চার মহাদেশের চার নির্বাচন বদলাতে পারে বিশ্বব্যবস্থাকে © সংগৃহীত
১০ দিনের ব্যবধানে চার মহাদেশে ৪ টি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ব্রাজিল, সার্বিয়া, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এসব নির্বাচনের ফল বিশ্বরাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। কোথাও গণতন্ত্রপন্থী শক্তি ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতাপ্রত্যাশী কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির মুখোমুখি, আবার কোথাও নির্বাচনকে ঘিরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খবর গার্ডিয়ানের
বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা কমে আসার প্রেক্ষাপটে এসব নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সুইডেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ভি-ডেম ইনস্টিটিউটের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিশ্বের গড় নাগরিকের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ১৯৭৮ সালের পর আর এতটা নিচে নামেনি। বার্লিন প্রাচীরের পতন ও ইউরোপে কমিউনিজমের অবসানেরও আগে ছিল ওই সময়।
এমন পরিস্থিতিতে ব্রাজিল, সার্বিয়া, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়াবে, নাকি গণতন্ত্রপন্থী শক্তিকে নতুন করে উৎসাহিত করবে—তা নিয়ে আলোচনা চলছে। চারটি দেশের নির্বাচন আলাদা হলেও তাদের রাজনীতির মধ্যে কিছু যোগসূত্র রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ আন্দোলন ব্রাজিলের বলসোনারো পরিবার, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন জানিয়েছে।
রবিবার ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোট হেরেছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্টের ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো। একই দিনে সার্বিয়ায় ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের প্রার্থীদের নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে জয়ে পেয়েছে দেশটির শিক্ষার্থীদের জোট। আর মঙ্গলবার ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচনে নাকানি চুবানি খাচ্ছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট বেনজামিন নেতানিয়াহু। তাতে সবকটিতে মুখ থুবড়ে পড়েতে যাচ্ছেন মার্কিন মদদপুষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা।
ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ও ডানপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো। চার বছর আগে নির্বাচনে হেরে ক্ষমতা ধরে রাখতে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করার অভিযোগে জইর বলসোনারোর ২৭ বছরের কারাদণ্ড হয়। এবার তার ছেলে নির্বাচনে জিতলে বাবাকে ক্ষমা করার পাশাপাশি সংবিধান পরিবর্তন এবং বিচার বিভাগের ভূমিকা পুনর্বিন্যাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে তার।
ফ্লাভিও বলসোনারো কঠোর আইনশৃঙ্খলা নীতির পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। ব্রাজিলে দীর্ঘদিনের অপরাধ সমস্যার সমাধানে তিনি অপরাধের দায় নির্ধারণের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছরের নিচে নামিয়ে আনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, বিচার বিভাগে সংস্কারের নামে আদালতের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি আমাজন বনাঞ্চলের পরিবেশগত বিধিনিষেধ শিথিল করার প্রতিশ্রুতিও পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ব্রাজিলের গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে পরিবর্তন এসেছে। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি লুলা দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিভিন্ন সূচকে উন্নতির কথা জানিয়েছে ভি-ডেম। প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়নে ব্রাজিলের অবস্থান যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও ভালো বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সার্বিয়ায় দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচের বিরুদ্ধে এবার ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলন নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। দেশটির সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর ওপর ক্ষমতাসীনদের প্রভাব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সেন্টার ফর রিসার্চ, ট্রান্সপারেন্সি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটির কর্মসূচি পরিচালক রাশা নেদেলকভের ভাষায়, ‘রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার সীমারেখা প্রায় মুছে গেছে।’
২০২৪ সালে সার্বিয়ার নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনে কংক্রিটের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনা দেশটিতে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করে। এর পর শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে ওঠে। সরকারি চাপ ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে আন্দোলনটি এখন নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে।
আন্দোলনের প্রার্থীদের মধ্যে পরিচিত রাজনৈতিক নেতার চেয়ে শিক্ষাবিদ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তির সংখ্যা বেশি। তাদের নির্বাচনী স্লোগান ‘সার্বিয়া নাকি মাফিয়া?’। আন্দোলনটির সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় পরিসরের সভা বা প্লেনামের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে ক্ষমতাসীনদের শক্তিশালী ভোটব্যাংক এবং বিরোধী সমাবেশে হামলার আশঙ্কা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে দেশটিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সংখ্যগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন ক্ষমতাসীন আলেকসান্দার ভুচিচ।
এদিকে মঙ্গলবারের ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। গত তিন দশকের মধ্যে প্রায় ১৯ বছর দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। তার বর্তমান জোট সরকারের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সীমিত করা, স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং পুলিশ, সেনাবাহিনী ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থাকে রাজনীতিকরণের অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ভোট গণনা এখনও চলছে। সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে চূড়ান্ত ফলাফলের আগেই ভোটে কারচুপির অভিযোগ আনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন নেতানিয়াহু। তিনি আসলে কী করতে চাচ্ছেন সেটি এখনও পরিস্কার নয় তবে নির্বাচনের মাঝপথে তার এই অভিযোগ থেকে এটা বেশ স্পষ্ট যে অন্যান্যবারের চেয়ে এইবার জয় ঘরে আনতে তাকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।
গাজায় চালানো আগ্রাসনের কারণে নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে রয়েছেন। একই সঙ্গে নিজ দেশে চলমান দুর্নীতির মামলাও তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক জেনারেল গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট আসনসংখ্যায় এগিয়ে থাকতে পারে, তবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দেশটির নাগরিক ফিলিস্তিনিরা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হলেও পার্লামেন্টে তাদের প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলক কম। নেতানিয়াহুবিরোধী প্রধান জোট আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের জোটে যেতে রাজি নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণে ফিলিস্তিনি সংখ্যালঘুদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আর সবশেষ যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির কংগ্রেসের দুই কক্ষের অন্তত একটিতে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সরকার পরিচালনা, বিচার বিভাগ ও ফেডারেল তদন্ত সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ এবং অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং সারা দেশে তাদের অভিযান নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ভি-ডেমের উদার গণতন্ত্র সূচকেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের অবনতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলেও ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করা সহজ হবে না। প্রেসিডেন্ট ভেটো প্রয়োগ করতে পারবেন। সেই ভেটো অতিক্রম করতে প্রয়োজনীয় ভোট পাওয়া কিংবা সিনেটে রিপাবলিকানদের ফিলিবাস্টার ঠেকানো কঠিন হতে পারে। কংগ্রেসের বাজেট নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অর্থায়নের সঙ্গে সংস্কারের শর্ত যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। কমিটির নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে তদন্তও শুরু করতে পারবেন।
তবে প্রশাসন কংগ্রেসের তদন্তে সহযোগিতা না করলে কিংবা তার নির্দেশনা উপেক্ষা করলে সাংবিধানিক বিরোধ আরও বাড়তে পারে। ফলে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য এলেও যুক্তরাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পুনরুদ্ধার তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হবে না।
চারটি নির্বাচনের মধ্যে যোগসূত্রের আরেকটি দিক হলো নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। সার্বিয়ার ছাত্র ও গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকারীদের ফোনে ইসরায়েলি প্রযুক্তিতে তৈরি পেগাসাস স্পাইওয়্যার পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। ব্রাজিলের বলসোনারো ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সমর্থক এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো ব্রাজিলের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রের বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহ করেছে। সার্বিয়া ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ২০০ কোটি ডলার ব্যয়ের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি দেশে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির সমর্থকদের জয় অন্য দেশের একই ধরনের রাজনৈতিক শক্তিকে উৎসাহিত করতে পারে। বিপরীতে, গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন সফল হলে তা অন্য দেশের সমমনা গোষ্ঠীগুলোকেও অনুপ্রাণিত করতে পারে। তবে প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা।
সব মিলিয়ে, আগামী ১০ দিনের এই নির্বাচনগুলো শুধু চারটি দেশের সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়; এগুলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহারের মতো বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ভোটের ফলের পাশাপাশি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা, পরবর্তী সরকার গঠন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা ব্যবহারের ধরনই নির্ধারণ করবে এসব নির্বাচনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।