বাবা-মায়ের সঙ্গে একমাত্র ছেলে বাস © সংগৃহীত
নেদারল্যান্ডসে চিকিৎসকদের সহায়তায় একসঙ্গে স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নিয়েছেন জান ও এলস দম্পতি। ২০২৪ সালের জুনে হসপিসে পাশাপাশি শুয়ে হাত ধরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তারা। বাবা-মায়ের এই শেষ মুহূর্তের সাক্ষী ছিলেন তাদের একমাত্র সন্তান বাস। বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেও একই সময়ে দুজনকে হারানোর শোক ও একাকিত্ব আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে সাংবাদিক লিন্ডা প্রেসলি তুলে ধরেছেন জান ও এলসের স্বেচ্ছামৃত্যুর সিদ্ধান্ত, তাদের শেষ যাত্রা এবং মৃত্যুর পর একমাত্র সন্তানের মানসিক অবস্থার কথা।
২০২৪ সালের জুনের এক সকালে নেদারল্যান্ডসের উত্তরাঞ্চলের একটি রৌদ্রোজ্জ্বল নৌবন্দরে বাবা-মায়ের ক্যাম্পার ভ্যানের পাশে গাড়ি নিয়ে পৌঁছান বাস। জান ও এলস দাম্পত্য জীবনের বেশির ভাগ সময় পানির ওপর কাটিয়েছেন। তারা নৌকায় বসবাস করতেন। বয়স সত্তরের কোঠায় পৌঁছানোর পর হাউসবোট সামলাতে অসুবিধা হওয়ায় ইয়ট ও ছোট নৌকার পাশে রাখা ক্যাম্পার ভ্যানকে বিকল্প হিসেবে বেছে নেন।
সেদিন বাবা-মাকে গাড়িতে তুলে যাত্রা শুরু করেন বাস। স্থানীয় একটি হসপিসে নিয়ে যাচ্ছিলেন তাদের। সেখানে চিকিৎসকদের সহায়তায় দুজন একসঙ্গে স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেবেন।
সকাল সাড়ে ১০টায় চিকিৎসকেরা জান ও এলসকে প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগ করেন। নেদারল্যান্ডসে এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ডুয়ো-ইউথানেশিয়া’ বা যুগল স্বেচ্ছামৃত্যু। দেশটিতে এটি বৈধ হলেও খুব বেশি প্রচলিত নয়। তবে প্রতিবছর আরও বেশি মানুষ এভাবে একসঙ্গে জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা ও আলঝেইমার্সের ভয়
হসপিসে যাওয়ার তিন দিন আগে জান ও এলস তাদের ক্যাম্পার ভ্যানে বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। জান নেদারল্যান্ডসের অভ্যন্তরীণ নৌপথে বছরের পর বছর পণ্য পরিবহনের কাজ করেছেন। দীর্ঘদিনের সেই পরিশ্রমের কারণে তিনি নিয়মিত শারীরিক ব্যথায় ভুগছিলেন। অন্যদিকে এলসের ডিমেনশিয়া ধরা পড়েছিল। তাদের স্বেচ্ছামৃত্যুর সিদ্ধান্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আলোচনার জন্ম দেয়।
দুই বছরেরও বেশি সময় পর সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তাদের একমাত্র সন্তান বাস। বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করলেও তিনি চেয়েছিলেন, তারা যেন আরও কিছুদিন বেঁচে থাকেন। এ জন্য সিদ্ধান্তটি পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত বাবা-মায়ের ইচ্ছাকে মেনে নেন। একই সময়ে দুজনকে হারানোর পর গভীর মানসিক যন্ত্রণা ও একাকিত্বের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে।
বাবা-মাকে নিয়ে হসপিসে যাওয়ার জন্য বাস নেদারল্যান্ডসের ফ্রিসল্যান্ড এলাকার সবুজ মাঠ ও খালের পাশ দিয়ে যাওয়ার একটি সুন্দর পথ বেছে নিয়েছিলেন।
বাস বলেন, ‘পুরো যাত্রাটাই আমার এখনো মনে আছে।’
গাড়ির পেছনের আসনে বসেছিলেন তার মা এলস। বাবা জান ছিলেন সামনের আসনে। শুরুতে তারা বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলছিলেন। বাসের মনে হয়েছিল, তার মা স্বেচ্ছামৃত্যুর সিদ্ধান্তের বিষয়ে বেশ দৃঢ় ছিলেন।
বাস বলেন, ‘আমার মা এ বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন। তিনি স্বেচ্ছামৃত্যু নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমার বাবা কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন।’
একপর্যায়ে জান ছেলেকে জিজ্ঞাসা করেন, তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কি না। বাবার এমন প্রশ্নে অবাক হন বাস। কারণ, তিনি ভেবেছিলেন, তার মা হয়তো শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধায় পড়তে পারেন।
বাস বলেন, ‘আমার মা সব সময় জীবনকে খুব উপভোগ করতেন। আমার মনে আছে, তিনি একবার বলেছিলেন, আমি ৮০ বছর, এমনকি ৯০ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচতে চাই।’
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক যন্ত্রণায় ভোগায় জান এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বেচ্ছামৃত্যুর কথা ভাবছিলেন।
গাড়িতে বাবাকে আশ্বস্ত করেন বাস। জান কিছুটা শান্ত হওয়ার পর তারা আর কথা বলেননি। গান শুনতে শুনতে এবং বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে হসপিসের দিকে এগিয়ে যান।
তবে এই যাত্রার আগের কয়েক মাস বাস বাবা-মাকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, যেন তারা আরও কিছুদিন থাকেন। আমি বলেছিলাম, শীতকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলে কেমন হয়? অথবা আগামী বছর পর্যন্ত?’
বিষয়টি নিয়ে বাস নিজেও দ্বিধায় ছিলেন। বাবা-মায়ের স্বেচ্ছামৃত্যুর সিদ্ধান্তকে ভুল মনে করতেন না। কিন্তু কোনোভাবেই তাদের হারাতে চাইছিলেন না।
বাস বলেন, ‘আমার বাবা ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে এই অবস্থার মধ্যে ছিলেন। হয়তো আরও কয়েক বছর এভাবে থাকতে পারতেন। কিন্তু আমার মনে হয়, আমরা যদি আরও এক বছর অপেক্ষা করতাম, তাহলে আমার মা সমস্যায় পড়ে যেতেন।’
কারণ, এলসের আলঝেইমার রোগ ক্রমেই বাড়ছিল। স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করতে দেরি করলে তার স্মৃতিশক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আরও কমে যেতে পারত। সে ক্ষেত্রে নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মানসিক সক্ষমতা তার আছে কি না, চিকিৎসকেরা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারতেন।
হসপিসে শেষ বিদায়
হসপিসে পৌঁছে গাড়ি পার্ক করেন বাস। তার বাবা গাড়ি থেকে নামার আগে গাড়িটিকে বিদায় জানান। বাসের গাড়িটি জানের পছন্দ ছিল।
বাস বলেন, ‘আমার বাবা গাড়িটিকে বিদায় জানিয়েছিলেন। তিনি গাড়িটি পছন্দ করতেন। তিনি বলেছিলেন, ভালো কাজ এবং ধন্যবাদ।’
এরপর তারা হসপিসের ভেতরে প্রবেশ করেন।
বাস বলেন, ‘একবার কল্পনা করে দেখুন, তাদের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে এমন একটি যাত্রা করা এবং হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করা কতটা কঠিন। পুরো বিষয়টি অবাস্তব মনে হচ্ছিল।’
পরবর্তী দুই ঘণ্টা পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা তাদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তারা পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করেন এবং গান শোনেন। একপর্যায়ে বাসের মনে হয়েছিল, পুরো আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ‘একসময় আমার মনে হয়েছিল, ঠিক আছে, এবার চলে যাই। গাড়িতে উঠে এখান থেকে চলে যাই। কিন্তু আমি এমন কিছু বলতে চাইনি, যাতে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে যান। কারণ, আমি পুরো প্রক্রিয়াটিতে তাদের সমর্থন করেছিলাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘সবাইকে শান্ত রাখাই ভালো ছিল। আর সেই সময়টুকু বিদায় জানানোর জন্য কাজে লাগানো উচিত ছিল।’
সকাল সাড়ে ১০টার কিছু আগে চিকিৎসকেরা জান ও এলসকে প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগ করতে আসেন। পাশাপাশি দুটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ছিলেন তারা। শেষ মুহূর্তে অচেতন হওয়ার আগে বাস বাবা-মায়ের মধ্যকার গভীর ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতা দেখতে পান।
বাস বলেন, ‘আমার পুরো জীবনে তাদের হয়তো তিন-চারবার হাত ধরে হাঁটতে দেখেছি। কিন্তু সেদিন তারা পাশাপাশি শুয়ে হাত ধরে ছিলেন। দৃশ্যটি দেখে আমার খুব ভালো লেগেছিল। মনে হয়েছিল, তারা সত্যিই একসঙ্গে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’
বাবা-মায়ের শ্বাস বন্ধ হওয়ার পর প্রথম আধা ঘণ্টার অভিজ্ঞতাকে বাস একটি বাস্তব ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তখন তারা আর বেঁচে ছিলেন না।
তিনি বলেন, ‘এরপর আপনি বুঝতে পারেন আসলে কী ঘটে গেছে। এটি এমন এক অনুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।’
একই সময়ে দুজনকে হারিয়ে একাকিত্বে বাস
হসপিসে বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর বাস গভীর শোকে ভেঙে পড়েন। একই সঙ্গে তীব্র একাকিত্ব তাকে ঘিরে ধরে।
তিনি বলেন, ‘শোকের মধ্য দিয়ে যাওয়া খুব, খুব কঠিন একটি বিষয়। আমার কোনো ভাই বা বোন নেই। তাই নিজেকে সত্যিই একা মনে হয়েছে।’
সাধারণত বাবা-মায়ের একজন মারা গেলে অন্যজন বেঁচে থাকেন। ফলে সন্তানরা জীবিত বাবা বা মায়ের সঙ্গে প্রয়াত ব্যক্তির স্মৃতি ও নিজেদের দুঃখ ভাগাভাগি করতে পারেন। কিন্তু বাসের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ ছিল না। কারণ, তিনি একই সময়ে বাবা ও মা দুজনকেই হারিয়েছেন।
বাস বলেন, ‘আমার মনে হয়েছিল, কেউ যেন আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরিয়ে নিয়েছে।’
শোকের প্রভাব শুধু মানসিকভাবে নয়, শারীরিকভাবেও অনুভব করেছেন তিনি। টানা চার-পাঁচ সপ্তাহ অসুস্থ বোধ করেছেন। শরীরেও ব্যথা অনুভব করেছেন।
বাস বলেন, ‘আমি অন্য কাউকে এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে পরামর্শ দেব না। হয়তো আমার বাবা-মায়ের জন্য এটাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু একই মুহূর্তে দুজনকে হারানো আমার ওপর খুব, খুব গভীর প্রভাব ফেলেছে।’
নেদারল্যান্ডসে স্বেচ্ছামৃত্যুর পরিসংখ্যান
নেদারল্যান্ডসে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদনকারীদের জন্য সঠিক সময় নির্বাচন করা বেশ জটিল। বিশেষ করে এলসের মতো ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
দেশটির আঞ্চলিক স্বেচ্ছামৃত্যু পর্যালোচনা কমিটির (আরটিই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নেদারল্যান্ডসে ৯ হাজার ৯৫৮ জন স্বেচ্ছামৃত্যুর মাধ্যমে জীবন শেষ করেছেন। তাদের মধ্যে ৪২৭ জন ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। এদের মধ্যে ছয়জনের ডিমেনশিয়া ছিল গুরুতর পর্যায়ে।
একই বছর দেশটিতে ১০৮ জন ব্যক্তি যুগল স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেন। অর্থাৎ ৫৪ জোড়া দম্পতি একসঙ্গে জীবন শেষ করেন।
স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করতে হলে ব্যক্তিকে অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যে থাকতে হয়। পাশাপাশি চিকিৎসকদের নিশ্চিত হতে হয়, ওই ব্যক্তি নিজের জীবন শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মানসিক সক্ষমতা রাখেন।
রটারডামের ইরাসমাস মেডিকেল সেন্টারের জেরিয়াট্রিশিয়ান ও নীতিবিদ ডা. রোজমারাইন ভ্যান ব্রুখেম জানান, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য স্বেচ্ছামৃত্যুর সঠিক সময় নির্ধারণ করা মানসিকভাবে অত্যন্ত কষ্টকর।
তিনি বলেন, ‘তারা ভাবেন, এই মুহূর্তে আমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে, কিন্তু এখনই হয়তো সময়টা খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে। আবার আগামী মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করলে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে। তাহলে আমি কীভাবে বুঝব, কখন এই প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত? কীভাবে বুঝব, আমি শর্তগুলো পূরণ করছি কি না এবং স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি পাব কি না? আর যদি বেশি দেরি করে ফেলি, তাহলে কি সুযোগটি হারিয়ে ফেলব?’
ডা. ভ্যান ব্রুখেম বলেন, নেদারল্যান্ডসে স্বেচ্ছামৃত্যু বৈধ হওয়ার কারণেই তার রোগীদের মধ্যে এমন উদ্বেগ তৈরি হয়। তারা জানেন, গুরুতর পর্যায়ের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি পাওয়া খুবই বিরল।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের মতো যেসব দেশে স্বেচ্ছামৃত্যু নিষিদ্ধ, সেখানে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তবে এলসের মতো জীবন-মৃত্যুর এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের সাধারণত ভাবতে হয় না।
২০২৪ সালে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এলস জানিয়েছিলেন, তারা আর অপেক্ষা করতে চাননি। কারণ, তার আলঝেইমার রোগ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। অন্যদিকে জানও স্ত্রীর সঙ্গে একসঙ্গে মৃত্যুবরণের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তিনি বিবিসিকে বলেছিলেন, হয়তো তার সময়ের আগেই চলে যাওয়া হচ্ছে। তবে তিনি নিজের জীবন কাটিয়ে ফেলেছেন। তার কাছে জীবনের আর কিছু বাকি ছিল না।
শেষ মুহূর্তের আগে সব কথা বলা হয়েছিল
জান ও এলস খুব ভালোভাবেই জানতেন, তাদের মৃত্যুর সিদ্ধান্ত ছেলের ওপর কতটা মানসিক চাপ তৈরি করছে। স্বেচ্ছামৃত্যুর পুরো প্রক্রিয়ায় বাবা-মায়ের আলাদা আলাদা চিকিৎসকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সব বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাস। পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়েছিল।
প্রিয়জন মারা গেলে অনেক সময় মনে হয়, তাকে আরও কিছু কথা বলা উচিত ছিল। হয়তো কিছু কথা না বলার আক্ষেপ থেকে যায়। কিন্তু বাসের ক্ষেত্রে তেমনটি হয়নি।
২০২৪ সালের ৩ জুন, সোমবার বাবা-মায়ের হসপিসে যাওয়ার দুই দিন আগে তাদের উদ্দেশে একটি চিঠি লেখেন তিনি।
বাস বলেন, ‘চিঠিটি প্রায় আট পৃষ্ঠার ছিল। ঘটনার দুই দিন আগে শনিবার রাতে আমি দেরি করে তাদের ক্যাম্পার ভ্যানে গিয়েছিলাম। সেখানে বসে পুরো চিঠিটি তাদের পড়ে শুনিয়েছিলাম। চিঠিতে আমাদের একসঙ্গে কাটানো জীবনের কথা ছিল। তারা আমার জন্য যা করেছেন, সেসবের জন্য তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম।’
চিঠিটি পড়ে জান ও এলস আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা সাধারণত প্রকাশ্যে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতেন না। ছেলের প্রতিও খুব বেশি আবেগ দেখাতেন না।
বাস বলেন, ‘আপনি বুঝতে পারেন যে তারা আপনাকে ভালোবাসেন। কিন্তু তারা কথায় বা আলিঙ্গনের মাধ্যমে সেটি প্রকাশ করেন না। বরং বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়ে ভালোবাসা দেখান। আমার মা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর আগের চেয়ে বেশি জড়িয়ে ধরতেন। কিন্তু আমার বাবা কখনো তা করতেন না। আমি কখনো বাবার কাছ থেকে আলিঙ্গন পাইনি।’
তবে শেষ শনিবার রাতে ক্যাম্পার ভ্যানে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। চিঠি পড়ে শোনানোর পর জান ছেলেকে জড়িয়ে ধরেন।
বাস বলেন, ‘চিঠিটি পড়ার পর তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সেটি হয়তো আমার জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত ছিল।’
শেষে তিনি বলেন, ‘সব কথা বলা হয়েছিল।’