যাচভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নবম শ্রেণিতে থাকাকালে এসএসসি পরীক্ষার জন্য নিবন্ধন করেছিলেন ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯৯ শিক্ষার্থী। এরমধ্যে আগামী বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) থেকে শুরু হওয়া ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নিচ্ছেন মাত্র ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন। অর্থাৎ, উচ্চমাধ্যমিকে এসে ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৪৫৬ জনই নিয়মিত শিক্ষার ধারার বাইরে চলে গেছেন।
শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষায় নিয়মিত-অনিয়মিত মিলিয়ে ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীন অংশ নিয়েছিলেন ২০ লাখ ২৪ হাজার ১৯২ জন। এর বড় অংশটি ছিল ২০২২ সালে নবম শ্রেণিতে মাধ্যমিক ভর্তি হয়ে রেজিস্ট্রেশন করা শিক্ষার্থীরা। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ শিক্ষার্থী।
তবে ওই ব্যাচ থেকে একাদশ শ্রেণিতে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেছিলেন ১৪ লাখ ৯১ হাজার ৮৭২ জন। এদের মধ্যে দুই বছর পর ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে ফরম পূরণ করেছেন মাত্র ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন।
বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছর দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১২ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষার্থী ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৩ জন। বাকি ৩ লাখ ১৯ হাজার ৫৪৩ জন অনিয়মিত, প্রাইভেট অথবা এক বা একাধিক বিষয়ের মানোন্নয়ন পরীক্ষার্থী।
২০২৫ সালে আমরা মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার কারণ নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করি। সেখানে দেখা যায়, ছাত্রীদের ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল বাল্যবিবাহ। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল, শরীয়তপুর, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন উপকূলীয় জেলায় এ প্রবণতা বেশি। এছাড়া সিলেটের কিছু এলাকায় আর্থিক কারণও শিক্ষার্থীদের ঝড়ে পড়তে দেখা গেছে—অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার, সচিব, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড
ঝরে পড়ার শিক্ষার্থীদের লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন ৮ লাখ ৬৫ হাজার ৬০০ ছাত্রী এবং ৮ লাখ ৬ হাজার ৫৫৩ ছাত্র। এর বিপরীতে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নিচ্ছেন ৫ লাখ ২ হাজার ৮৬৫ ছাত্রী এবং ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৮৫৭ ছাত্র।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই বছরে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ছিটকে গেছেন ৩ লাখ ৬২ হাজার ৭৩৫ ছাত্রী এবং ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৯৬ ছাত্র। সংখ্যার বিচারে ছাত্রী ঝরে পড়ার সংখ্যা কিছুটা বেশি হলেও শতকরা হারের দিক থেকে ছাত্রদের অবস্থাই বেশি উদ্বেগজনক। ছাত্রদের ঝরে পড়ার হার ৪৪ দশমিক ৭২ শতাংশ, যেখানে ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৪১ দশমিক ৯১ শতাংশ।
শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টদের মতে, দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, বিদেশে পাড়ি জমানো, পরিবারের আয়-রোজগারে যুক্ত হওয়া, নিম্নমানের পাঠদান এবং শেখার ঘাটতি— এসব কারণই মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
এ বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘২০২৫ সালে আমরা মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার কারণ নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করি। সেখানে দেখা যায়, ছাত্রীদের ঝরে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল বাল্যবিবাহ। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চল, শরীয়তপুর, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন উপকূলীয় জেলায় এ প্রবণতা বেশি। এছাড়া সিলেটের কিছু এলাকায় আর্থিক কারণও শিক্ষার্থীদের ঝড়ে পড়তে দেখা গেছে।
চলতি বছরের পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটিকে আমরা সরাসরি ঝরে পড়া বলছি না। অনেক শিক্ষার্থী এ বছর পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি, কিন্তু ভবিষ্যতে তারা আবার পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। পরীক্ষায় অংশ না নেওয়ার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। যেমন- নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া, বিয়ে হয়ে যাওয়া কিংবা পরিবারের হঠাৎ আর্থিক সংকটের কারণে উপার্জনে যুক্ত হওয়া।’
শিক্ষা বোর্ড কোনো নির্দেশনা দিয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট কোনো বিদ্যালয়কে নয়, বরং যেসব অঞ্চলে এ ধরনের প্রবণতা বেশি, সেসব অঞ্চলকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। গত বছরের গবেষণা প্রতিবেদন আমরা মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলাম। তারা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে কাজ করেছে।’